Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

প্রযুক্তিই পুতুলনাচকে পুনর্জীবিত করতে পারে 

গ্রামীণ যুবকদের অভিনয় শিক্ষার প্রথম সোপান পুতুলনাচের আসর থেকেই তৈরি হত। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে এখন আর পুতুলনাচ নিয়ে কেউই ভাবিত নয়। নতুন প্রযুক্তির বিস্ময়কর উদ্ভাবনে আজ সাত থেকে সত্তর বছরের মানুষ মজে রয়েছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এ সুকুমার শিল্পটি উপেক্ষিত।

Share Links:

ড. গৌতম মুখোপাধ‍্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

মানুষের জীবন পুতুলনাচের মতো। প্রযুক্তির এই অগ্রগতির যুগেও মানুষ নিজের ভাগ‍্যের নিয়ন্ত্রণ নিজে করতে অপারগ। অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলির কারুকার্যে মানুষের আপন ভাগ্য দোলায়িত হয় বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। পুতুলনাচের ক্ষেত্রেও এই কৃৎকৌশল অবলম্বন হয়।

একসময় গ্রামীণ জনপদে আবালবৃদ্ধবনিতা, বিশেষ করে শিশুদের বিনোদনে পুতুলনাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে বিপিন পাল (লাল-বাল-পালের বিপিনচন্দ্র পাল নন) প্রথম পুতুলনাচের প্রচলন করেন বলে জনশ্রুতি আছে। অধুনা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার তিতাস নদীর কূল ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনপদে কৃষ্ণনগর নামক একটি গ্রামে বিপিন পালের জন্ম হয়। তিনি সে সময় সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বন করে পুতুলনাচের আয়োজন করতেন বলে জানা যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জনপদে আরও কয়েকজনের নাম জানা যায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের গিরীশ আচার্য, মহম্মদ তারু মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেন্ডা বা মেরুড়া এলাকার ধন মিয়া, কালু মিয়া, মহম্মদ রাজ হোসেন ও পুর শহরের কাজিপাড়া এলাকার শরিফ মালদার। ধন মিয়ার পুতুলনাচের দলের নাম ছিল রয়েল বীণা অপেরা। তাঁর পুতুলনাচের দল দেশ-বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল। এছাড়াও বীণা পুতুলনাচ, ঝুমুর পুতুলনাচ দল পুতুলনাচ প্রদর্শন করত। পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে পরিচালিত পুতুলনাচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনপদের একটি ঐতিহ্য। বছরের বিশেষ সময়ে মেলা-পল্লিতে পুতুলনাচ প্রদর্শন হয়ে থাকে।

পুতুলনাচ একটি ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প। এতে শিল্পী পুতুলের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে গল্প বর্ণনা করেন, যা সামাজিক, পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে হতে পারে। আমাদের দেশে মূলত চার ধরনের পুতুলনাচ দেখানো হয়। ডাং পুতুল, কাপড়ের তৈরি পুতুল, তারের পুতুল এবং বেণী পুতুল। এদের মধ্যে বেণী পুতুলের নাচ বাংলায় খুব একটা দেখা যায় না, সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল ডাং পুতুলের নাচই। পুতুলনাচ ছিল ছোট যাত্রাপালার রূপান্তর। যিনি অভিনয় করতেন, তিনি একাধারে পাঁচ, ছ’টি চরিত্রে অভিনয় করতে পারতেন৷ তাঁকে ওই পালার মাস্টার ম্যান বলা হত। পরবর্তীকালে কাহিনিকে ভরপুর করে তুলতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ পালায় হারমোনিয়াম, ঢোল, বাঁশি ইত্যাদির ব্যবহার শুরু হয়।

পুতুলনাচে সাধারণত ধর্মকথা, নীতিকথা, সুখ-দুঃখ, হাসিঠাট্টা এবং দৈনন্দিন জীবনের গল্প তুলে ধরা হয়। সামাজিক, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাও পুতুলনাচের মাধ্যমে পরিবেশিত হতে দেখা যায়। এটি গ্রামীণ জনপদে বিনোদনের এক ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম। এই শিল্পকলার মাধ্যমে লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে, বিশেষ করে মোবাইল ফোনের প্রভাবে পুতুলনাচ আজ বিলুপ্তির পথে। তবে লোকশিল্পের ভাণ্ডারে পুতুলনাচ (Puppetry) আজও এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। শত শত বছর ধরে এটি ভারতের এবং বিশেষ করে বাংলার গ্রামীণ জীবনের অন্যতম প্রধান বিনোদন ও সামাজিক শিক্ষার মাধ্যম ছিল। ধর্মীয় আচার, সামাজিক উৎসব, মেলা কিংবা পারিবারিক আনন্দ-অনুষ্ঠানে পুতুলনাচ ছিল অপরিহার্য। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে এ শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে।

ভারতের প্রাচীন সাহিত্যে পুতুলনাচের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের সময়কালেও কাঠের পুতুলের উল্লেখ আছে। নাট্যশাস্ত্রে পুতুলনৃত্যের কথা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। দক্ষিণ ভারতে ‍‘বোম্মালাট্টাম’ বা ‍‘বোম্মালাকাটা’, রাজস্থানে ‍‘কাঠপুতলি’, ওড়িশায় ‍‘রাবণছায়া’ এবং বাংলায় ‍‘পুতুলনাচ’ প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান। বাংলার গ্রামীণ সমাজে পুতুলনাচ ছিল গল্পকথনের প্রধান মাধ্যম। কাঠ, কাপড়, কাগজ, মাটির তৈরি পুতুল দিয়ে শিল্পীরা ধর্মীয় কাহিনি, রামায়ণ-মহাভারত, মঙ্গলকাব্য থেকে গল্প নিয়ে পুতুলনাচের ব্যবস্থা করতেন। একদিকে বিনোদন, অন্যদিকে শিক্ষামূলক বার্তা প্রদান ছিল এর উদ্দেশ্য। গ্রামবাংলায় পুতুলনাচ ছিল সমষ্টিগত চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্র। গ্রামীণ সমাজে যখন সংবাদপত্র, রেডিয়ো বা সিনেমা ছিল না, তখন মানুষের জ্ঞান-বিনোদনের অন্যতম উৎস ছিল পুতুলনাচ।

পুতুলনাচ সস্তা, সহজলভ্য এবং গ্রামীণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা একমাত্র বিনোদন। শিল্পটির শিক্ষামূলক দিকগুলি হল, ধর্মীয় আচার ও নীতিশিক্ষা প্রচার, সামাজিক মূল্যবোধ গঠন, গ্রামীণ জনগণকে রাজনৈতিক বার্তা প্রদান, বিশেষত ঔপনিবেশিক আমলে অনেক বিপ্লবী বার্তা পুতুলনাচের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছিল। শিশুরা পুতুলনাচ দেখে গান শেখে, কাহিনি শোনে এবং অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী হয়। পুতুলনাচ ছিল বাংলার নিজস্ব সম্পদ, বাংলার গ্রামাঞ্চলে মেলা থেকে উৎসব, সবকিছুর অঙ্গ ছিল এ শিল্প মাধ্যমটি। গ্রামীণ যুবকদের অভিনয় শিক্ষার প্রথম সোপান পুতুলনাচের আসর থেকেই তৈরি হত। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে এখন আর পুতুলনাচ নিয়ে কেউই ভাবিত নয়। নতুন প্রযুক্তির বিস্ময়কর উদ্ভাবনে আজ সাত থেকে সত্তর বছরের মানুষ মজে রয়েছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এ সুকুমার শিল্পটি উপেক্ষিত।

উনিশ শতকে ছাপাখানার প্রচলন হলে গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস মানুষের বিনোদনের বিকল্প রূপ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মৌখিক লোকসংস্কৃতির গুরুত্ব কমতে থাকে। ২০ শতকের গোড়ার দিকে রেডিয়ো গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছতে শুরু করে। গান, নাটক, খবর— সবকিছু এক যন্ত্রে শোনা যায়। পুতুলনাচের তুলনায় রেডিয়ো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সিনেমার ভিজুয়াল প্রভাব পুতুলনাচের সীমিত অভিব্যক্তিকে হার মানায়। বড় পর্দা, রঙিন ছবি, নায়কের আবেগময় সংলাপ দর্শককে মুগ্ধ করে।

সাত ও আটের দশক থেকে টেলিভিশন পুতুলনাচের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ধারাবাহিক নাটক, সিনেমা, খবর, কার্টুন— সবই মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। একবিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদন, যেমন, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করেছে। ফলে পুতুলনাচ প্রায় বিস্মৃত। এর মূল কারণ প্রজন্ম বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ দ্রুতগামী বিনোদন চাইতে শুরু করে। পুতুলনাচের ধীর গতির বর্ণনা, সীমিত ভিজুয়াল এফেক্ট নতুন প্রজন্মের কাছে অপ্রতুল মনে হয়। গ্লোবালাইজড কালচারে হলিউড-বলিউডের প্রভাব গ্রামীণ লোকসংস্কৃতিকে প্রান্তিক করে দেয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পুতুলশিল্পীরা পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে দারিদ্রকে সম্বল করে। ফলে নতুন প্রজন্ম এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ‍্য হয়। জাপানে ‍‘বুনরাকু’ বা ইন্দোনেশিয়ায় ‍‘ওয়ায়াং’ পুতুলনাচ আজও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় টিকে রয়েছে, কিন্তু ভারতে সে সুযোগ নেই। বাণিজ্যিক বিনোদনের বিস্তার যে পুতুলনাচকে কোণঠাসা করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পুতুলনাচের হারিয়ে যাওয়া কেবল আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফল নয়, প্রযুক্তি এর একটি প্রধান কারণ, তবে সামাজিক অবহেলা, অর্থনৈতিক সংকট, বিশ্বায়ন, সাংস্কৃতিক নীতি এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তনও সমানভাবে দায়ী। আজকালকার নবীন প্রজন্ম পুতুলনাচবিমুখ। প্রযুক্তির নব নব আবিস্কারের মধ্যেই তারা বিনোদনের রসদপাতি খোঁজায় মশগুল। তবে প্রযুক্তিই ফের এ শিল্পকে পুনর্জীবিত করার হাতিয়ার হতে পারে। ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে পুতুলনাচ নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে, শুধু দরকার সচেতন প্রচেষ্টা, পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রজন্মের আগ্রহ জাগানো।

5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए