আনন্দমোহন দাস

ভারতীয় বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় একজন বিখ্যাত রসায়নবিদ ছিলেন। রসায়ন ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদান ভোলার নয়। জীবনদায়ী ওষুধ আবিষ্কার করে মানুষের অমূল্য জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে গিয়েছেন। মানুষের সেবায় তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বিজ্ঞানের জগতে তাঁকে শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে দেখা হয়। রসায়নবিদ হিসেবে তিনি জগদ্বিখ্যাত ছিলেন। তাঁকে ‘ভারতীয় রসায়নের জনক’ বলা হয়ে থাকে। তিনি একাধারে একজন সমাজকর্মী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কলকাতা চলে আসেন। মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি অত্যধিক আকর্ষণ সকলের নজর কেড়েছিল। তাঁর মধ্যে গবেষণা করার অদম্য ইচ্ছা ছিল। তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন। সেখানে রসায়নের প্রতি তাঁর ঝোঁক খুব বেড়ে ওঠে। এডেনর্বাগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু দিন অধ্যাপনা করেছেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বাঙালিকে ব্যবসার কাজে উদ্যোগী হওয়ার জন্য রসায়ন শিল্প স্থাপন এবং তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর এত দরদ ছিল যে, তিনি নিজেই নিজের বাড়িতে একটি গবেষণাগার গড়ে তোলেন। এমনকী তিনি ১৯০১ সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস নামে স্বদেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এটিকেই তখন দেশের প্রথম ওষুধ কারখানা হিসেবে দেখা হয়। ওষুধ ছাড়াও বেঙ্গল কেমিক্যালের ফিনাইল, ন্যাপথলিন ইত্যাদি খুবই উৎকৃষ্ট মানের এবং জনপ্রিয় পণ্য, যা বাজারে আজও বহুল প্রচলিত। তিনি একজন প্রকৃত যুক্তিবাদী ছিলেন এবং জাতপাত ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরোধী ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সমাজ সংস্কারের প্রতি দায়বদ্ধ ছিলেন।
প্রফুল্লচন্দ্র ভাড়া বাড়িতে সারা জীবন অতিবাহিত করেছেন। তাঁর জীবনে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সর্বদা আকুল আগ্রহ ও অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত থেকেছে। ১৯২২ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের জন্য তিনি অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সহজ সরল জীবনযাপন ও ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধীকেও মুগ্ধ করেছিল।
১৮৯৫ সালে প্রফুল্লচন্দ্র মারকিউরাস নাইট্রেট নামে যৌগ আবিষ্কার করেন এবং অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, হাইপো নাইট্রেট নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি নিজের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশ থেকে বহু প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যুবকদের উন্নতির জন্য বড় শিল্প গড়ে তোলা তাঁর স্বপ্ন ছিল। অসামান্য ব্যক্তিত্ব ও সহজ সরল জীবনযাপন এবং উচ্চভাবনায় বিশ্বাসী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ইতিহাসের অনুরাগী ছিলেন। তিনি ‘হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ নামে একটি বইও রচনা করেছিলেন। তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাজ খেতাব ‘কম্পেনিয়ন অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ (সিআইআই) সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৬১ সালের ২ আগস্ট ভারতীয় ডাক বিভাগ তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন ৮২ বছর বয়সে কলকাতায় তিনি পরলোকগমন করেন। ২০২৪ সালে দেশজুড়ে তাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়। বিজ্ঞানের জগতে কৃতিত্বের জন্য আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো বাঙালিরা বিশ্বের সামনে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। বিশ্বের সামনে ভারতীয় বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা প্রমাণ করেছেন। স্বদেশি শিল্পের জনক ও বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বিজ্ঞান জগতে অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি।
