মহাশোরগোল প্রতিবেদন: হুগলি জেলার সরকারি মহিলা শারীরশিক্ষা কলেজে দু’দিন ব্যাপী স্বামী বিবেকানন্দের ১৬২তম জন্মোৎসব অনুষ্ঠিত হল। সেখানে আলোচনাসভায় শারীরশিক্ষার উন্নয়নের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে কয়েকটি প্রস্তাব নেওয়া হয়, যা রাজ্য সরকারের শিক্ষা দফতরে পাঠানো হবে। প্রথম প্রস্তাব, আগামী শিক্ষাবর্ষেই কেজি থেকে পিজি পর্যন্ত শারীরশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক বিষয় করতে হবে। বিশেষ করে নবম-দশম শ্রেণিতে চালু করা হোক। দ্বিতীয় প্রস্তাব, উচ্চমাধ্যমিকে শারীরশিক্ষা চালু হয়েছে ১০ বছর। কিন্তু শারীরশিক্ষার উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি। সুতরাং কোনও বিষয় চালু করলে তার জন্য উপযুক্ত যোগ্যতার শিক্ষক দ্রুত নিয়োগ করতে হবে। পরিকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া কোনও পাঠক্রম সাফল্য পেতে পারে না। তাই শারীরশিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমাদের রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করা যায়। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নবম-দশম শ্রেণিতে শারীরশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে ছিল না। আবার এখন দেখুন, নবম-দশম শ্রেণিতে নেই, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে আছে।
স্বামী বিবেকানন্দের জন্মোৎসব উপলক্ষে ১২ জানুয়ারি কলেজে স্বামী বিবেকানন্দের একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়। মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন বেলুড় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক বলভদ্রজি মহারাজ। উপস্থিত ছিলেন হুগলির মহকুমা শাসক স্মিতা সান্যাল শুক্লা, কলেজের অধ্যক্ষ ড. শ্যামল মজুমদার-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথি।
বিভিন্ন শারীরশিক্ষা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে Swami Vivekananda Physical Education Excellence Award নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। বিশ্বভারতী, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, স্নাতকোত্তর সরকারি শারীরশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাণীপুর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ ন’টি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরশিক্ষা বিভাগ অংশগ্রহণ করে। তিনটি বিভাগে এই প্রতিযোগিতা হয়। প্রথম হন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌরভ পান্ডা, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন আয়োজক হুগলি সরকারি মহিলা শারীরশিক্ষা কলেজের প্রীতি তামাং এবং তৃতীয় স্থান লাভ করেন বিশ্বভারতীর অভিলাসা ঘিসিং।
দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় শারীরশিক্ষার ওপর একটি আলোচনাসভা। তাতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল স্থানীয় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষিকা, শারীরশিক্ষা কলেজের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধানদের। প্রধান বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. নিমাইচন্দ্র সাহা, ডিপিআই, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. অলক ব্যানার্জি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র গবেষক ড. সমাব্রত সরকার। শারীরশিক্ষার এই আলোচনার সুর বেঁধে দিয়েছিলেন আয়োজক হুগলি সরকারি শারীরশিক্ষা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ড. শ্যামল মজুমদার। শারীরশিক্ষা নিয়ে তাঁর এই ভাবনাকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। কারণ শারীরশিক্ষা নিয়ে এখন চিন্তাভাবনা করা এবং তা বাস্তবে পরিণত করার মানুষের অভাব রয়েছে। কনক্লেভে উপস্থিত সকলে ড. মজুমদারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
১৯৭৪ সালে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ প্রথম শারীরশিক্ষাকে মাধ্যমিক পর্যন্ত আবশ্যিক বিষয় করেছিল। কিন্তু তারাই আবার ১৯৯৫ সালে এ বিষয়টিকে অপশনাল করে এর গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছিল। পরে পুনরায় মূল্যায়ন ব্যবস্থার গলদের জন্য তা অপশনাল হিসাবে রেখেছিল, কিন্তু এ বিষয়ের নম্বর ছাত্রছাত্রীদের কোনও কাজে লাগত না। স্বভাবতই বিষয়টি সম্পর্কে ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তন হল। নতুন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি শারীরশিক্ষাকে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আবশ্যিক লিখিত এবং ব্যবহারিক বিষয় করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। বিধানসভাতেও তা পাশ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে নবম-দশম শ্রেণিতে আজ পর্যন্ত এটিকে আবশ্যিক বিষয় করা হয়নি।
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নবম-দশম শ্রেণিতে যেভাবে বিষয়টির সর্বনাশ করা হয়েছিল, বর্তমান সরকারের শিক্ষা দফতর আজও সে পুরোনো পথ অনুসরণ করে যাচ্ছে। এ বিষয়টির পরীক্ষার জন্য প্রতিবছর মধ্যশিক্ষা পর্ষদ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে চলেছে। বলা যেতে পারে, সরকারি টাকার অপচয় করে চলেছে। কারণ নামমাত্র যেসব স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের বিষয়টি দেওয়া হয় (কেউ আগ্রহী নন), তাদের সারা বছর শারীরশিক্ষার কোনও ক্লাস হয় না, শুধু নামে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং নম্বর দিয়ে দেওয়া হয়। এই প্রহসন বন্ধ হওয়া দরকার।
ওইদিনের সভায় যেসব প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই নবীন প্রজন্মের। তাঁরা শারীরশিক্ষার অতীতের হালহকিকত সম্বন্ধে তেমন অবহিত নন। তাই বর্তমান অবস্থার জন্য তাঁদের ওপর দোষ দেওয়া চলে না। যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা শারীরশিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন বলেই হুগলি সরকারি মহিলা শারীরশিক্ষা কলেজের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। শারীরশিক্ষার বর্তমান অবস্থার জন্য তাঁরা দায়ী নন। তাঁরা সবাই শারীরশিক্ষাকে গুরুত্বের সঙ্গে স্কুলে চালু এবং নবম-দশম শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবের সঙ্গে সহমত হয়েছেন। অতীতের যেসব ঘটনার কথা অনেকে উল্লেখ করেছেন, তাঁর সঙ্গে এ প্রজন্মের প্রধান শিক্ষকদের কোনও সম্পর্ক নেই বলেই মনে হয়। তবে অতীতে বহু স্কুলের প্রধান শিক্ষক/শিক্ষিকা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাননি।
সব শেষে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে দু’দিনের বিবেকানন্দ জন্মোৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

সময়োপযোগী খুব সুন্দর লেখা, ধন্যবাদ জানাই যিনি বিষয়টি তুলে ধরেছেন l