Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ইমিউনিটির সাবেক ধারণা বদলে চিকিৎসায় নোবেল জয়

(বাঁ-দিক থেকে) শিমন সাকাগুচি, মেরি ই ব্রুনকো এবং ফ্রেড র‍্যামসডেল।

Share Links:

গৌতম সরকার

মানবদেহ সত্যিই এক জটিল ধাঁধা। আমাদের চারপাশে লক্ষ লক্ষ ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, অণুজীব ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুযোগ পেলেই আক্রমণ করবে। তবু আমরা সুস্থ থাকি। পরিশ্রম করতে পারি। প্রতিকূল পরিবেশে দিনাতিপাত করি। কীভাবে? নিশ্চয়ই একটি কোনও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া শরীরে নিত্য কাজ করে চলেছে, যে কারণে এটা ঘটে থাকে। সেই জৈবিক প্রক্রিয়াই হল ‍‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’। এটি এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা রোগসৃষ্টিকারী ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং পরজীবীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। আমাদের শরীরে রক্তের মধ্যে লিম্ফোসাইট নামক এক ইমিউনো কোষ থাকে, যার কাজ হল বাইরে থেকে আসা জীবাণু বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং ইমিউনো-রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করা।

কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। অনেক সময় দেখা যায়, এই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভারসাম্য হারিয়ে শরীরের সুস্থ কোষগুলিকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে বসছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে রিউমাটয়েড আর্থাইটিস, সিস্টেমিক লুপাস এরিথোমোটোসাস, ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবিটিস মেলিটাস, অটো-ইমিউন হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ার মতো বিভিন্ন অটো-ইমিউন রোগ। মানব শরীরে এই বিপদ যাতে না ঘটে, তার জন্য বিশেষ ধরনের এক লিম্ফোসাইট কাজ করে, যেগুলি রেগুলেটরি লিম্ফোসাইট বা সংক্ষেপে ‘টি-রেগ’ নামে পরিচিত। এরা টিএফ বিটা, ইন্টারলিউকিন-১০-এর মতো ইমিউনো-সাপ্রেসিভ সাইটোকাইনিন নির্গত করে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এই সমস্ত টি-লিম্ফোসাইট সেল মানব শরীরের সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে। এই নজরদারি কোষ আবিষ্কার এবং তাদের কার্যকলাপের ব্যাখ্যার স্বীকৃতি হিসাবে তিন বিজ্ঞানী চিকিৎসককে এ বছর শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রধানত দু’ধরনের হয়— একটি জন্মগতভাবে শরীরে থাকে অর্থাৎ সহজাত, আর অন্যটি অভিযোজিত বা অর্জিত। এই অর্জন পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের ফলে ঘটে থাকে। সহজাত ইমিউনিটি বা অনাক্রম্যতা হল শরীরের প্রথম স্তরের প্রতিরক্ষা, যেটা একটি শিশুর মধ্যে জন্মের সময়কাল থেকেই থাকে। এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলি ত্বক, মুখ নিঃসৃত লালারসের মধ্যে থাকা এনজাইম এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘাতক কোষ বা কিলার সেলস। অন্যদিকে অভিযোজিত অনাক্রম্যতা নির্দিষ্ট প্যাথোজেনের সংস্পর্শে আসার পর তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলিকে চিহ্নিত এবং ধ্বংস করে। ‍‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’-এর ওপর যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেন দুই মার্কিন বিজ্ঞানী মেরি ই ব্রুনকো, ফ্রেড র‍্যামসডেল এবং জাপানি চিকিৎসক বিজ্ঞানী শিমন সাকাগুচি।

‍‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ এমন একটি ব্যবস্থা, যেটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। এটি একদিকে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অকেজো হয়ে যাওয়া থেকে আটকায়, অন্যদিকে শত্রু পরজীবীগুলিকে চিহ্নিত করে এবং শরীরের সুস্থ কোষগুলিকে ভুলবশত আক্রমণ করতে দেয় না। এই দ্বিতীয় অঘটনটি ঘটে গেলে চিকিৎসাশাস্ত্রে তাকে বলা হয় ‍‘অটোইমিউন ডিসঅর্ডার’। এই ডিসঅর্ডারের ফলে মানবদেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজের কোষ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে আক্রমণ শুরু করে। এতে সৃষ্টি হয় একাধিক রোগ, চিকিৎসা বিজ্ঞানে যার নাম ‍‘অটোইমিউন ডিজিজ’।

এতদিন ভাবা হত, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে বুকের বাঁ-দিকে ফুসফুসের মধ্যে থাকা চার থেকে ছ’মিটার লম্বা এবং ৫০ গ্রামেরও কম ভারযুক্ত থাইমাস। চিকিৎসক গবেষকরা বিশ্বাস করতেন, শরীরে প্রয়োজনীয় ইমিউন সহনশীলতা তখনই গড়ে ওঠে, যখন সেন্ট্রাল টলারেন্স প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিকর কোষগুলি থাইমাসে এসে ধ্বংস হয়। ১৯৯৫ সালে সাইমন সাকাগুচি নামের তরুণ জাপানি এক বিশেষ আবিষ্কারের সাহায্যে বোঝান যে, সেন্ট্রাল ইমিউনিটির ভাবনাটি পুরোপুরিভাবে থাইমাসকেন্দ্রিক নয়। সাকাগুচির মতে, বাস্তবে ইমিউন সিস্টেম অনেক বেশি জটিল। তিনি একটি অজানা ইমিউন কোষ আবিষ্কার করেন, যেটা আমাদের শরীরকে অটো-ইমিউন রোগের হাত থেকে বাঁচায়। এই কোষগুলি নিরাপত্তারক্ষীর মতো নজরদারি চালায়, শরীরের নিজস্ব কোষগুলিকে ভুলবশত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে এবং বাইরে থেকে আসা ক্ষতিকর জীবাণুগুলিকে ধ্বংস করে। সাকাগুচি আবিষ্কৃত এই কোষগুলি নাম হয় ‍‘রেগুলেটরি টি-সেলস’।

তারপর ২০০১ সালে মেরি ব্রুনকো ও ফ্রেড র‍্যামসডেল অন্য আর এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করে ফেলেন। ‍‘স্কার্ফি’ নামের এক নির্দিষ্ট প্রজাতির ইঁদুরের অটোইমিউন রোগ হওয়ার ঝুঁকি কেন বেশি, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন৷ তাঁরা তাঁদের গবেষণাপত্রে জানান, এই প্রজাতির ইঁদুরের শরীরে ‍‘ফক্সপি৩’ নামক জিনে এমন এক ধরনের মিউটেশন রয়েছে, যা তাদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এই আবিষ্কারের সূত্র ধরে তাঁরা আরও জানান, কিছু মানুষের ক্ষেত্রেও এ ধরনের জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন অটোইমিউন ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি বাড়ায়। মানব শরীরে মিউটেশন ঘটলে ‍‘আইপেক্স’ নামের এক গুরুতর অটোইমিউন রোগের সৃষ্টি হয়। তার ঠিক দু’বছর পর শিমন সাকাগুচি আর একবার তাঁর আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। তিনি এক অসামান্য সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে দেখান যে, ‍‘ফক্সপি৩’ ১৯৯৫ সালে তাঁর আবিষ্কৃত কোষগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই রেগুলেটরি টি-সেলগুলির বৈশিষ্ট্য হল, এরা একাধারে ইমিউন কোষগুলির ওপর নজরদারি চালিয়ে ক্ষতিকর ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়াগুলিকে চিহ্নিত করে এবং অন্যাধারে নিশ্চিত করে, যাতে মানবদেহের কোনও টিস্যু আক্রান্ত না হয়।

সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি জানিয়েছে, এই তিন বিজ্ঞানীর সম্মিলিত কাজ আগামী দিনে অটোইমিউন ডিসঅর্ডার সম্পর্কে গভীরে গিয়ে জানতে এবং ক্যানসার ও অন্যান্য ইমিউনোথেরাপি গবেষণায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। নোবেল কমিটি আরও জানিয়েছে, তাঁদের গবেষণা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে অতীত ধারণার বদল ঘটিয়েছে। তাঁরা মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিরাপত্তারক্ষী নিয়ন্ত্রণকারী টি-সেল চিহ্নিত করে অটোইমিউন সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা অনেক সহজ করে তুলেছেন।

শিমন সাকাগুচি ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক। মেরি ই ব্রুনকো সিয়াটেলের ‍ইনস্টিটিউট ফর সিস্টেমস বায়োলজিতে জিনোমিক্স ও অটো-ইমিউন ডিসঅর্ডার নিয়ে গবেষণা করেন এবং ফ্রেড র‍্যামসডেল সান ফ্রান্সিসকোর সোনোমা বায়োথেরাপিউটিকস নামক এক জীবপ্রযুক্তি সংস্থার সায়েন্টিফিক অ্যাডভাইসর। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তাঁদের গবেষণা অটোইমিউন ডিসঅর্ডার এবং ক্যানসারের সম্ভাব্য চিকিৎসার পথ দেখাবে। এছাড়া এই গবেষণার ভিত্তিতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন পদ্ধতি আরও সফল ও উন্নত করে তোলা সম্ভব হবে।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए