রবিশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়

সম্প্রতি সায়েন্স সিটির প্রেক্ষাগৃহে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ১০০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান রহস্য প্রসঙ্গ। সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত এবং সম্প্রতি উপরাষ্ট্রপতিও একই দাবিতে সোচ্চার হয়ে বলেছেন, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট নেতাজি তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি। মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎবাণ চমকায়, কিন্তু মেঘহীন নিষ্ফলা আকাশে বজ্রপাত ছাড়া বৃষ্টি হয় না।
বাঙালি ইতিহাসের নির্মম চরম সত্য উদ্ঘাটনে বরাবরই নিশ্চুপ রয়ে গেল। ভারতের প্রবহমান ইতিহাস বিদেশি পর্যটক ইতিহাসবিদ যেমন লিখে গিয়েছেন, তেমন দেশীয় সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক তথা ঐতিহাসিকরাও লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। ইতিহাস মানেই তো ভালো-খারাপের সংমিশ্রণ। কিন্তু সমস্যা হল, আমাদের পড়ানো হয় বিদেশি গবেষক বা ঐতিহাসিকদের ইতিহাস এবং তার সঙ্গে পক্ষপাতিত্বে ভরপুর কিছু দেশীয় ঐতিহাসিকের ইতিহাস, যেখানে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে আড়াল করতে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক কারবারিদের মনের মতো চলনসই একটি ইতিহাস নিশ্চুপ জাতির কাছে মহার্ঘ্য নৈবেদ্য হিসাবে সাজিয়ে রাখা হয়। উপেক্ষিত হয় দুর্ভাগ্যজনক অনিবার্য সত্যান্বেষণ। সেটা সুভাষচন্দ্র বসুর ক্ষেত্রে হয়েছে। বাঙালি সেটাই জানে, যেটা তাঁদের (রাজনৈতিক কারবারি) নির্দেশে লেখানো হয়েছে। আর ঠিক এভাবেই হয়তো যুগের পর যুগ আসবে, সভ্যতার ইমারত নির্মাণ হবে মিথ্যার বেসাতি পরে, আসবে নতুন প্রজন্ম, শহরে-নগরে ধুলোবালি মাখা কাকপক্ষীর কদর্য বিষ্ঠার আস্তরণের অমলিন অনাদরে সজ্জিত নামগোত্রহীন ‘নেতাজি’র মর্মর মূর্তিতে অশিক্ষিত, দুর্নীতিবাজ ভেকধারী, ধান্দাবাজ, নেতা-মন্ত্রীর লোক দেখানো কেতাবি ভাষণে গর্জে উঠবে, ‘নেতাজি, তোমায় আমরা ভুলছি না, ভুলব না’। আর শিক্ষিত বাঙালির একটা বড়ো অংশের দায়িত্বজ্ঞানহীন সরকারি কর্মচারী স্ত্রী-পুত্রের সংক্ষিপ্ত মনোরঞ্জনের উদ্দেশে সোজা সমুদ্রসৈকতে মাংস আর সুরাপানের মত্ত আমেজে তেইশে জানুয়ারির ছুটি কাটিয়ে বাতাসে ওড়াবে তৃপ্তির ঢেঁকুর। ঠিক এভাবেই অতৃপ্ত বাসনায় স্থবির, ক্লান্ত হতে থাকবে বৈদেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্মের পর প্রজন্ম, বিস্মৃত হতে থাকবে উত্তাপহীন প্রবঞ্চিত হতাশ উত্তরসূরি, নব প্রজন্মের তাগিদ কমতে কমতে সত্যিই একদিন ইতিহাসের স্মৃতি থেকে মলিন হয়ে যাবে স্বাধীনতা যোদ্ধা মহান এই অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামীর প্রকৃত অন্তর্ধান রহস্যের গোপন রসায়ন।
সুদীর্ঘ আটশো বছরের দীর্ঘ দাসত্বের খোলস ছাড়িয়ে ভারতমাতার যে বীর সন্তানের হাত ধরে এল ভারতের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, আজ সাতাত্তরটি বসন্ত পেরিয়েও আমরা তাঁর খোঁজ নিলাম না, অনাদরে বিদায় দিলাম, ‘নবকুমারকে বাঘে খাইয়াছে’, ঠিক যেন এই সান্ত্বনায়। দেশ আর রাষ্ট্রের মধ্যে বিস্তর প্রভেদ। দেশ হল বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত একটা বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য গড়ে ওঠা এক ব্যবস্থার নাম হল রাষ্ট্র, যেখানে তৈরি হওয়া এক সুষ্ঠু সাংবিধানিক ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত বাধ্যবাধকতা অপেক্ষা জাতির প্রতি কর্তব্য পালনের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি তীব্র। কারণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক গভীরতায় অন্তর্নিহিত আছে জনগণের প্রতি কর্তব্য পালনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনামা। রাষ্ট্র তা কখনওই এড়িয়ে যেতে পারে না। অথচ স্বাধীনতার এই সুদীর্ঘ কয়েক দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও দেশনায়কের অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচনে পরিলিক্ষিত হল এক নীতিগত ভ্রান্তিবিলাস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় ভারতের স্বাধীনতা লাভের যে সুবর্ণ সুযোগটি লুকিয়ে ছিল, সুভাষচন্দ্র সেটি খুব ভালো ভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকারকে চরমপত্র দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। মতাদর্শগত বিরোধ তৈরি হয় নেতাজির সঙ্গে গান্ধীজির এবং সেই সময় হরিজন পত্রিকায় মহাত্মা লেখেন, ‘We don’t want our freedom out of Britain’s ruin.’ সুভাষ চান পূর্ণ স্বরাজ আর গান্ধীজি চান ডোমিনিয়ন অর্থাৎ ইংল্যান্ডের রানির হাতে স্বায়ত্ত শাসন।
১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা এসেছিল, কিন্তু তার অনেক আগেই ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্দামান-নিকোবরের পোর্টব্লেয়ারের জিমখানার মাঠে ব্রিটিশ শক্তিকে পরাজিত করে সুভাষচন্দ্র বসু সর্বপ্রথম ভারতের জাতীয় পতাকা তুলে ভারতকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। তাহলে সেই অর্থে ভারতের স্বাধীনতা দিবস পালন করা উচিত ছিল ৩০ ডিসেম্বর, আর নেতাজিই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
এখন কেন্দ্রে নমো সরকারের অধিষ্ঠান। দেশবাসীর প্রত্যাশা তাঁর কাছে অনেক বেশি। অনেক সাহসী পদক্ষেপের স্রষ্টা। তাঁর বজ্রকঠিন অভিভাবকত্বের কাছে শুধু একটাই অনুরোধ, অনুগ্রহ করে এই মহান দেশনায়কের অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
