অজয় ভট্টাচার্য

মানুষ-সহ যে কোনও সত্তার সমস্ত কার্যকলাপের সঙ্গে কার্বন ফুটপ্রিন্টের সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই মানুষের পরমায়ু বৃদ্ধির ব্যবস্থার উপকরণসমূহ যত বাড়বে, কার্বন ফুটপ্রিন্ট ততই বাড়বে। একথা বলতে পারছি না যে, আমরা অধিক আয়ু চাই না। আবার কার্বন ফুটপ্রিন্ট বাড়ুক, এটাও চাই না। চাই না জীবের ভারবহনে পৃথিবী অক্ষম হয়ে পড়ুক, সেটাও। পৌরাণিক যুগে মানুষের চিন্তার এই দ্বন্দ্ব ছিল না। তারা অনায়াসে তাদের আরাধ্য দেবতার কাছে অমরত্বের বর প্রার্থনা করতে পারত। কিন্তু আধুনিক মানুষ এসব নিয়ে সূক্ষ্ম চিন্তাভাবনা করে।
অধিক পরমায়ু না সুজলা সুফলা সবুজ পৃথিবী, এ দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে মানুষ আজ বুঝতে পারছে, উভয় শর্ত একসঙ্গে সত্য হওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে থামতে হবে মধ্যবর্তী কোনও স্থানে। কিন্তু তাই বলে একথাও বলার উপায় নেই যে, ‘আমার যেমন বেণী, তেমনি রবে, চুল ভিজাব না’। এ সমস্যার সম্ভাব্য উত্তর মিলতে পারে মানুষের গড় আয়ু বনাম কার্বন ফুটপ্রিন্ট এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট বনাম জীববৈচিত্রের ক্ষতি, এই দুই লেখচিত্রের পর্যালোচনা থেকে। যদিও কিছু সচেতন মানুষ ছাড়া বাকিরা স্বার্থপরের মতো শুধু পরমায়ু বৃদ্ধির বিষয়টিই ভাবছেন। কারণ তাঁরা এত জটিল হিসাবনিকাশে যেতে চান না। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা চার্লস ডিকেন্সের লেখা ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’ উপন্যাসের এবনেজার স্ক্রুজ নামক চরিত্রের মতো হতে পারে। স্ক্রুজের মতো আমরাও হয়তো একদিন আমাদের ভবিষ্যতের সমাধিভূমি দেখতে পাব। বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, বিপর্যস্ত জীববৈচিত্র, প্রকৃতির সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া দূষণের কালো ছায়ার মধ্যে আমরাও স্ক্রুজের মতো আমাদের নামে লেখা সমাধিপাথর দেখতে পাব। স্ক্রুজের মতো আমরাও মৃত্যুর অনিবার্যতা ও জীবনের অর্থহীন দিকের এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়াব। হয়তো তখন আমাদের উপলব্ধিতে আসবে অমরত্বের বাসনা, বিলাসবৈভবের সাধপূরণ করতে গিয়ে পৃথিবী কেবলই রিক্ত হয়েছে।
তাই আমরা যদি আমাদের জীবনযাত্রা না বদলাই, তবে আমাদের মৃত্যুকেও কেউ স্মরণ করবে না, বরং ঘৃণা করবে। হয়তো সেই দিন আমরা আমাদের অদৃষ্টকে শুনিয়ে স্ক্রুজের মতো বলব, ‘হিয়ার মি! আই অ্যাম নট দ্য ম্যান আই ওয়াজ। আই উইল নট বি দ্য ম্যান আই মাস্ট হ্যাভ বিন বাট ফর দিস ইন্টারকোর্স। হোয়াই শো মি দিস, ইফ আই অ্যাম পাস্ট অব অল হোপ।’
