কাজল মুখার্জি

শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারীর চিরকালীন কথা, ‘রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে, যেখানেই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও। আমিই রক্ষা করিব’, এ শুধু কথার কথা নয়, লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে আশ্বাস, শক্তি, আশ্রয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে গভীর দর্শন। অনেকে বলেন, এটা নিছক বিশ্বাস। কেউ বলেন, একনিষ্ঠ ভক্তি। কেউ বলেন, আত্মসমর্পণ। আবার কেউ বলেন, এ সবকিছুর মিলিত প্রকাশ। বাস্তবে কি এমন কিছু হয়?
কিছু মানুষ বলেন, তাঁরা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন কেবল লোকনাথ ব্রহ্মচারীর নাম স্মরণ করে। আবার অনেকেই বলেন, প্রার্থনা করে অসাধ্যসাধন করেছেন। ডাক্তাররা যেখানে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেখানেও অলৌকিকভাবে জীবন ফিরেছে। এ ঘটনাগুলি কি সত্যি? হয়তো সেসব অলৌকিক কিছু নয়, বরং গভীর মানসিক প্রশান্তি, যা বিপদের মুখে স্থির থাকার শক্তি জুগিয়েছিল।
লোকনাথ ব্রহ্মচারীর কথাগুলি কেবল বাইরের বিপদের কথা নয়, আমাদের অন্তরের সংকটের প্রতিও ইঙ্গিত করে। জীবনে যখন আমরা অসহায় হয়ে পড়ি, যখন চারপাশে অনিশ্চয়তা, শূন্যতা, তখন কারও প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাসই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। সে বিশ্বাস কখনও গুরু, কখনও ঈশ্বর, কখনও নিজের মনেরই এক স্তর।
লোকনাথ ব্রহ্মচারী বলেছিলেন, ‘আমি নেই বলে ভেবো না। আমি সর্বত্র আছি। আমি ভক্তদের রক্ষা করি, করব।’ এটা নিছক কথার কথা নয়, এটা ভক্ত ও গুরু বা ঈশ্বরের মধ্যেকার এক গভীর সম্পর্ক। যখন মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বলে, ‘আমি আর কিছু পারছি না। সব তোমার ইচ্ছা, তুমি করো’, তখন সে জায়গাটা আত্মসমর্পণের, যেখানে অহং লুপ্ত হয়, আর অন্যরকম শক্তি ঢুকে পড়ে জীবনে। এখানেই হয়তো লোকনাথ ব্রহ্মচারীর বাক্যের আসল মানে, ‘আমি’ নয়, ‘তুমি’, এ পরিবর্তনই হয়তো রক্ষা করে।
আজকের দুনিয়ায় যেখানে বিজ্ঞান, যুক্তি ও তথ্যের রাজত্ব, সেখানে লোকনাথ ব্রহ্মচারীর এ আশ্বাস কি প্রাসঙ্গিক? অবশ্যই। কারণ ভক্তি বা প্রার্থনা মানে অন্ধবিশ্বাস নয়। এটা এক অন্তর্মুখী যাত্রা, যেখানে মানুষ নিজের অক্ষমতা মেনে নিয়ে এক বৃহত্তর শক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। আর সে সমর্পণ থেকেই জন্ম নেয় সাহস, স্থৈর্য আর প্রতীক্ষা। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর কথাগুলি কেবল অলৌকিক কোনও আশ্বাস নয়, বরং তা আমাদের অন্তরের শক্তি, আত্মবিশ্বাসের উৎস, এবং ভক্তির নির্মল প্রকাশ।
‘রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে’ তো সত্যিই প্রতীক জীবনের প্রতিটি বিপদের। আর সে বিপদে যিনি স্মরণ করেন, তিনি শুধু গুরু বা ঠাকুরকে নয়, নিজের ভিতরের আলোকিত অংশকে ডেকে তোলেন, আর সেখান থেকেই শুরু হয় রক্ষা।
