মতিউর রহমান

বাঙালিরা বই পিপাসু, সংবেদনশীল। বইপাঠ তাঁদের নেশা। সেখান থেকেই তাঁরা পেয়ে এসেছেন মানসিক তৃপ্তির রসদ। কিন্তু বর্তমানে বইয়ের প্রতি বাঙালি পাঠকের আগ্রহ কমে এসেছে। এখানে লাইব্রেরি বলতে সরকার চালিত বইঘরের কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে লাইব্রেরি অবশ্যই রয়েছে। সেগুলি এখনও টিকে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে। তবে প্রয়োজনমতো লাইব্রেরিয়ানের অভাব রয়েছে। যত সংখ্যক লাইব্রেরিয়ানের প্রয়োজন, বর্তমানে তত নেই। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, অভাব তথা শূন্যতা রয়েছে।
বই শুধু আমাদের জ্ঞানই দেয় না, আনন্দ-বিনোদনের খোরাকও জোগায়। বই আমাদের মন ও মনোযোগকে মুক্ত আকাশে নিয়ে যায়। বই আলোর মশাল, বৃহতের দরজা। বই আমাদের জীবন ও সমাজকে নতুন দিশা দেখায়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবাদে মোবাইল ফোন আবির্ভূত হওয়ার কারণে বই পড়ার প্রবণতা যতই কমুক, লাইব্রেরির ভূমিকা মানবজীবন ও সমাজে অপরিসীম। মানুষের মানসিক ক্ষুধা মেটাতে, পাঠককে আনন্দের পৃথিবীতে নিয়ে যেতে যুগে যুগে বই তুলনাহীন ভূমিকা নিয়েছে। বইয়ের জগৎকে আরও বৃহৎ ও বিস্তৃত করতে পাঠাগার তথা লাইব্রেরির ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হলেও এটাই সত্যি, বর্তমানে বইপাঠের প্রবণতা অনেক কমে গিয়েছে। পাঠকের অভাবে বন্ধ হচ্ছে একের পর এক লাইব্রেরির দরজা।
পশ্চিমবঙ্গের লাইব্রেরিগুলির অবস্থা বর্তমানে কেমন? মানুষ কি আগের মতো পাঠাগারে যাচ্ছেন বই পড়তে বা ভাবনার জগৎকে বিস্তৃত করতে? মোবাইল ফোন তথা ইন্টারনেট ব্যবস্থায় কি পাঠকের সব খিদে মিটছে? লাইব্রেরিতে কি পঠনপাঠন নিয়মিত চলছে, নাকি বইগুলিকে শুধু পোকাই কাটছে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বড়ই নেতিবাচক। বর্তমানে এ রাজ্যে পাঠাগারগুলির অবস্থা শোচনীয়। অতীতের আলো ঝলমলে গৌরবগাথা বুকে নিয়ে লাইব্রেরিগুলি বর্তমানে কঙ্কালসার। পাঠকের অভাবে বন্ধ হতে বসেছে শিক্ষা ও সভ্যতার এই অমূল্য রতন।
আমাদের রাজ্যে সরকার পোষিত জেলা-শহর ও গ্রামীণ লাইব্রেরিতে অনুমোদিত মোট কর্মীর সংখ্যা ৫৫২০ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে কর্মরত লাইব্রেরিয়ানের সংখ্যা ১৩২০। অর্থাৎ প্রয়োজনের এক চতুর্থাংশ লাইব্রেরিয়ান রয়েছে মাত্র। পরিসংখ্যান অনুসারে, আমাদের রাজ্যে অনুমোদিত মোট লাইব্রেরির সংখ্যা ২৪৬৭। এই সমস্ত লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ানের ঘাটতি রয়েছে। বইগুলি দেখভাল করার জন্য বা বই বিতরণের জন্য লাইব্রেরিয়ান নেই। ইতিমধ্যে আমাদের রাজ্যে ৬৩৭টি লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাকিগুলির অবস্থা নিভন্ত প্রদীপের মতো। সপ্তাহে এক-আধ দিন খোলা থাকে বা থাকে না। আর পাঠক নেই বললেই চলে। যেহেতু প্রয়োজনের তুলনায় লাইব্রেরিয়ানের সংখ্যা কম, সে কারণে এক একজন কর্মীকে ২, ৩ বা ৪টি লাইব্রেরির দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। ফলে তাঁরা সঠিকভাবে নিজেদের কাজ করতে পারছেন না। বর্তমান লাইব্রেরিগুলির অবস্থা যেন ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো। লাইব্রেরিয়ানের অপ্রতুলতার সঙ্গে বহু কর্মীর ফাঁকিবাজির বিষয়টিও রয়েছে। লাইব্রেরিয়ান নেই, পাঠক নেই। সব মিলিয়ে বর্তমানে পাঠাগারগুলির অবস্থা সঙ্গীন। এককথায়, সেখানে হতাশার পরিবেশ বিরাজ করছে। (চলবে)
