মতিউর রহমান

আমাদের রাজ্যের লাইব্রেরিগুলির গৌরবময় অতীত রয়েছে। লাইব্রেরি ঘিরে গ্রামগঞ্জে মানুষের মধ্যে ছিল বিপুল উৎসাহ। লাইব্রেরির নামে উদ্দীপনার জোয়ার আসত।প্রতিদিন বহু মানুষ লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করে বাড়িতে পড়তেন, আবার ফেরত দিতেন। অনেকে আবার লাইব্রেরিতে বসে গ্রন্থ পাঠ করতেন। নামী লাইব্রেরিগুলি ঘিরে তো ছিল অভূতপূর্ব উৎসাহ ও উদ্দীপনা। শিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রসারে এই লাইব্রেরিগুলি অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করত। পাঠাগার থেকে সাধারণ পাঠক খুঁজে পেতেন শিক্ষা ও বিনোদনের রসদ।
কিছুকাল আগেও লাইব্রেরি ঘিরে মানুষের আকুতির শেষ ছিল না। বইগুলি যেন ছিল বাতিঘর। আলো ছড়াত মানুষের অন্তরে। প্রসারিত করত জ্ঞানের দিগন্তকে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে লাইব্রেরি নিয়ে মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। আমাদের রাজ্যে গ্রন্থাগার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। লাইব্রেরিগুলি হয়ে উঠেছিল শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল।
ক্রমশ মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটেরে যুগ সম্প্রসারিত হওয়ায় লাইব্রেরির বইগুলি তাতে যুক্ত হয়েছে। মোবাইল ফোনে তা পাঠের সুযোগ রয়েছে। তাই বর্তমানে মানুষের বই পড়ার আগ্রহ নেই বললেই চলে। মোবাইল ফোনেও মানুষ আর তেমন বই পড়েন না। কবিতার প্রতি তো আগ্রহ নেই-ই। গল্প পাঠের প্রবণতাও কমে এসেছে ব্যস্ত বাঙালি জীবনে। ফলে ধুঁকছে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাতিঘর লাইব্রেরিগুলি।
১৯৭৭ সালে এ রাজ্যে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পরও লাইব্রেরির প্রতি মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। নতুন নতুন লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা, গ্রন্থমেলার আয়োজন, গ্রন্থাগার পরিষেবা বিভাগের জন্ম নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। যেন নতুন প্রাণ পেয়ে বাতিঘর হয়ে উঠেছিল পাঠাগারগুলি। কিন্তু বর্তমান শতাব্দী থেকে শুরু হল অবক্ষয়।
একসময় গ্রন্থাগার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। অনেক কথন, ভাষণ থাকলেও তার বাস্তবায়ন ততটা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনিক যান্ত্রিকতা, জটিলতা, গণ-উদ্যোগের স্বল্পতা, দলতন্ত্র ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে শুরু হল নিঃশব্দ ক্ষয়। ঘুণপোকা কাটতে থাকল বই, কমতে থাকল মানুষের পাঠের প্রতি আগ্রহ। পরবর্তী সময়ে শুরু হল আরও শোচনীয় দুরবস্থা। নতুন নতুন লাইব্রেরি তৈরি হল না, বরং তা কমে এল। পর্যাপ্ত বইয়ের অভাবও পরিলক্ষিত হল। জেলায় জেলায় গ্রন্থাগার আধিকারিকের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু নিয়োগ হয়নি। একজন আধিকারিকের পক্ষে কয়েকটি জেলার দায়িত্ব পালন কখনওই সম্ভব ছিল না। সব দায়িত্ব তাঁদের ওপর চাপিয়ে দিলেই হয় না। যাঁরা লাইব্রেরি নিয়ে পড়াশোনা করলেন, ডিগ্রি অর্জন করলেন, তাঁরা বেকার থেকে গেলেন। যদি তাঁদের নিয়োগ না দেওয়া হয়, তাহলে লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে কীভাবে সদর্থক ইতিবাচক বার্তা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে? গ্রন্থাগার নেই, গ্ৰন্থাগারিক নেই। কে পাঠকের সামনে মেলে ধরবেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান? কীভাবে লাইব্রেরির প্রতি আগ্রহ তৈরি করা যাবে সাধারণ মানুষের মনে? কীভাবে তাঁদের লাইব্রেরিমুখী করা যাবে? রয়ে গেল অনেক প্রশ্ন।
ফলে বই পাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়। মানুষ লাইব্রেরিবিমুখ হয়ে ওঠেন। বর্তমানে রাজ্যের লাইব্রেরিগুলির অবস্থা এলোমেলো। পাঠকের সঙ্গে লাইব্রেরির দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকল। বর্তমানে লাইব্রেরিমুখী মানুষকে সেভাবে আর দেখা যায় না। লাইব্রেরিতে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও আসবাবপত্রের জন্য অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে সরকারের তরফে। বর্তমানে সেই বরাদ্দ অর্থের পরিমাণও কমে এসেছে। বইয়ের ক্রয়মূল্য বেড়েছে। সুতরাং পত্রপত্রিকা এবং বইপত্রের ঘাটতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে। পাঠকদের কাছ থেকে যে মাসিক চাঁদার ব্যবস্থা ছিল, তাও বন্ধ হয়েছে। এতে পাঠকের ওপর আর্থিক চাপ কমলেও লাইব্রেরির খরচ কোথা থেকে সংগৃহীত হবে?
