কাজল মুখোপাধ্যায়

‘কালী’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘কাল’ থেকে, যার অর্থ সময়। পুরাণ অনুযায়ী, দেবী দুর্গার ক্রোধ থেকে জন্ম নেন কালী, যিনি অসুর নিধনে প্রবৃত্ত হন। তিনি সময়েরও অতীত, মহামায়া— সৃষ্টি ও বিনাশের নিয়ন্ত্রণকারিণী। তাঁর গা শ্যামবর্ণ, গলায় খুলির মালা, হাতে অস্ত্র, কিন্তু এ ভয়ংকর রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মমতাময়ী মাতৃত্ব।
বাঙালির হৃদস্পন্দনে মা কালী কেবল এক দেবী নয়, বরং সময়, ভয়, মাতৃত্ব ও চেতনার এক চিরন্তন প্রতীক। বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি ও লোকজ বিশ্বাসে মা কালী এমন এক দেবী, যিনি একাধারে আদি, ভৌতিক, শাস্ত্রীয় ও লোকবিশ্বাসের সংমিশ্রণে অনন্য স্থান অধিকার করে রয়েছেন। তাঁর উপাসনা যেমন গূঢ় তন্ত্রসাধনার অঙ্গ, তেমনই আবার সাধারণ মানুষের অন্তরেও তিনি আস্থার প্রতীক। শক্তি, রক্ষা, প্রতিশোধ ও মমতার এক জটিল মিশ্রণ।
আবার কাল অর্থাৎ সময়ই সর্বনাশী, ভক্ষক, অন্যদিকে সৃষ্টিরও নিয়ন্তা। পুরাণে বলা হয়, মহামায়া দেবী যখন অসুর নিধনে প্রবৃত্ত হন, তখন তাঁর ভ্রুকুটি থেকে জন্ম নেন কালী—অন্ধকারময়, ভয়ংকর, কিন্তু একইসঙ্গে মাতৃসুলভ রূপধারিণী। দেবী মহাত্ম্যমে তাঁকে বলা হয়েছে, ‘কালিকা তু মহামায়া’— যিনি সময়েরও অতীত, সমস্ত শক্তির উৎস।
শাস্ত্রীয় পূজার বাইরে বাংলার জনজীবনে মা কালীর ভিন্ন আরও একটি ঘনিষ্ঠ উপস্থিতি রয়েছে। মফস্সল, গ্রামাঞ্চল বা শহরে কালীর মূর্তি কখনও একটুকরো কালো পাথর, কখনও শিকড়ে গাঁথা একটি পাথরের মুখমণ্ডল, আর চারপাশে শিউলি ফুল, প্রদীপ, ধূপ এবং ভক্তদের অজস্র আরতি। লোকাচারে মা কালীকে শুধু ধ্বংসের দেবী নয়, বরং সংসারের দুঃখ, রোগ, ব্যাধি, অপদেবতার হাত থেকে রক্ষাকর্ত্রী মাতারূপে দেখা হয়। অনেক জায়গায় গ্রাম রক্ষাকর্ত্রী ‘গ্রামকালী’ বা ‘শ্মশানকালী’ হিসাবে পূজিত হন তিনি।
তন্ত্রে মা কালীর স্থান সর্বোচ্চে। তিনি ‘অদ্বৈত চেতনার’ প্রতীক, যেখানে সৃষ্টির সঙ্গে বিনাশের কোনও ভিন্নতা নেই। শ্মশান বা গহ্বর অঞ্চলকে ধ্যানস্থান রূপে বেছে নেওয়া হয়, কারণ কালী সেখানে বিরাজমান। অহং, ভয় ও মৃত্যুর সীমা ছাড়িয়ে যে শক্তির অভিজ্ঞতা, তা-ই তাঁর তন্ত্র রূপ। তান্ত্রিক গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘যিনি কালীকে ভয় পান, তিনি তাঁকে বোঝেন না। যিনি তাঁকে ভালোবাসেন, তিনি মৃত্যুকেও জয় করেন।’ বাংলার লোকবিশ্বাসে কালী রয়েছেন এক ‘আধিদৈবিক–আদি ভৌতিক সত্তা’ হিসাবে, অর্থাৎ যিনি দেবীও, আবার প্রাকৃতিক শক্তিরও প্রতিরূপ। বজ্রপাত, ঝড়, মহামারি কিংবা হঠাৎ মৃত্যুর ঘটনাকেও বহু স্থানে ‘কালীর ইচ্ছা’ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। লোকমানসে তিনি ভয় ও ভক্তির মিশেলে গড়া এক চিরন্তন শক্তি। যেমন দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালী শান্ত, স্নেহময়ী মাতা রূপে প্রতিষ্ঠিত, তেমনই কালীঘাটের কালী তীব্র, রক্তবর্ণ, তন্ত্রময় রূপে পূজিতা।
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে কালীপূজার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলার নবজাগরণ ও সমাজসংস্কারের ইতিহাস। প্রথম শোভাবাজারে রাজকীয় কালীপূজা হয় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের উদ্যোগে। পরে তা শহরজুড়ে জনপ্রিয় হয়। আজও দীপাবলির রাতে যখন সমগ্র বঙ্গদেশ আলোকিত হয়, তখন কালীর অন্ধকারময়, ভয়ংকর, অথচ আশ্রয়দাত্রী রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আলো কখনও একা আসে না, তার পিছনে থাকে গভীর অন্ধকারের সৃষ্টিশক্তি।
মা কালী শুধু ধর্মীয় দেবী নয়, তিনি দার্শনিকভাবে ‘শূন্য থেকে সৃষ্টির’ প্রতীক। তাঁর খোলা জিভ, খুলির মালা, কাটানো মুণ্ড, সবই প্রতীকী ভাষা, যা অহং, কামনা ও মায়া ত্যাগের ইঙ্গিত দেয়। আধুনিক কালে অনেক মনোবিশ্লেষক কালীকে মানবমনের অবদমিত, অচেতন শক্তির প্রতীক বলেও ব্যাখ্যা করেছেন, যা ভয়ংকর হলেও মুক্তির সম্ভাবনা বহন করে। মা কালী তাই শুধু দেবী নন, তিনি সময়, ভয়, মৃত্যু, রক্ষা, মাতৃত্ব ও চেতনার এক জটিল রূপক। তিনি যেমন শাস্ত্রীয় দেবতা, তেমনই লোকবিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর রূপে যেমন ভয় রয়েছে, তেমনই আশ্রয়ও। তাঁর মুখে যেমন রক্ত, তেমনই করুণা। আজও বাংলার প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি দীপাবলির রাতে, প্রতিটি শ্মশান-ধূপকুণ্ডে মা কালী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ধ্বংস মানেই শেষ নয়, ধ্বংসই নতুন সৃষ্টির আদিম সূচনা।
