Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ধর্ম প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের নীরবতার ব্যাখ্যা

Share Links:

ড. শর্মিষ্ঠা ঘোষ
অধ্যাপিকা, দর্শন বিভাগ
ফকিরচাঁদ কলেজ

এক একজন মনীষীর এক একটি মত বা দৃষ্টভঙ্গীকে কেন্দ্র করে কত গবেষণা চলে থাকে। যেমন, আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক একটি কবিতা, কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কতরকমের গবেষণা আজও চলছে, ভবিষতেও চলবে। কোনও গবেষণাকেই চরম সত্য বলে চিহ্নিত করা যায় না। যে কোনও বিষয়ের ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে নতুন চিন্তার উন্মোচনের, গবেষণার পথ খোলা থাকে। তবে গবেষণার বিষয় সম্পর্কে যদি ব্যক্তি নীরব হন, তবে তো গবেষণায় গবেষকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অধিক পরিমাণে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই থাকে। ধর্ম সম্পর্কে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত নির্ধারণ করতে গিয়ে তা-ই যেন হয়েছে। ‘ধর্ম’ শব্দটি নানার্থবহ। কিন্তু ধর্ম বলতে সাধারণ মানুষ ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মকেই বুঝে থাকে। ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তাকে কেন্দ্র করে বা আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে ব্যক্তির নৈতিক ও মানবিক বিকাশ ঘটে থাকে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে ধর্ম বলতে ‘ism’ বা সম্প্রদায়কে বোঝানো হয় না। ধর্ম হল ব্যক্তির বিকাশ, পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে, মনুষ্যত্ব থেকে দেবত্বে উত্তীর্ণ হওয়া। ধর্মের এ সকল গূঢ় অর্থ অন্তরোপলব্ধির বিষয় বা মানসপ্রত্যক্ষের বিষয়, দীর্ঘ সাধনালব্ধ, কোনও অলৌলিক বিষয় নয়। বাহ্য বিষয়, যেমন, প্রত্যক্ষলব্ধ গবেষণা বিষয়। অন্তরের বিষয়, যেমন, আত্মা, ঈশ্বর, ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা প্রভৃতিও গবেষণার বিষয়। উপলব্ধির বিষয় সাধনালব্ধ এবং সময়সাপেক্ষ।

বিশালাকৃতির এ জগতের বিভিন্ন দিক ও বিভিন্নরকমের কাজ। কোনও একজন মানুষের পক্ষে সকল বিষয়ে জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়। কারণ মানুষের জীবন পরিসর খুবই ক্ষুদ্র। যে কোনও বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান লাভ করে একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করাই একপ্রকার সাধনা। মননশীল পণ্ডিতরা কোনও বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান না হলে সে বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান না।

বিদ্যাসাগর তাঁর কাজ ও চিন্তার জন্য সমাজ বা জগতের একটি দিককে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি জগতের কল্যাণ, সমাজসংস্কার, মানুষের সেবাকেই সাধনা হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। ‘জগদ্ধিতায় চ’ অর্থাৎ একমাত্র জগতের হিতেই নিজের জীবন যাপিত করেছেন। বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে শিবনাথ শাস্ত্রী তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, এক) তিনি বর্তমান সম্পর্কে অতৃপ্ত ছিলেন, দুই) ভবিষ্যৎ রচনা এবং তিন) নিজ আদর্শে অটুট থাকার বিষয়ে তাঁর ছিল প্রবল ইচ্ছাশক্তি। অর্থাৎ বিদ্যাসাগর ঊনবিংশ শতকের সমাজে অশিক্ষা, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ধর্মাচরণ, নারীদের দুর্দশা প্রভৃতিতে অতৃপ্ত ছিলেন, ভবিষতে নতুন এক ভারত গঠন করতে চেয়েছিলেন। তিনি কর্মযোগী পুরুষ ছিলেন। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর কর্ম সম্বন্ধে বলেছেন, ‍‘তোমার কর্ম সাত্ত্বিক কর্ম।’

এককথায়, বিদ্যাসাগরের ছিল নিজ লক্ষ্যে স্থির থাকার এক অপরিসীম মানসিক শক্তি। এবার প্রশ্ন, সমগ্র জীবনে তিনি ধর্ম সম্পর্কে কেন নীরব ছিলেন? তাঁর নীরবতাকে সরব করার চেষ্টা চলেছে বহু যুগ ধরে। কেউ বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, তিনি আস্তিক, কেউ বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, তিনি আস্তিক, আবার কেউ বলেছেন, তিনি অজ্ঞেয়বাদী। কিন্তু এমন তো হতেই পারে যে, তাঁর নীরবতার মূল কারণ হয়তো তিনি নিজেই, ঈশ্বর কী, ধর্ম কী ইত্যাদি প্রশ্নের অন্বেষণে প্রবেশ করতেই চাননি। তাই দৃঢ়, বলিষ্ঠ, স্পষ্টবক্তা বিদ্যাসাগর ঈশ্বর, ধর্ম বিষয়ক কোনও মন্তব্য করেননি। তাঁর ঈশ্বর প্রসঙ্গে বেতের কৌতুকপূর্ণ গল্পটি খুব প্রসিদ্ধ। রামহরি পাল নামক এক কবিরাজ বিদ্যাসাগরকে জিজ্ঞাসা করেন, আচ্ছা মহাশয়, এই যে শাস্ত্রেই মুক্তির কথা দেখতে পাই, সে মুক্তিটা কীরকম? বিদ্যাসাগর সে প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে অন্য কথার অবতারণা করেন। কিছুক্ষণ পরে কবিরাজ ফের সে প্রশ্ন করেন। সেবারও বিদ্যাসাগর নিরুত্তর হয়ে রইলেন। এভাবে চারবার জিজ্ঞাসা করার পর তিনি বিদ্যাসাগর বলেন, কেন বাবু আর এই বুড়া বামুনকে বেত খাওয়াবে? ওই কথা শুনে কবিরাজ অপ্রতিভ হয়ে সবিস্ময়ে বলেন, সে কী মশাই, আমি আপনাকে বেত খাওয়াব কীরূপে?
বিদ্যাসাগর বলেন, ‍তা নয় তো, কী? ও মুক্তি, নির্বাণ, পরলোক, স্বর্গ, নরক সম্বন্ধে তোমার যা ধারণা আছে, তুমি তা-ই নিয়ে থাকো, আমার যা ধারণা আছে, আমি তা-ই নিয়ে থাকি। মুক্তি সম্বন্ধে আমার যা বিশ্বাস আছে, সেটা হয়তো ভুল বিশ্বাস। এ ভুল বিশ্বাসের ফলে মরলে যখন যমের বাড়ি যাব, তখন চিত্রগুপ্ত বলবে, বুড়া বিট্‌লে, মুক্তি সম্বন্ধে তোমার এই ধারণা? দাঁড়াও, তোমার ধারণা ঘোচাচ্ছি। এই বলেই একটা যমদূতকে হুকুম করবে, লাগাও বুড়াকে বিশ বেত। যমদূত এসে আমাকে শপাশপ বেত লাগাবে। এমন সময় হয়তো তুমি সেখানে গিয়ে হাজির হলে। চিত্রগুপ্ত যখন তোমাকে মুক্তির তাৎপর্য জিজ্ঞাসা করবে, তখন তুমি আমার মুখে যা শুনবে, তাই বলবে। চিত্রগুপ্ত যখন জিজ্ঞাসা করবে, এ তত্ত্ব কার কাছে শুনেছিলি, তখন তুমি আমাকে দেখিয়ে বলবে, উনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন। চিত্রগুপ্ত তা শুনে আমাকে বলবে, ‘বটে রে বিট্‌লে বামুন! নিজেও মজেছ, আবার পরকেও মজিয়েছ! এই বলেই যমদূতকে হুকুম করবে, লাগাও বুড়োকে আরও বিশ ঘা। তা বাপু, আমি একে নিজের বেতের ঘায়ে জ্বলে মরছি, তাঁর ওপর তুমি আবার কেন বেত খাওয়াবে? ওসব নিজে বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে বিচার করে যা ভালো বোঝো, তাই করো। অন্য লোককে ওসব কথা জিজ্ঞাসা করে আর ফ্যাসাদে ফেলো না।

গল্পটি শুধু রসিকতা নয়। রসিকতার ছলে বলা হলেও এর মর্মার্থ অতীব গভীর। এক) বিদ্যাসাগর সচেতনভাবে নীরব থাকতে চেয়েছেন, তাই বলেছেন, আমার যা ধারণা আছে, তা নিয়েই থাকতে চাই। দুই) ধর্ম, মোক্ষ, ঈশ্বর সম্বন্ধে তাঁর যে ধারণা, তার নিশ্চয়তা নিয়ে সংশয় ছিল। তাই বলেছিলেন, মুক্তি সম্বন্ধে আমার যা বিশ্বাস আছে, সেটা হয়তো ভুল বিশ্বাস। বিদ্যাসাগরের একাধিকবার উল্লেখিত এই বেতের গল্পটির মর্মার্থটি অনুধাবন করতে হলে ঊনবিংশ শতকের সমাজে ধর্মীয় অবস্থার কথা একটু জানা প্রয়োজন। ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণের ঢেউ বাংলা সংস্কৃতিতে ধর্মচিন্তায় এক জটিল আবর্তের সৃষ্টি করে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু ধর্মের দুর্বলজাত সংহতির সুযোগ ইউরোপীয় খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মপ্রচারের পথ সুলভ করেছিল। নব্য বাঙালির মন ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে তখন উৎকেন্দ্রিক হয়েই ছিল। খ্রিস্টান মিশনারিদের ইন্ধনে একশ্রেণির বাঙালির সাহেব হওয়ার স্বপ্ন অতি সহজেই সফলতা লাভ করে। অন্যদিকে রক্ষণশীল হিন্দু গোষ্ঠীর গোঁড়ামি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই দুই শক্তির টানাপোড়েনে বাংলায় তৃতীয় এক শক্তির উদ্ভব ঘটে এবং তারাই ঊনবিংশ শতকে বাংলা সংস্কৃতির যথার্থ রক্ষক রূপে স্বীকৃতি পায়। এই তৃতীয় শক্তির পুরোধা ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। ঊনবিংশ শতকের এরকম ধর্মীয় কোলাহলপূর্ণ সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবির্ভাব। এ অবস্থায় ‘ধর্ম’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ জানতে হলে একমাত্র পথ হল সাধনার মাধ্যমে নিজেকে উপলব্ধি করা। বিদ্যাসাগর সে পথের পথিক ছিলেন না। তিনি একজন বুদ্ধিদীপ্ত মননশীল মানুষ বলেই অনুভব করেছিলেন ধর্ম, ঈশ্বর প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁর নিশ্চিত ধারণা নেই। এটা এক বিস্ময়কর বিষয় মনে হতে পারে। কারণ ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সকলে কিছু জানুক আর না জানুক, ধর্ম কী, তা সবাই জানে। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র ধর্ম কী, তা জানেন না, একথা মেনে নেওয়া সহজ নয়। ধর্ম, আধ্যত্মিকতা একপ্রকার বিজ্ঞান, অন্তর্বিজ্ঞান।

এবার কথা হল, একজন সাধারণ মানুষকে যদি ভৌতবিজ্ঞানের একটি সমস্যার সমাধান করতে বলা হয়, সে কি পারবে? ভৌতবিজ্ঞান বা রসায়ন সম্বন্ধে কি সকল মানুষের জ্ঞান আছে? না, বাহ্যবিজ্ঞানগুলি সম্বন্ধে পঠনপাঠন ছাড়া কোনও মানুষ উত্তর দিতে পারবে না। তবে অন্তর্বিজ্ঞান ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা সম্বন্ধে সকলের জ্ঞান থাকবে, এমন ধারণা কেন? আসলে বেশির ভাগ মানুষ জানে না যে, ধর্ম, আধ্যাত্মিকতাও একপ্রকার বিজ্ঞান এবং এগুলি জানতে হলেও অন্তরোপলব্ধি দরকার। বিদ্যাসাগর শুধু সমাজসংস্কারকই নয়, তিনি পণ্ডিত, মননশীল, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ ছিলেন। বুঝেছিলেন, ধর্ম বা ঈশ্বর সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান লাভ করা কোনও সহজতর বিষয় নয়। তাই হয়তো তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি এবং এ কারণেই সারাজীবন তিনি নীরব ছিলেন।

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ‘বিদ্যাসাগর কি সত্যিই আস্তিক ছিলেন?’ প্রবন্ধে ঈশ্বরচন্দ্রের আস্তিকতার পক্ষের তিনটি যুক্তি খণ্ডন করেছেন। এক) বোধোদয়ে ঈশ্বর প্রসঙ্গ, দুই) চিঠিতে লিখিত ‘শ্রীহরি শরণম্‌’ এবং তিন) অখিলদ্দিন নামক এক অন্ধ ও খঞ্জ ফকিরের গান প্রসঙ্গ। জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য বিদ্যাসাগরকে নাস্তিক বলে দাবি করেননি, আস্তিক হওয়ার পক্ষে যে যুক্তিগুলি সাধারণত দেওয়া হয়, সেগুলির খণ্ডন করেছেন মাত্র। তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যাসাগরকে যাঁরা আস্তিক বলে মনে করেন, তাঁদের যুক্তি কতটা টেঁকসই, সেটাই আমরা বিচার করব। যদি যথেষ্ট টেঁকসই না হয়, তাহলেও কিন্তু প্রমাণ হবে না যে, বিদ্যাসাগর নিরীশ্বরবাদী ছিলেন। কিন্তু ওই যুক্তিগুলির ভিত্তিতে তাঁকে আস্তিক বলে ধরার কোনও কারণ থাকবে না।’

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এ প্রবন্ধে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও কথোপকথনের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না, কিন্তু বিদ্যাসাগর আস্তিক, এর প্রমাণস্বরূপ অনেকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর সাক্ষাৎকারের বিষয়টি উল্লেখ করে থাকেন। ১৮৮২ সালে বিদ্যাসাগরের বাদুড়বাগানের বাড়িতে ৫ ঘণ্টা (বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা) ধরে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই কথোপকথন চলেছিল। শঙ্করীপ্রসাদ বসু তাঁর ‘রসসাগর বিদ্যাসাগর’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা লিখেছেন, ‘রামকৃষ্ণের পক্ষেও মিথ্যা প্রশংসা করা সম্ভব ছিল না। তাঁর ছিল দেহভেদী, মর্মভেদী দৃষ্টি। সেই সত্যদৃষ্টিতে চালিত তিনি। যে কোনও মানুষের মুখের উপরে স্বচ্ছন্দে এমন সব কথা বলে দিতে পারতেন, যার চেহারা দেখে এমন চমকে উঠতে হয়।… এই রামকৃষ্ণই অধ্যাত্মচরিত্রের মানুষদের বাদ দিলে (যাঁদের অধিকাংশই আবার তাঁর কিশোর বা সদ্যযুবক শিষ্য) বাংলার বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে বিদ্যাসাগর সম্বন্ধেই সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। অথচ বিদ্যাসাগর ঈশ্বর বিষয়ে উৎকণ্ঠিত ছিলেন না, আর রামকৃষ্ণ ঈশ্বর ছাড়া কিছু জানতেন না।’

অন্যদিকে বিদ্যাসাগরের মতো একজন বলিষ্ঠচিত্ত, স্পষ্টভাষী, মননশীল মানুষ সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হয়েই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে কথোপকথনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ধর্ম সম্পর্কে বিদ্যাসাগরের কয়েকটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়। যেমন, ১) ‘মাস্টার (শ্রীম, রামকৃষ্ণকথামৃতের রচয়িতা) একদিন জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, আপনার হিন্দুদর্শন কীরূপ লাগে? তিনি বলিয়াছিলেন, আমার বোধ হয়, ওরা যা বোঝাতে গেছে, বোঝাতে পারে নাই।… মাস্টার আর একদিন তাঁহার মুখে শুনিয়াছিলেন, তিনি ঈশ্বর সম্বন্ধে কীরূপ ভাবেন। বিদ্যাসাগর বলিয়াছিলেন, তাঁকে তো জানার জো নাই। এখন কর্তব্য কী? আমার মতে কর্তব্য, আমাদের নিজেদের এরূপ হওয়া উচিত যে, সকলে যদি সেরূপ হয়, পৃথিবী স্বর্গ হয়ে পড়বে। প্রত্যেকের চেষ্টা করা উচিত, যাতে জগতের মঙ্গল হয়।’ ২) ‘সকলে যদি সেরূপ হয়’ মানে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার আদর্শ রূপ। এর অর্থ দেবত্বে উন্নীত হওয়া বোঝানো হচ্ছে। সকলে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার আদর্শ রূপ হলে অর্থাৎ দেবত্বে উন্নীত হলে পৃথিবী স্বর্গ হয়ে যাবে। ৩) বিদ্যাসাগর ঠাকুর রামকৃষ্ণ সম্বন্ধে ক্ষুদিরাম বসুকে বলেছিলেন, যথার্থ ঈশ্বরবিশ্বাসী লোক একটিও দেখেননি। সে অভাব তাঁর দূর হয়েছিল রামকৃষ্ণকে দেখে, যিনি কেবল সেকালের নন, সর্বকালের ঈশ্বরবিশ্বাসীদের শীর্ষ পর্যায়ের। ঊনবিংশ শতকে সমাজের ধর্মীয় সংঘাত ও তাঁর নীরবতার কারণ অনুসান্ধান করার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের এ বক্তব্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ৪) কাশীধামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বিদ্যাসাগরকে ধর্ম সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করার ইচ্ছাপ্রকাশ করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মত কাহাকেও কখনও বলি নাই, তবে এই কথা বলি, গঙ্গাজলে যদি আপনার দেহ পবিত্র মনে করেন, শিবপূজায় যদি হৃদয়ের পবিত্রতা লাভ করেন, তাহা হইলে তাহাই আপনার ধর্ম।’

মনের পবিত্রতা, শুদ্ধতাই ধর্মের মূল বিষয়, বিদ্যাসাগর সে কথাই যেন এখানে বলেছেন। ‘ধর্ম’ শব্দটির প্রচলিত অর্থ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যথাযথ নয়, তিনি এটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তিনি প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তির (ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব) সংস্পর্শে এসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই বলেন, ‘যথার্থ ঈশ্বরবিশ্বাসী লোক একটিও দেখিনি’, কিন্তু তাই বলে তাঁকে আস্তিক, নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী, কোনও বিভাগের অন্তর্গত করা বোধ হয় ঠিক হবে না। মোট কথা, তাঁর নীরবতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নেওয়াই কাম্য। তিনি একজন দৃঢ়চেতা, স্পষ্ট বক্তা ছিলেন, তাই ধর্ম সম্পর্কে তিনি যদি কোনও স্পষ্ট ধারণায় উপনীত হতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তা ব্যক্ত করতেন।

যে কোনও গবেষণায় চরম সত্যি বলে তো কিছু হয় না। গবেষণা সর্বদা গবেষকের দৃষ্টভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। এ প্রবন্ধটিও সেরকম এক চিন্তার প্রকাশমাত্র। ‘ধর্ম’ বিষয়টিকে সহজ ভেবে নিয়ে অর্থাৎ ধর্ম শব্দার্থের বিভ্রাটেই বিদ্যসাগরের নীরবতাকে সরব করার চেষ্টা চলেছে। অন্যদিকে নীরবতা একপ্রকার শক্তি। আর তিনি তো একজন কর্মযোগী ধার্মিক পুরুষ (দয়া, নিঃস্বার্থ সেবা যাঁর মধ্যে থাকে, তিনি তো অবশ্যই একজন ধার্মিক ব্যক্তি) ছিলেন। এমনও হতে পারে যে, তাঁর ধর্ম সম্পর্কে নীরবতার শক্তিই জীবনের কর্মক্ষেত্রে চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছিল। তাই এ নীরবতাকে বিশেষ বিভাগে না ফেলে, সরব না করে সম্মানজ্ঞাপন করাই তাঁর প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জানানো হবে।

তথ্যসূত্র:

১) যোগেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায়, স্মৃতিতে সেকাল, ১৯৫০, পৃ ৩৩
২) রসসাগর বিদ্যাসাগর, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, পৃ ৫২
৩) রসসাগর বিদ্যাসাগর, পৃ ৪৭

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए