শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

৭৯তম স্বাধীনতা দিবসে দেশ কতটা এগিয়েছে, যাঁরা স্বাধীনতাপ্রাপ্তির একদশকের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁরাই ভালো অনুভব করতে পারবেন। দেশ যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন গরুর গাড়ি, নৌকোর যুগ। পশ্চিমবঙ্গের নদনদীতে কোথাও সেভাবে পাকা সেতু ছিল না। রাস্তাঘাট ছিল শীর্ণ স্বল্পদৈর্ঘ্যের। বাষ্পচালিত বাস চলত।
আজ যে উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ, তার মাঝখানে সংযোগকারী ফরাক্কা ব্রিজ ছিল না। ১৯৭৪ সালে এই গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ চালু হয়। তার আগে দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ যেতে প্রাণান্তকর অবস্থা হত। এখনকার মতো উন্নত লঞ্চ ছিল না। প্রাণ হাতে নিয়ে দাঁড় টানা নৌকোয় ফরাক্কার উত্তাল গঙ্গা পারাপার করতে হত। দুর্গাপুর ব্যারেজ ছিল না। পেট্রল ও ডিজেলের বাস বর্ষাকালে ১০ কিলোমিটার পথও চলতে পারত না। বাধা হত নদনদী, খাল, জোড় প্রভৃতি। তখন সাইকেল সবেমাত্র বড়লোকদের ঘরে ঢুকেছিল। কখন কখনও মোটর সাইকেলের দেখা মিলত। ১৯৮০ সালের প্রথমদিকেও মহিলারা সাইকেল চালাতেন না। ১৯৮০ সালে বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজের মতো নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাইকেল ঘরে গোটা বিশেক সাইকেল থাকত, এটা আমার দেখা। টিভি ছিল না। সংবাদমাধ্যম হিসাবে ছিল খবরের কাগজ এবং রেডিয়ো।
যাঁরা স্বাধীনতাপ্রাপ্তির দু’-পাঁচ বছরের মধ্যে জন্মেছেন, তাঁরা স্বীকার করবেন, তখন গ্রামে গ্রামে পাঠশালা বা প্রাইমারি স্কুল ছিল না। পাঠশালায় পড়তে বহুদূরের গ্রামে যেতে হত। হাইস্কুল এত বেশি ছিল না। পাঁচ-ছয়ের দশকে চাঁদা তুলে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা বহু বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা অবৈতনিকভাবে শিক্ষাদান করতেন। এত বেশি হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল না। এত বেশি চিকিৎসকও ছিলেন না।
হাইপ্রেসার, ডায়াবেটিস, এ সমস্ত রোগের নাম তখন জানাই ছিল না। কবিরাজের লতাপাতার বটিকা, এলএমএফ ডাক্তারবাবুদের লাল জোলাপ ওষুধেই তখন সীমাবদ্ধ ছিল চিকিৎসা পরিষেবা। ফোঁড়া, কাটাছেঁড়ায় অপারেশন করতেন স্থানীয় প্র্যাকটিশনাররা। স্থানীয় লোকজন তাঁদের হাতুড়ে ডাক্তার বলতেন। অজ্ঞান না করেই রোগীকে যন্ত্রণা দিয়ে চলত অঙ্গ কাটাছেঁড়ার কাজ। রোগী যন্ত্রণায় গগনভেদী চিৎকার করতেন। হাত-পা ভেঙে গেলেও কবিরাজরা ভীষণ যন্ত্রণা দিয়ে ভাঙা স্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধতেন। ট্রেন থাকলেও গতি বেশি ছিল না। হাওড়া থেকে দিল্লি বা পুরী পৌঁছতে দু’দিন লেগে যেত। প্যাডেল দেওয়া সাইকেল রিকশা খুব কম ছিল। শহরাঞ্চল ছাড়া বিদ্যুৎ ছিল না।
এখন দুর্গোৎসব কী বিশাল আকারের হয়! কিন্তু স্বাধীনতার প্রথম দশকেও হাতে গোনা কয়েকটি দুর্গাপুজো হত। প্রতিমা দর্শনের এমন হুজুগ ছিল না। হ্যাজাক লাইটে বিয়েবাড়ি বা সামাজিক উৎসব হত। আজ স্বাধীন ভারতের প্রতিটি গ্রামাঞ্চল উন্নত। রাস্তাঘাট সুন্দর। তবে বেকারত্বের ব্যাপক সমস্যা রয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশে যথেষ্ট সংখ্যক কলকারখানা হয়নি। শিক্ষিতের সংখ্যা বেড়েছে। কর্মসংস্থানের সংকট বেড়েছে। বড় বড় কথা ছেড়ে দেশের শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের চাকরির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। তা না হলে দেশ তথা রাজ্যের কোনও উন্নয়নই দেশকে প্রকৃত উন্নত করতে পারবে না।

Banglar modhye diye Bharat dorshon.