শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

স্বাধীনতার আগে ক্ষৌরকর্ম বিষয়টি আজকের মতো এমন আধুনিক ছিল না। পাঁচ-ছয়ের দশকেও ছোট শহরে চুল-দাড়ি কাটার সেলুন ছিল না। গ্রামগঞ্জে চুল-দাড়ি কাটা হত সপ্তাহান্তে একবার। ধান বা অর্থের বিনিময়ে নাপিতমশাই ঘরে-ঘরে চুল-দাড়ি কামিয়ে দিয়ে যেতেন। দাড়ি জল দিয়ে ভেজানো হত। দাড়ি কাটার ক্রিম তো দূরের কথা, কামানোর সাবান পর্যন্ত ছিল না। লোহার তৈরি ক্ষুর দিয়ে চুল দাড়ি কামাতেন। কেটে গিয়ে রক্ত বেরোলে ফিটকিরি বুলিয়ে দিতেন। কোনও কোনও গ্রামে গাছের তলায় নাপিতমশাই চুল, দাড়ি, নখ কাটার সরঞ্জাম নিয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থাকতেন। ইট বা ছোট চৌকির উপর খদ্দেরকে বসিয়ে চুল-দাড়ি কামিয়ে দিতেন। বিদ্রুপ করে অনেকেই চুল-দাড়ি কাটার এই ব্যবস্থাকে ‘ইটালিয়ান সেলুন’ বলতেন।
গ্রাম ও শহরে কারও বাড়িতে অশৌচ হলে ক্ষৌরকর্মের দিন এখনও মাটিতে বসে চুল-দাড়ি কামানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু গ্রামে এখনও খদ্দেরকে ছোট টুলের উপর বসিয়ে নাপিতমশাই চুল-দাড়ি কামাচ্ছেন, এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে তা বিরল ঘটনা। অতীতে যে লোহার ধারালো ক্ষুর ব্যবহৃত হত, বর্তমানে তা উধাও হয়ে গিয়েছে। এখন নানা ধরনের ব্লেড ক্ষুর ব্যবহারের চল হয়েছে।
গ্রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে তিতাকুলি এবং মৃত পশুপাখির দেহ ফেলার ভাগাড়। অতীতে প্রত্যেক গ্রামে একাধিক তিতাকুলি থাকত। অশৌচ পরিবারের ব্যবহৃত রান্নার আসবাবপত্র, মাটির হাঁড়ি, জলের মাটির কলসি ফেলে আসার ফাঁকা জায়গাকে তিতাকুলি বলা হত। জন্ম ও মৃত্যুর সময় ব্যবহৃত বস্তু ছোঁয়াচে হয়ে যেত। সেজন্য সেসব জিনিস ফেলে আসা হত। নতুন কিনে তা ব্যবহার করা হত। বর্তমানে মাটির বাসনপত্র, রান্নার সামগ্রী নেই। সমস্তই স্টিল ও এনামেলের। তবুও রীতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী পরিবারের কেউ প্রয়াত হলে নতুন মাটির হাঁড়িতে ভাত রান্না করে তিন দিনের মাথায় ভায়াদদের খাওয়ানো হয়। শোকের আবহে এই খাওয়া ভায়াদ আত্মীয়বর্গরা তিতামুখ করে খান বলে একে তিতাভাত বলা হয়। রাতের অন্ধকারে মাটির হাঁড়ি ও খোলাকে একটি কুলি বা স্থানে ফেলে আসা হয়। এই প্রথাকে আজও বলা হয় ‘হাঁড়ি বাড়ানো’। জায়গাটিকে বলা হয় তিতাকুলি। বর্তমানে নতুন প্রজন্ম তিতাকুলি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারছে না। তিতাকুলি হারিয়ে যাচ্ছে।
গ্রামগঞ্জের বর্তমান সমস্যা ভাগাড় নিয়ে। বর্তমানে এমনিতেই গরু, ছাগল, মোষ পোষা অনেক কমে গিয়েছে। কোনও গৃহস্থের পোষ্য যদি মারা যায়, তা ফেলে আসার জায়গা নেই। এ এক মস্ত সমস্যা।
নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস হয়ে গিয়েছে আদ্যিকালের টেলিফোন। ছয়-আটের দশকেও ঘরে ঘরে টেলিফোন, মোবাইল ফোন ছিল না। কলকারখানা, অফিসে টেলিফোন ছিল। রিসিভারটি ছিল বেশ বড়। ডায়াল ঘুরিয়ে ফোন করা যেত না। রিসিভার কানে নিলেই টেলিফোন দফতর থেকে কানে কথা আসত, ‘নম্বর প্লিজ’। অর্থাৎ যাকে ফোন করা হবে, তার নম্বরটি মুখে বলতে হত। দফতরের বাবু সংযোগ দিতেন। কোনও কথাই গোপন থাকত না। যিনি টেলিফোন দফতরে বসে কানেকশন বা সংযোগ দিতেন, তিনি দু’পক্ষের কথা শুনতে পেতেন।

