শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

কাঁথা তৈরির জন্য বিভিন্ন সাইজের সূচ, নানা রঙের সুতো, রং-সিঁদুর ফেরিওয়ালারা গ্রামে গ্রামে বিক্রি করতে আসতেন। গ্রামের মহিলারা এসব জিনিস ফেরিওয়ালাদের কাছে অথবা গ্রামের মনোহারি দোকান থেকে কিনতেন। শহরে যাওয়া সে সময় দুঃসাধ্য ছিল। কাঁথায় ফুল তোলায় দক্ষ বহু মহিলা ছিলেন। পুরুষরাও কাঁথা তৈরি করতেন। ঘরে ব্যবহৃত ধুতি-কাপড়-চাদর দিয়েই কাঁথা তৈরি হত।
স্বাধীনতার আগে ওয়ান্ডারার, রোলস রয়েস সিলভার ইত্যাদি চারচাকার বিলাসবহুল ছোটগাড়ি ছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বয়ং ওয়ান্ডারার ডবলু ২৪ গাড়িতে চড়তেন। স্বাধীনতার পর পাঁচ থেকে সাতের দশক অবধি এমন গাড়ি রাস্তায় দেখা গিয়েছিল। তারপর অ্যাম্বাসাডর, জিপ সেই বিলাসবহুল গাড়িগুলির জায়গা নেয়। এখনকার প্রজন্মের কাছে অ্যাম্বাসাডর, জিপ প্রায় হারিয়েই গিয়েছে। অথচ কিছুদিন আগেও মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী থেকে দেশ ও রাজ্যের আধিকারিক, ব্যবসায়ীরা অ্যাম্বাসাডরে চড়তেন। অতীতের বহু হিন্দি ও বাংলা সিনেমায় অ্যাম্বাসাডর ও জিপ দেখা যায়। কলকাতায় এখনও ট্যাক্সি নামে অ্যাম্বাসাডর দেখা যায়। জিপ হারিয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে টাটা সাফারি, মাহিন্দ্রা স্করপিও, টয়েটো ইনোভার যুগ। একদিন কালের নিয়মে এগুলিও হারিয়ে যাবে। স্বাধীনতার পর পাঁচ-ছয়ের দশকেও বড় পরিবার ছিল। তিন ভাই, পাঁচ ভাই, বাবা-মা, দাদু-ঠাকুমা নিয়ে বড় সংসার দেখা গিয়েছে। বউরা মিলিজুলি করে কুটনো কাটা, জল আনা, রান্না করা, খেতে দেওয়ার কাজ করতেন। অতীতে ঘরের উঁচু দাওয়া বারান্দা থাকত। সেখানেই পুরুষরা একসঙ্গে গল্প করতে করতে খাওয়াদাওয়া করতেন। ওই পরিবারগুলি একান্নবর্তী হিসাবে পরিচিত ছিল। অনেক একান্নবর্তী পরিবারে কুয়ো, নলকূপ ইত্যাদি থাকত। খাটা পায়খানা থাকত। পাঁচের দশকের পর সেপটিক পায়খানাও নির্মিত হয়। যে সমস্ত একান্নবর্তী পরিবারে শৌচালয় থাকত না, তাঁরা পুকুরে যেতেন।
বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবারের দেখা মেলা ভার। এখন সমস্ত পরিবার আপন সুখের জন্য ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান, এ নিয়েই এখন ছোট সংসার। বয়স্ক মা-বাবাদেরও সংসারে ঠাঁই হয় না। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ছোট পরিবার নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি নামে পরিচিতি পেয়েছে। ভালো বাংলায় এ ধরনের পরিবারকে অণু পরিবার বলা হচ্ছে।
একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবার বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। যৌথ পরিবার ছিল দুধের যুগ। আজকের গরু খামারের মতো বাড়িতেই দশ-বিশটা করে গরু থাকত। ঘরের কর্তা-কর্ত্রী বা মাইনদার গরুর দুধ দুইতেন। সেই দুধ কাঠের আগুনে কম আঁচে ফোটানো হত। পরিবারের শিশু থেকে বড়রা দুধ-চাঁছি-ঘি প্রভৃতি ইচ্ছেমতো খেতেন। ভাতের পাতে মাছ পড়ত। মাছের অভাব ছিল না। প্রত্যেক একান্নবর্তী পরিবারে পুকুর, ডোবা থাকত।
তবে অতীতে আজকের মতো এত বেশি ডিম মিলত না। একটি ডিমের অর্ধেক অংশ পাতে পড়লেও তা শিশুরা আনন্দ করে খেত। মুরগি মাংস সব পরিবারে খাওয়ার চল ছিল না। বহু পরিবারে মুরগি মাংস নিষিদ্ধ ছিল। মুরগির মাংস তো দূরের কথা, মুরগিকে স্পর্শ করলে স্নান করে ঘরে ঢুকতে হত।
সে সময় উঠোনে উঠোনে লাউয়ের মাচা থাকত। রান্নার জ্বালানি ছিল কয়লা ও কাঠ। পাঁচ-ছয়ের দশকে কয়লার গুঁড়ো বা গুল পাওয়া যেত না। গ্রামে গ্রামে কয়লা ডিপোয় কয়লা এবং পাড়ার কোথাও না কোথাও কাঠ-কুচো কিনতে মিলত। জঙ্গল প্রান্তের গ্রামের দরিদ্র প্রান্তিক মানুষরা কাঠ-কুচো কেটে ঘরে ঘরে বিক্রি করতে আসতেন। শালপাতা বিক্রি করতে আসতেন। ঘরে ঘরে কয়লা ভাঙার হাতুড়ি থাকত। কয়লা ও কাঠের চুলোই ছিল অতীতের ভরসা। অতীতে মাড়ভাত বা ফ্যানভাত, পান্তভাত খাওয়ার খুব চল ছিল। যুবক-যুবতী থেকে কিশোর-কিশোরীরা শরীর গঠনের জন্য মাড়ভাত খেত। মাড়ভাত বা ফ্যানভাত হল ভাত সেদ্ধ করা জল। ভাত তৈরি হয়ে গেলে হাঁড়ি উপুড় করে ফ্যান বা মাড় পৃথক করে নেওয়া হত। এই পদ্ধতিকে বলা হত ভাতের ফ্যান গালা। কানা উঁচু জামবাটি বা থালায় ফ্যানের সঙ্গে অল্প পরিমাণ ভাত মিশিয়ে তাতে পরিমাণমতো নুন দিয়ে পাতার খালা, ছোট কাপ বা বাটিতে করে ফ্যানভাত খাবার মজাই ছিল আলাদা। বর্তমানে শিশুদের মাড়ভাত বা ফ্যানভাত খাওয়ানো হয় না। দরিদ্র, কৃষক পরিবারে আজও ফ্যানভাত বা মাড়ভাত খাওয়া হয়। (চলবে)
