ফাল্গুনী ঘোষ

থ্রি চিয়ার্স ফর ক্লাস সিক্স হিপ হিপ হুররে…। ফুটবল ম্যাচে জিতে একদল ছেলে হইহুল্লোড় করছে। এই শুরু হল জীবনের আইডেনটিটি, যার শুরু একটা কালেকটিভ কনসাসনেসের মধ্য দিয়ে। বাচ্চা যত বড় হতে থাকে, এ প্রবণতা ধীরে ধীরে তত বাড়তে থাকে। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। সে কোনও একাকী দ্বীপের বাসিন্দা নয়, হতেও চায় না।
পোলিশ ইংলিশ কথাকার জোসেফ কনরাড তাঁর The Lagoon ছোটগল্পে একটি প্রেমকাহিনিকে মূর্ত করার মধ্য দিয়ে মানুষের একাকিত্ব ও তার যন্ত্রণাকে বোঝাতে চেয়েছেন। আরসাত আর ডায়ামিলিনের প্রেম তাদের অনিবার্য পরিণতিতে নিয়ে যায় মালয়েশিয়ার একটি দ্বীপে। রাজার কুটিল রোষ ও প্রাণনাশের হুমকিকে এড়াতে গিয়ে তারা প্রেমের তরি ভাসিয়ে চলে যায় একটি জনশূন্য দ্বীপে। খাবার ও ওষুধের অভাব তাদের ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কনরাড বোঝাতে চেয়েছেন যে, The society is corrupted, but solitude is destructive. জোটবদ্ধতা ও যূথতা মানুষের জন্ম থেকেই বিদ্যমান। মানুষের আদিম সত্তা তা-ই এবং আদিমানব একসঙ্গে বেঁচেছিল। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জোট বাঁধতে হয়।
২০২৩ সালে ভারতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ২৬টি বিরোধী দলের আইএনডিআইএ নামের জোট গঠন কালেকটিভ আইডেনটিটিকে প্রমাণ করে। আবার এসব রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের ইনডিভিজুয়াল আইডেনটিটিকে বজায় রাখতে নিজের রাজ্যে ক্ষমতার জন্য লড়ে। এখানে এসে যায় ডারউইনের Struggle for existence and survival of the fittest তত্ত্ব। নীতি ও নৈতিকতা, আদর্শের পরাকাষ্ঠাকে পাশ কাটিয়ে এসব চলে, করতে হয়। নৈতিকতার পথে চললে অস্তিত্বের সংকট। অস্তিত্বের সংকট মানে মৃত্যু। ঠিক সেজন্য কবি-সাহিত্যিক, শিল্পীরা লাইমলাইটের অস্তিত্বকে বজায় রাখতে প্রশাসনে থাকা সরকার চরম দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও তারই অলিন্দে ঘোরাফেরা করেন। ক্ষমতাসীন সরকার যদি পড়ে যায়, তখন তাঁরা ফের নতুন সরকারের নৌকোয় গিয়ে উঠে পড়েন। আর রাজনীতির কারবারিরা তো আরও একধাপ এগিয়ে। সুতরাং সততা, নৈতিকতা, এসব বিষয় যাঁরা মেনে চলেন, তাঁদের বেঁচে থাকাটাও বিপন্ন হয়। তবে সত্যিকারের মানুষ আদর্শের পথ থেকে বিচ্যুত হন না। যেসব মানুষের নিজের ওপর আস্থা কম, ভিতরে ভঙ্গুর, নিজের ব্যক্তিপ্রতিভা সীমিত, অথচ নাম-যশের জন্য কাঙাল, যাঁদের সৎ সাধনা নেই, তাঁরা যেভাবে হোক জনতার মধ্যে নিজেদের জনপ্রিয় করার জন্য রঙিন আলো ঝলমলে মঞ্চে মঞ্চে ঘুরে বেড়ান।
জীবনানন্দের সাধনা নীরব। মানুষ তাঁকে সমসময়ে বরণ করার প্রজ্ঞা না দেখাতে পারলেও পরবর্তী কালে তিনি আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় বরণীয় কবি। কিন্তু এ সময়ের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা, সরকারি পুরস্কারে ভূষিত কবিদের কী দুরবস্থা দেখুন! এঁদের দেখলে কীরকম যেন করুণা হয়, আর ঘৃণা জাগে না। কারণ এঁরা আর লিখতে পারেন না। তাই লেখার ক্ষমতা না থাকলে বানিয়ে বানিয়ে কেউ লিখছেন প্রেমের দুর্বল কবিতা। কেউ লিখছেন কৃত্রিম রামকৃষ্ণ কবিতা, যা লিখতে গেলে যাপনে হতে হয় সাত্ত্বিক। কবির কাছ থেকে যদি কলম কেড়ে নেওয়া হয়, তা সৈনিকের কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নেওয়ার মতো।

চমৎকার