Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

অষ্টাদশ শতকের হিন্দু রিভাইভ্যালিজম: ঐতিহাসিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ

Share Links:

ড. গৌতম মুখোপাধ‍্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

অষ্টাদশ শতক ছিল ভারতের ইতিহাসে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, সাংস্কৃতিক উত্তরণ ও আত্মপরিচয় সন্ধানের যুগ। মোগল সাম্রাজ্যের অবক্ষয়, মারাঠা শক্তির উত্থান, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির আগমন এবং তার মধ্যে হিন্দু সমাজে যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ঘটেছিল, তাকেই হিন্দু রিভাইভ্যালিজম নামে অভিহিত করা হয়।

ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭) পর মোগল সাম্রাজ্যে কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হতে থাকে। সে সময় রাজপুত, মারাঠা, শিখ ও অন‍্যান‍্য আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটে। মারাঠা সাম্রাজ্য, বিশেষত পেশোয়া বলাজি বাজিরাওয়ের আমলে হিন্দু পরিচয় ও ধর্মীয় একতা জোরদার হয়। সে সময় ব্রিটিশ, ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি বাণিজ্য ও রাজনীতির মাধ্যমে ভারতের ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তার করে। হিন্দু সমাজ এ নতুন রাজনৈতিক-সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। কিছু অঞ্চলে ইসলাম ধর্মে রূপান্তরের বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজ আত্মরক্ষা ও শুদ্ধাচার পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি পাশ্চাত্য শিক্ষা, খ্রিস্টান মিশনারিদের আগমন এবং ব্রিটিশ আইনব্যবস্থা হিন্দু আচারব্যবস্থার কাছে  চ্যালেঞ্জ রূপে হয়ে ওঠে। কবীর, শ্রীচৈতন‍্যদেব, রামানুজ, তুলসীদাস, মীরা, সন্ত একনাথ প্রমুখর ভাবধারা নতুনভাবে পুনরুদ্ধার হয়। ধর্মের সামাজিক-মানবিক রূপ জনপ্রিয় হয়। অদ্বৈত বেদান্ত ও ধর্মীয় অভ্যন্তরীণ বিশুদ্ধতার প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

অনেক হিন্দু পণ্ডিত ও আচার্য বর্ণভেদকে শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা হিসাবে প্রচার করে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ভক্তি আন্দোলন এ কঠোর বর্ণবিভাজনের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিল। পণ্ডিতরা শাস্ত্র ব্যাখ্যায় মনোনিবেশ করেন। ধর্মতত্ত্বকে রক্ষা ও প্রচারে মনোনিবেশ করেন। যেমন, কাশীর পণ্ডিত সম্প্রদায়। চৈতন্য ভাবধারা নতুনতর উদ্দীপনায় পুনরুজ্জীবিত হয়। কীর্তন ও নামসংকীর্তনের প্রভাব সমাজে ব্যাপক হয়। দক্ষিণ ভারতের হিন্দু মঠ ও ধর্মগুরুরা ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা ও বিশুদ্ধতার ওপর জোর দেন। তামিল দেশজ শৈব ও বৈষ্ণব ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। আলভার ও নায়ানারদের রচনা নতুনভাবে প্রচারিত হয়।

মহারাষ্ট্রে শিবাজীর ঐতিহ্যকে ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় রূপান্তর করা হয়। গীতার ব্যাখ্যাকে ব্যবহার করে হিন্দু শাসনের বৈধতা নির্মিত হয়। হিন্দু পুনরুত্থানবাদী আন্দোলনে সংস্কৃত শিক্ষা, বেদ, পুরাণ ও দর্শনের পুনরুদ্ধার লক্ষ করা যায়। গুরু-শিষ্য পরম্পরার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এই গুরুকুলই প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ধারক ছিল। গৃহশিক্ষার বাইরে তীর্থস্থানভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্রও গড়ে ওঠে।

ইসলামি সমাজেও ধর্মীয় বিশুদ্ধতা ও শুদ্ধাচারের আহ্বান দেখা যায়। ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া হিসাবে দুই সম্প্রদায়ই আত্মসংরক্ষণের পথে চলে। তবে এটা ঠিক যে, নিম্নবর্ণ ও অস্পৃশ্যদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। কেননা তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো সেভাবে বিস্তৃত হয়নি অথবা তারা এটিকে উপর তলার আধিপত্যের সংগ্রাম হিসাবে দেখেছিল। আবার তখনও পর্যন্ত নারীশক্তি পরদানশিন থাকার কারণে প্রগতিশীলতার পক্ষে সরাসরি অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল।

অষ্টাদশ শতকের হিন্দু রিভাইভ্যালিজম ছিল এক আত্মসন্ধানী ও আত্মরক্ষামূলক প্রচেষ্টা, যেখানে ধর্মীয় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার, সামাজিক সংগঠন মজবুতকরণ এবং আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রাম একত্রে মিলিত হয়েছিল। এটি একদিকে যেমন ঔপনিবেশিক আধিপত্য ও ধর্মান্তরকামী প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, অন্যদিকে সমাজের বিভিন্ন অংশকে একতাবদ্ধ করে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে দেয়।

অষ্টাদশ শতকের হিন্দু রিভাইভ্যালিজম মূলত ধর্মীয় শুদ্ধাচার পুনঃস্থাপনের প্রয়াস ছিল। শাস্ত্র, আচার ও ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোকে রক্ষা করে হিন্দু আত্মপরিচয়কে অক্ষুণ্ণ রাখার এক প্রতিক্রিয়াশীল প্রচেষ্টা হিসাবে এর জন্ম। মোগল ও ব্রিটিশ শাসনের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম রক্ষাই এর প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ইসলাম এবং তার পরে খ্রিস্টান মতবাদের একবগ্গা আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সামাজিক প্রয়োজনীয়তাও দৃশ‍্যমান হয়ে ওঠে। এজ‍ন‍্য প্রতিক্রিয়াশীল এবং প্রগতিশীল, উভয় অভিধাই জোটে। তবে এটি যে বৃহত্তম সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ছিল, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মন্দির, পুরোহিত, ব্রাহ্মণ শ্রেণির ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনায় তা প্রতীয়মান হয়। এখানে কোনও নতুন ধর্মতত্ত্বের উদ্ভাবন ছিল না, বরং অতীতকে পুনরুদ্ধার করাই লক্ষ্য।

অন্য পোস্ট: চাকরি হারিয়ে যাওয়াটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক: ফাল্গুনী সিংহবাবু

এ আন্দোলনের কোনও সর্বভারতীয় নেতৃত্ব বা সংহত নীতিকাঠামো ছিল না। বরং এটি ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধর্মীয় আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা। ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনাকালীন নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই ছিল মুখ্য লক্ষ্য। এটি একধরনের আত্মরক্ষামূলক জাতীয়তাবাদী চিন্তার আগমনী সূচনা হিসাবে কাজ করে। ধর্মীয় অনুভবের ব্যক্তিগত রূপ কিছু মাত্রায় মানুষের মধ্যে পুনরায় সক্রিয় হয়। এদিকটি হিন্দু ধর্মকে জনসম্পৃক্ত করে তোলে। তাই হিন্দু রিভাইভ্যালিজমকে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের পরিণাম হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ভাষা, নৃত্য, সংগীত ও ধর্মচর্চায় এক নবগরিমাপ্রসূত আত্মগৌরবের জন্ম দেয়। পরবর্তীকালে ঊনবিংশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি এই আত্মপরিচয়ের অনুশীলনের মধ্যেই গড়ে ওঠে।

হিন্দু রিভাইভ্যালিজম ছিল ‘রেনেসাঁ’ না ‘রেস্টোরেশন’? এ প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রেনেসাঁ অর্থে নতুন সৃজন, চেতনার উন্মেষ, মননের বৈপ্লবিকতা, যা ইউরোপে ঘটেছিল। হিন্দু রিভাইভ্যালিজম ছিল মূলত পুরোনো ধর্মীয় অনুশাসনের পুনরাবৃত্তি ও রক্ষাবাদ, যা নবসৃষ্টি নয়। সুতরাং এর প্রকৃতি ছিল পুনরুদ্ধারমুখী ও আত্মরক্ষামূলক। তবে প্রগতিশীলতার সঙ্গে তাল মেলানোতেই এটি বিশ্বাসী ছিল।

অষ্টাদশ শতকের হিন্দু রিভাইভ্যালিজম ছিল একটি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া, যার প্রকৃতি ছিল রক্ষণশীল, আঞ্চলিক এবং আচারনির্ভর। এটি সমাজ সংস্কার বা সর্বজনীন ধর্মবোধের চেয়ে ধর্মীয় গৌরব ও ব্রাহ্মণ্যবাদী শুদ্ধতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী চিন্তার ভিত্তি হিসাবে এর প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন‍্যাসে তা ব‍্যক্ত হয়েছে। আর তার প্রতিক্রিয়া পরিব‍্যাপ্ত হয়েছে ক্ষাত্রতেজের উদ্গীরণে, মন্ত্রগুপ্তির শপথের মাধ্যমে।

4 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए