Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব এক মনোবৈজ্ঞানিক ইতিহাস

Share Links:

ড. গৌতম মুখোপাধ‍্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

সিগমুন্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬–১৯৩৯) ছিলেন মনোবিশ্লেষণ (Psychoanalysis) নামক একটি মৌলিক বিদ্যাশাখার জনক, যিনি মানুষের অবচেতন মনের অন্তরাল থেকে উদ্ভূত অনুভূতি, ইচ্ছা ও চেতনার রূপান্তর বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষের আচরণের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ মনোবিশ্লেষণ চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লিবিডো তত্ত্ব, যা মানুষের অভ্যন্তরীণ শক্তির (psychic energy) একটি যৌনপ্রবণতা নির্দেশ করে। এ তত্ত্ব মনোবিকাশের ধাপ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার সংঘর্ষ, স্বপ্ন ও স্নায়বিক রোগের ব্যাখ্যা এবং সমাজ-সংস্কৃতির মধ্যে যৌনতার ভূমিকাকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করা হয়।

ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব হল, ‘libido is the driving energy that powers the human psyche not only for sex, but for all of life’s pursuits. In everyday conversations, it usually refers to a person’s level of sexual appetite.’ ফ্রয়েডের মতে, এ লিবিডোই মানবজীবনের প্রাথমিক প্রেরণা শক্তি, যা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায় এবং ব্যক্তি ও সমাজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

ফ্রয়েড হলেন অস্ট্রিয়ান চিকিৎসক, স্নায়ুবিশেষজ্ঞ এবং তত্ত্বপ্রণেতা। তাঁর প্রাথমিক গবেষণা হিপনোসিস ও হিস্টিরিয়া রোগের ওপর হলেও তিনি ধীরে ধীরে একটি নতুন ধ্যানধারণার বিকাশ করেন, যেখানে অবচেতন মন, শৈশবের অভিজ্ঞতা এবং যৌনতার প্রভাব মুখ্য হয়ে ওঠে। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য রচনা হল, The Interpretation of Dreams (1900), Three Essays on the Theory of Sexuality (1905), Beyond the Pleasure Principle (1920) এবং Civilization and Its Discontents (1930)।

১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রয়েডের প্রাথমিক রচনায় ‘কামনা’ শব্দটি পাওয়া যায়। এটি তখন লালসা বা আকাঙ্ক্ষার সমার্থক শব্দ ছিল। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে যৌনতাকে একটি ড্রাইভ মডেল অনুসারে বোঝানো হত। তাছাড়া সে সময়ের বিপুল সংখ্যক বিশেষজ্ঞ লিবিডোর বিকাশের পর্যায় এবং ইতিহাস পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন। এই সময়কালে ফ্রয়েড তাঁর গবেষণা প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে লিবিডো রাখতে শুরু করেছিলেন। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক রচনা ‘থ্রি এজেস অন দ্য থিওরি অব সেক্সুয়ালিটি’-তে লিবিডো ছিল তার বিকাশ এবং মনোবিজ্ঞানের তত্ত্বের একটি কেন্দ্রীয় অংশ, বিশেষ করে শৈশবের সঙ্গে এর সম্পর্ক। একদশক পরে ফ্রয়েড তাঁর ‘নিউ ইন্ট্রোডাক্টরি লেকচারস অন সাইকো-অ্যানালাইসিস’-এ লিবিডো তত্ত্বের পর্যালোচনা এবং বর্তমান বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন।

মনোবিশ্লেষণ একধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি, যেখানে মানুষের আচরণ, মানসিক গঠন এবং সংকটসমূহকে বুঝতে চেষ্ট করা হয় অবচেতন ও চেতনের সংঘর্ষের মাধ্যমে। ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন, মানুষ তার আচরণ সম্পূর্ণ সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না। বরং অবচেতন মনের গোপন ইচ্ছা ও চাহিদা তাকে চালিত করে। এ তত্ত্ব মূলত তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে, অবচেতন (Unconscious), চেতনা (Conscious), প্রাকচেতনা (Preconscious)। লিবিডো (Libido) শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে, যার অর্থ ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা। ফ্রয়েড একে মানসিক শক্তি বা drive হিসাবে চিহ্নিত করেন, যা মূলত যৌনতা-উৎপন্ন। তবে এটি শুধু দৈহিক যৌনতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সৃজনশীলতা, ভালোবাসা, বন্ধন ও সমাজবদ্ধতারও প্রেরণা হয়ে ওঠে।

ফ্রয়েড মানব জীবনের বিকাশকে পাঁচটি যৌন স্তরে ভাগ করেছেন, যেখানে প্রতিটি স্তরে লিবিডো নির্দিষ্ট অঙ্গ বা মানসিক কর্মকাণ্ডে কেন্দ্রীভূত হয়। (ক) মৌখিক স্তর (Oral Stage): জন্ম–১.৫ বছর। লিবিডো মুখে কেন্দ্রীভূত। শিশুর মুখ দিয়ে আনন্দের অনুধ্যান। স্তন্যপান, চোষা ইত্যাদি এতে অন্তর্ভুক্ত। (খ) গৌণ স্তর (Anal Stage): ১.৫–৩ বছর। লিবিডো তখন মলত্যাগ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। তাতে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বীজ বপন হয়। (গ) যৌনাঙ্গ স্তর (Phallic Stage): ৩–৬ বছর। শিশু তার লিঙ্গচেতনা, ইডিপাস জটিলতা (Oedipus Complex) অথবা ইলেক্ট্রা জটিলতার (Electra Complex) মধ্য দিয়ে যায়। (ঘ) সুপ্ত স্তর (Latency Stage): ৬–১২ বছর। এই সময় যৌনপ্রবণতা চাপে থাকে। সমাজ ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানসিক পরিশীলন ঘটে। (ঙ) প্রজনন স্তর (Genital Stage): কৈশোর পরবর্তী লিবিডো পূর্ণ যৌন পরিণতিতে প্রবেশ করে। প্রেম, সৃজনশীলতা, সামাজিকতা বৃদ্ধি পায়।

ফ্রয়েড তাঁর ‘The Interpretation of Dreams’ গ্রন্থে লেখেন, স্বপ্ন হচ্ছে চেপে রাখা লিবিডোর অবচেতন প্রকাশ। লিবিডো যখন চেতনে প্রকাশ পেতে পারে না, তখন তা রূপক, প্রতীক ও বিকৃতির মাধ্যমে স্বপ্নে বেরিয়ে আসে। ফ্রয়েডের মতে, হিস্টিরিয়া, ফোবিয়া, অবসেশন ইত্যাদি মানসিক রোগ লিবিডোর চাপা পড়া বা ভুলভাবে রূপান্তরের ফল। তিনি একে conversion of energy বলেন। যেমন, যৌন ইচ্ছা যেহেতু চেতনে গ্রহণযোগ্য নয়, তাই তা পা-ব্যথা বা শ্বাসকষ্টে রূপান্তরিত হতে পারে।

অত্যধিক যৌনতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ফ্রয়েডকে সমালোচিত হতে হয়। নারীর বিষয়ে তাঁর ধারণা (যেমন, penis envy) পুরুষতান্ত্রিক বলে ধিকৃত। শৈশব অভিজ্ঞতার অতিরিক্ত গুরুত্ব অনেক মনোবিজ্ঞানী অস্বীকার করেন।

কার্ল জি জং, যিনি একজন সুইস মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষণাত্মক মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফ্রয়েডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং তাঁর ‘থিওরি অব দ্য আনকনসাস’ গ্রন্থে লিবিডো তত্ত্বকে আক্রমণ করেন। তিনি লিবিডোকে সম্পূর্ণ যৌনশক্তির পরিবর্তে মানসিক শক্তির একটি সাধারণ এবং অবিভাজ্য রূপ বলে মনে করেন। তাঁর দৃষ্টিতে, যৌনতা কেবল বয়ঃসন্ধিকালেই আবির্ভূত হয় এবং প্রাধান্য পায়, যা ফ্রয়েডের শিশু এবং শৈশবের লিবিডো প্রকাশের ওপর মনোযোগের বিপরীতে।

অন্য পোস্ট: বিবেকানন্দ ও সুফিবাদের চিন্তায় ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়

ডেভিড এ র‍্যাপাপোর্ট লিবিডোর ধারণাটিকে সম্পূর্ণরূপে একটি অনির্দিষ্ট এবং আরও সাধারণ ড্রাইভ অ্যানার্জি দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছিলেন। মনোবিশ্লেষণের অন্যতম প্রভাবশালী পদ্ধতিগত প্রবক্তা জর্জ এস ক্লেইন লিবিডো তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে খুব সমালোচনামূলক ছিলেন এবং এটিকে মনোবিশ্লেষণের মুখোমুখি হওয়া বিষয়ে দ্বিধাগুলির মধ্যে একটি বলে মনে করেছিলেন।

১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে রয় শ্যাফার লিবিডোর সাতটি গুণ তালিকাভুক্ত করেছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে দিকনির্দেশনা, জরুরিকালীনতা, গতিশীলতা, শ্রবণযোগ‍্যতা, বাঁধনযোগ্যতা, রূপান্তরযোগ্যতা এবং কার্যকারিতা। শ্যাফারের তত্ত্ব ছিল যে, স্বপ্ন, রোগ, আচার-অনুষ্ঠান, রসিকতা, থেরাপিউটিক প্রভাব এবং এমনকী সম্পর্কগুলিকে লিবিডোর বিভিন্ন মাত্রার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। বর্তমানে প্রজনন এবং যৌনতা সম্পর্কে কথা বলার সময় লিবিডো একটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত শব্দ। তুলনামূলকভাবে মনোবিশ্লেষক এবং মনোবিজ্ঞানী উভয়ের কাছেই লিবিডোর অর্থ বিতর্কিত রয়ে গিয়েছে।

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব একাধারে বিপ্লব, বিতর্ক ও বিশ্লেষণের কেন্দ্র। মানুষকে শুধু যৌনতাকেন্দ্রিক ভাবার কারণে তিনি সমালোচিত হলেও তাঁর তত্ত্ব মানুষের মনের গহীনে প্রবেশের একটি গভীর ও অনুসন্ধানমূলক পথ তৈরি করে দিয়েছে। ব্যক্তিগত সংকট, সামাজিক রীতিনীতির উৎপত্তি এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তরে লিবিডো বিশ্লেষণ আজও অপরিহার্য। ফ্রয়েডের মতে, শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলি ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ। লিবিডোর বিভিন্ন পর্যায়ে শিশুদের অভিজ্ঞতা তাদের ভবিষ্যতের সামাজিক সম্পর্ক এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। লিবিডো মানুষের সামাজিক মিথষ্ক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্যালিক পর্যায়ে ছেলেশিশুদের মধ্যে পিতৃত্বের ধারণা এবং মেয়েশিশুদের মধ্যে ঈর্ষা দেখা যায়, যা তাদের সামাজিক সম্পর্ক এবং লিঙ্গ ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা গঠনে সাহায্য করে।

ফ্রয়েডের তত্ত্বটি সংস্কৃতি এবং সমাজের ওপর লিবিডোর প্রভাব ব্যাখ্যা করে। ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন যে, সংস্কৃতি এবং সমাজের নিয়মগুলি মানুষের যৌনতা এবং লিবিডোকে দমন করে। এ দমন মানুষের মধ্যে বিভিন্ন মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। ফ্রয়েডের তত্ত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও আলোকপাত করে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। যদি লিবিডোর স্বাভাবিক বিকাশ না ঘটে, তবে তা মানসিক অসুস্থতার কারণ হতে পারে। ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব শিল্প ও সাহিত্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। অনেক শিল্পী এবং লেখক তাঁদের কাজে লিবিডোর ধারণা এবং প্রভাবকে তুলে ধরেছেন। ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্বটি মানুষের যৌনতা, মনোসামাজিক বিকাশ, সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া, সংস্কৃতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এটি মানুষের আচরণ, সম্পর্ক এবং সমাজের ওপর Depends প্রভাব ব্যাখ্যা করে। তবে এটা ঠিক যে, মানুষের, বিশেষত নর ও নারীর সম্পর্কের রসায়নে লিবিডো একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকের ভূমিকা পালন করে থাকে।

5 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Angshu Pal
Angshu Pal
1 year ago

I was a little acquainted with Freud’s libido theory. Thanks to you for rather elaborate informations of it and informations about some other theories….including those which oppose, at least partly, Freud’s theory.

Subhajyoti Acharjee
Subhajyoti Acharjee
1 year ago

অনেক তথ্য পেলাম স্যার, খুব ভালো‌ লাগলো। যৌনতা নিয়ে আমাদের সামাজিক যেসব Taboo আছে তা মানসিক ভাবে সমাজকে দুর্বল করে। তবে অবাধ যৌনতাও সামাজিক ক্ষতি। এইরকম আরো লেখা দিন‌। নতুন জেনারেশনের জন্য প্রযোজন।

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए