Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ঋণ করে ঘি খাওয়া: মধ্যবিত্তের নতুন রোগ

আমরা যদি আজই থেমে না যাই, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাব শুধুই দায়, স্বাধীনতা নয়। তাই এখনই সময় থামার। সময় নিজের আয়মাফিক বাঁচার, নিজের মতো করে সুখ খোঁজার। কারণ ঋণ করা ঘিয়ের স্বাদ ভালো ঠিকই, কিন্তু পরিণতিতে অম্বল হলে সেটা ভীষণ অসহনীয়, হতে পারে দুরারোগ্যও।

Share Links:

বরুণ মণ্ডল

আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সুখ দেখানোই যেন সুখী হওয়ার সমার্থক হয়ে উঠেছে। ফেসবুকের হাসিমুখ, ইনস্টাগ্রামের ছুটির ছবি, হোয়াটসঅ্যাপের নতুন গাড়ি— এদেরই মাঝে আমরা আমাদের বাস্তব জীবনটাকে হারিয়ে ফেলেছি।

চাই যতটা না, দেখাতে চাই তার চেয়েও বেশি। এই ‘দেখানো সুখের প্রতিযোগিতা’তেই জন্ম নিয়েছে আমাদের সময়ের ভয়ংকর এক রোগ— ঋণ করে ভালো থাকা বা সহজ কথায়, ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’। একসময় এই প্রবাদটা মানুষ বলত ঠাট্টা করে। এখন সেটাই বাস্তব। ২০২৫ সালের হিসাব বলছে, ভারতে গৃহস্থালি ঋণ এখন জিডিপির প্রায় ৪৩ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ আমরা যা আয় করছি, তার একটা বড় অংশই আসলে আমাদের নিজের নয়, ব্যাংক, ক্রেডিট কার্ড কোম্পানি কিংবা কোনও ফিনান্স সংস্থার। একটা ভয়াবহ সত্য হল, এখন প্রতি তিনজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে একজন অন্তত দু’টি বা তার বেশি ঋণের কিস্তি শোধ করছে।

ভালো থাকার মিথ্যা গল্প
আজকাল আমাদের চারপাশে এমন এক অবাস্তব জীবনযাপন ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে মানুষ নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ব্যয় করলেই ‘সফল’ বলে গণ্য হয়। দামি ফোন, নামী রেস্তোরাঁ, নতুন গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ— সবই সুখের মাপজোকের উপকরণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই প্রদর্শনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মাসের শেষে ফাঁকা পকেট, ব্যাংকের এসএমএস, আর ঘুমহীন রাতের নিঃশব্দ দুশ্চিন্তা।

যখন একজন বাবা সন্তানের স্কুল ফি আর ক্রেডিট কার্ড বিলের মধ্যে দ্বিধায় পড়েন, একজন মা ঘরের খরচ মেটাতে গয়না বন্ধক রাখেন, একজন তরুণ কর্মক্ষেত্রে অপমান সহ্য করেও সে চাকরিই করতে বাধ্য হন, কারণ কিস্তি বাকি, তখন বোঝা যায়, এই ঋণ শুধু টাকা নয়, এক অদৃশ্য শিকল, যা আমাদের স্বাধীনতাকেই গ্রাস করে নিচ্ছে।

ঋণের অদৃশ্য শৃঙ্খল
আগে মানুষ ঋণ নিত গৃহস্থালির প্রয়োজনে, বাড়ি, শিক্ষা বা ব্যবসার জন্য। সে ঋণ ছিল বিনিয়োগ, যার প্রতিদান ভবিষ্যতে আসত। কিন্তু এখন ঋণ নিচ্ছে এমন কিছুর জন্য, যা একবছরের মধ্যেই পুরোনো হয়ে যায়। ফোন বদলাচ্ছে, গাড়ি বদলাচ্ছে, ফ্রিজ বদলাচ্ছে, কিন্তু বদলাতে পারছে না সেই মানসিকতা, যা আমাদের বলে, ‘অন্যের মতো না হলে তুমি পিছিয়ে’।

ব্যাংকগুলিও এই মনস্তত্ত্বকে ভালোই বুঝে গিয়েছে। তাই তারা এখন চতুর বিক্রেতার মতো আমাদের সামনে সাজিয়ে রাখে চটকদার প্রলোভন— ‘জিরো পার্সেন্ট ইন্টারেস্ট!’ ‘এখনই কিনুন, পরে দিন!’ ‘সহজ কিস্তিতে স্বপ্নপূরণ করুন!’ এই মিষ্টি শব্দগুলির পিছনে লুকিয়ে থাকে এক ভয়াবহ দাসত্ব। একবার আপনি এ পথে পা রাখলেই, বুঝে ওঠার আগেই আপনার মাসিক বেতন নানা কিস্তির খপ্পরে বন্দি হয়ে পড়ে।

প্রভাব: সুখের বদলে নিশ্বাসহীনতা
এই ঋণ সংস্কৃতি শুধু অর্থনীতির হিসাব নষ্ট করছে না, মানুষের মানসিক ভারসাম্যও কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এর কিছু বড় প্রভাব হল—
১. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ:
প্রতিমাসে কিস্তির হিসাব মেলাতে না পারলে যে আতঙ্ক তৈরি হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্ণতা ও অনিদ্রার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. পারিবারিক অশান্তি:
টাকার জন্য ঝগড়া এখন মধ্যবিত্ত সংসারের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ভালোবাসার জায়গা নিচ্ছে অভিমান, অভিযোগ আর অসন্তোষ।
৩. আত্মসম্মানহানি:
যখন মানুষ বন্ধু বা আত্মীয়ের সামনে ঋণ নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পায়, ব্যাংকের ফোন এড়িয়ে চলা অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তার ভিতরের মানুষটি ছোট হয়ে যায়।
৪. স্বপ্নের মৃত্যু:
ঋণের বোঝায় মানুষ নিজের ইচ্ছা-স্বপ্ন ভুলে যায়। চাকরি করে শুধু কিস্তির ভয়ে, ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, নতুন কিছু শুরু করার সাহস হারায়।
৫. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা:
ঘরোয়া সঞ্চয় কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতের জন্য নিরাপত্তা তলানিতে ঠেকেছে। যে দেশে মধ্যবিত্তই অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেখানে এই সঞ্চয়হীনতা ভয়াবহ সংকেত।
কারণ: কোথা থেকে শুরু এই অসুখ
১. সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা-জীবন:
অন্যের সুখের ছবি দেখে আমরা নিজেদের ব্যর্থ মনে করি। যে ছবি কেবল ‘মুহূর্তের’, সেটাকেই ধরে নিই বাস্তব।
২. সহজ ঋণের প্রলোভন:
ক্রেডিট কার্ড, পার্সোনাল লোন, ইএমআই— এখন এত সহজলভ্য যে, কেউই ভাবে না, এর পরিণতি কী হবে।
৩. আয়ের সীমা ও খরচের সীমাহীনতা:
মধ্যবিত্তের বেতন খুব একটা বাড়ছে না, কিন্তু জীবনযাত্রার খরচ ও ‘দেখানোর দায়’ প্রতিদিন বাড়ছে।
৪. অর্থনৈতিক শিক্ষার অভাব:
আমরা জানি না, ভালো ঋণ আর খারাপ ঋণের পার্থক্য কোথায়। বাড়ি বা শিক্ষার জন্য ঋণ নেওয়া এক কথা, কিন্তু দামি ফোনের জন্য লোন নেওয়া আসলে আত্মঘাতী।

সমাধান: এই চোরাবালি থেকে বেরোনোর পথ
এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এর জন্য দরকার নিজের সঙ্গে সৎ থাকা, আর কিছু সহজ সিদ্ধান্ত নেওয়া।
১. অন্যের সঙ্গে তুলনা বন্ধ করুন। আপনার সুখ আপনার নিজের মতো হোক। সবাই যে নিজেকে সুখী দেখাচ্ছে, তা সত্যি নয়। অন্যের জীবনের ছবি নয়, নিজের বাস্তবতা দেখুন।
২. ‘না’ বলতে শিখুন। সব চাওয়া পূরণ করা কর্তব্য নয়। পরিবারে ভালোবাসা মানে খরচ নয়, একসঙ্গে সময় কাটানো।
৩. খরচের হিসাব রাখুন। প্রতিমাসে আয়-ব্যয়ের তালিকা তৈরি করুন। দেখবেন, কত খরচই আসলে অপ্রয়োজনীয় ছিল।
৪. দরকারি ঋণ আর শখের ঋণের পার্থক্য বুঝুন। বাড়ি, শিক্ষা বা ব্যবসার জন্য ঋণ হতে পারে বিনিয়োগ। কিন্তু দামি ফোন বা বিদেশ ভ্রমণের ঋণ? সেগুলি সুখ নয়, শিকল।
৫. সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রতিমাসে সামান্য হলেও কিছু টাকা জমান। সঞ্চয় মানে কেবল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নয়, এটা মানসিক শান্তিরও নিশ্চয়তা।

শেষ কথা
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দাসত্ব ঋণের কিস্তিতে বাঁধা জীবন। বেতন আসার আগেই তার গন্তব্য ঠিক হয়ে যায়, আর আমরা ভেবে বসি, এই তো জীবন!

না, এটা জীবন নয়। এ এক অবিরাম দৌড়, যার কোনও গন্তব্য নেই। আমরা যদি আজই থেমে না যাই, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাব শুধুই দায়, স্বাধীনতা নয়। তাই এখনই সময় থামার। সময় নিজের আয়মাফিক বাঁচার, নিজের মতো করে সুখ খোঁজার। কারণ ঋণ করা ঘিয়ের স্বাদ ভালো ঠিকই, কিন্তু পরিণতিতে অম্বল হলে সেটা ভীষণ অসহনীয়, হতে পারে দুরারোগ্যও।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए