ভাস্কর সেনগুপ্ত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন,
একটি নমস্কারে প্রভু, একটি নমস্কারে
সকল দেহ লুটিয়ে পড়ুক তোমার এ সংসারে।
ঘন শ্রাবণ মেঘের মতো রসের ভারে নম্র নত
একটি নমস্কারে প্রভু, একটি নমস্কারে
সমস্ত মন পড়িয়া থাক্ তব ভবন-দ্বারে।
রাবণের কাছ থেকে বিতাড়িত বিভীষণ যখন রামচন্দ্রের স্মরণ নিয়েছিলেন, তখন হনুমান ছাড়া সকলে আপত্তি করেছিলেন। তখন রামচন্দ্র বলেছিলেন,
সকৃদেব প্রপন্নায় তবাস্মিতি চ যাচতে।
অভয়ং সর্বভূতেভঃ দাদামেতদ্ ব্রতং মম।।
অর্থাৎ একবার, মাত্র একবার যে প্রপন্ন হয়ে আমার শরণ নেয়, তাকে আমি রক্ষা করবই, এ আমার ব্রত। ভগবান রামচন্দ্রের সেই প্রতিশ্রুতি আজও পরিপালিত হচ্ছে বিভিন্ন সাধু-মহাত্মার মাধ্যমে। দাদাভাইয়ের চরণে যে শরণাপন্ন হয়েছে, তার জীবন রক্ষিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে একটি নমস্কারের কথা বলেছেন, তা বাস্তবিকই সত্য।
এখানে দু’টি ঘটনা স্মরণ করি। পবিত্রকুমার পাল। হার্টের অবস্থা খুব খারাপ। পেসমেকার বসাতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু যন্ত্রের মাধ্যমে সে নিদর্শন ধরা পড়ছে না, তাই সঠিক চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না। ডা. রাসবিহারী গুপ্তকে দেখাতে আসেন প্রায়ই। কিন্তু যন্ত্রে কখনও ধরা পড়ছে না, তাই সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না। সেদিন ডা. গুপ্ত তাঁকে বললেন, আপনি দাদাভাইয়ের কাছে নতমস্তকে প্রার্থনা করে যান, আপনার রোগ যেন ধরা পড়ে। ফেরার পথে লীলানিকেতনের তিনতলায় উঠলেন। দাদাভাইকে ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। যে মুহূর্তে পটমূর্তির সামনে লাল দাগে মাথা ছোঁয়ালেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্ট্রোক হল। অচৈতন্য হয়ে পড়লেন। যে সুযোগের জন্য ডা. গুপ্ত অপেক্ষা করছিলেন, দাদাভাইকে প্রণামের সঙ্গে সঙ্গে সে সুযোগ এসে গেল। ডা. গুপ্তকে ডেকে পাঠানো হল। তিনি তৎক্ষণাৎ এলেন ও ইসিজি করে নিশ্চিত হলেন পেসমেকার বসানো প্রয়োজন। যথাসময় পেসমেকার বসানো হল। পবিত্রকুমার পাল সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে গেলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কি দাদাভাইয়ের কাছে প্রার্থনা করতে পেরেছিলেন? তিনি বললেন, মাথা ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমি চৈতন্য হারাই। কোনও প্রার্থনা করার সুযোগ পাইনি।
রামচন্দ্র বলেছিলেন, একবার মাত্র কেউ যদি শরণ নেয়, তাকে আমি রক্ষা করবই। এখানে পবিত্রবাবু শরণ নেওয়ার অবকাশও পাননি, তবু দাদাভাই তাকে রক্ষা করলেন। শুধু একটি নমস্কার মাত্র করেছিলেন।
অনুরূপ আর একটি ঘটনা গত বছর ১ বৈশাখ হয়েছে। একদিন সমীরণ মজুমদার সকালবেলা বাজার যান। বাড়িতে অতিথি আসবে। তাই অনেক কিছু কেনার পরিকল্পনা। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর একটি ছেলে সাইকেল নিয়ে ধাক্কা মারল। সমীরণ মজুমদার টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে গেলেন। হাঁটুতে আঘাত পেলেন। বহু কষ্টে পা টেনে টেনে বাজার করলেন। নাতনির জন্মদিন বলে কথা। জন্মদিন পালন হল। ভাবলেন, একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিই। একবার অসুস্থ হয়ে পড়ার জন্য আবার নার্সিংহোম যেতে হল কয়েকদিন। হাঁটুর অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে চলল। বেশ খানিকটা ফুলে উঠেছে। ব্যাথা ভীষণ বেড়ে গিয়েছে। ডাক্তার দেখাতে গেলেন ১২ এপ্রিল। ডাক্তার বললেন, আপনার হাঁটুতে অনেক রক্ত জমে আছে। অপারেশন করতে হবে। সমীরণ মজুমদার বললেন, ১ বৈশাখের পর অপারেশন করাব। ১ বৈশাখ আমি প্রণাম করতে যাব আমার ইষ্টদেবকে। ১ বৈশাখ সকালে লীলানিকেতনে এসে ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে সকলের সঙ্গে দেখা করে কুশল বিনিময় করে ফিরে গেলেন। পরদিন ডাক্তার দেখাতে ফের গেলেন। কবে অপারেশন হবে জানার জন্য। ডাক্তার পরীক্ষা করার জন্য প্যান্ট তুলে হাঁটুতে হাত দিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, ফোলাটা কোথায় গেল! ঠিক এখানেই তো দু’দিন আগে ফোলাটা দেখলাম! একদম নরম তুলতুলে। জলপূর্ণ বেলুনের মতো। আশ্চর্য, অত রক্ত কোথায় অদৃশ্য হল! সমীরণ মজুমদার মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলেন। দাদাভাইয়ের বাড়িতে ষাষ্টাঙ্গ করার ফল। ডাক্তার বললেন, প্রণাম করার সময় মাটিতে ধাক্কা লেগে জমে থাকে রক্ত পথ পেয়ে সরে গিয়েছে। প্রশ্ন, সরে গেলটা কোথায়? রক্তপাত তো হয়নি। ডাক্তার কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বললেন, একে বাইবেল টাচ বলে। ভগবানের কৃপা। আপনার ইষ্টদেবের কৃপা বলতে পারলেন না।
দাদাভাই আজও নিত্য আমাদের সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করছেন। পবিত্র পালের ঘটনা হয়েছিল ১৯৯৫ সালে আর ২০২৫ সালে দেখলাম সমীরণ মজুমদারের ঘটনা।
একটিমাত্র নমস্কারে যখন এতটা কৃপা হয়, দাদাভাইয়ের চরণে শরণ নিলে যে মুক্তির দ্বার অপাবৃত হয়, সর্বোপরি সেবার সৌভাগ্য লাভ হয়, তা কোনও কিছুর বিনিময়ে প্রাপ্ত হয় না।
দাদাভাই অযোগ্যকে করুণা করার জন্য ব্রত করেছেন। ১৯০৮ সালে যখন ভগবান নারায়ণ দাদাভাইকে বৈকুণ্ঠে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তখন দাদাভাই বলেছিলেন, ঠাকুর, তোমার কৃপার কথা লোককে না জানিয়ে যেতে পারব না। আমাকে যেতে বলো না। আজও নিত্য দাদাভাই ভগবানের কৃপার ভাণ্ড হস্তে ধারণ করে অপেক্ষা করে আছেন। যে আসবে, তাকেই রক্ষা করবেন। অমৃত সিঞ্চন করবেন।

Joy Dadabhai Joy Shobthakuma Joy Gopaldhandadu