মতিউর রহমান

প্রত্যেক মা-বাবার কাছেই সন্তান অত্যন্ত মূল্যবান। তাদের ঘিরেই গড়ে ওঠে স্বপ্নের সাম্রাজ্য, যেখানে থাকে সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ভালো থাকার বাসনা। ইচ্ছে আকাশে ওড়ে প্রত্যাশার বেলুন। সে বেলুন এতই আকাশে ওড়ান তাঁরা যে, সময় সময় তার খোঁজ পাওয়া যায় না। কোথায় যে হারিয়ে যায়! স্বপ্নের কুসুম শুকিয়ে যায়! ঝরে যায় তার পাপড়ি! বেঁচে থাকে শুধু হাপিত্যেশ আর হাহাকার।
আমরা প্রত্যেকেই চাই, আমাদের সন্তানরা যেন থাকে দুধে-ভাতে। অত্যন্ত ভালো কথা, যা স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। আমাদের এই চাওয়া এবং পাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় গগনচুম্বী প্রত্যাশা। সেরা তোমাকে হতেই হবে। তার জন্য ছোটো, ছোটো আরও ছোটো। চলছে মরিয়া দৌড়। ইঁদুরদৌড়। ছোটবেলার ব্যাগের বোঝার মতো ভারী হচ্ছে প্রত্যাশার পাথর। আমাদের ইচ্ছেগুলিকে সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি আমরা। তারা পারছে কি সে বোঝা বইতে, প্রত্যাশার ভার নিতে? বাড়তি চাপ নিতে গিয়ে আমাদের সন্তানরা হাঁপিয়ে উঠছে না তো?ভালো চাইতে গিয়ে তাদের ক্ষতি হচ্ছে না তো? আমরা কি ভেবে দেখছি?
বাস্তব বলছে, আমাদের সন্তানরা বাড়তি এই চাপ নিতে পারছে না। তারা হাঁপিয়ে উঠছে। তারা ডুবে যাচ্ছে হতাশার অন্ধকারে। কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। একইসঙ্গে এটাও প্রশ্ন রয়ে যায়, সাফল্য মানে কি শুধুই পুঁথিগত বিদ্যায় সাফল্য? জীবনের তো নানা দিক রয়েছে। যে বিষয়ে যে দক্ষ, যে বিষয় যার ভালো লাগে, সেখানে নিজের প্রতিভা মেলে ধরতে পারলে তাকে কি সফল বলা হবে না? আমরা কি বিষয়টি একবার ভেবে দেখব না? অত্যধিক প্রত্যাশার চাপে দুমড়ে মুচড়ে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হবে তাদের জীবন! তাদের জীবনে হাসিখুশির যাপন বলে কি কিছুই থাকবে না!
অত্যধিক চাপের কারণে আমাদের সন্তানদের অনেকেই হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। এক্ষেত্রে আমাদের কি কোনও দায় নেই? ছোট থেকেই আমরা আমাদের সন্তানদের ওপর এই যে চাপ, অত্যধিক প্রত্যাশার চাপ বাড়িয়ে চলেছি, তা বহন করতে তারা অপারগ, অক্ষম। আমাদের মনে ‘ছোট পরিবার, সুখী পরিবার’-এর যে ধারণা, তা কি সত্যিই আমাদের সুখ দিতে পারছে? নাকি সুখপাখি হাওয়া হয়ে যাচ্ছে?
চারদিকে চলছে ইঁদুরদৌড়। সে দৌড়ে শামিল আমরা সবাই। ছিনিয়ে আনতে হবে সাফল্য। তাই দৌড়। মরিয়া হয়ে দৌড়। তাদের জন্য কোথায় ভালোবাসা, স্নেহের পরশ? প্রত্যাশার বেলুন অসম্ভব উঁচু আকাশে ওড়াতে গিয়ে আমরা কি আমাদের প্রিয় সন্তানদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করছি না? মায়ার আকাশ কি ক্রমশ কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে না? তারা কি বঞ্চিত হচ্ছে না স্নেহের পরশ থেকে? বিষয়টি আমাদের ভাবা দরকার। কিন্তু সে কথা ভাবার মতো আমাদের সময় কোথায়? আমরা এখন জেট যুগের বাসিন্দা। ব্যস্ত। ভীষণ ব্যস্ত। শিশুরা বড় হচ্ছে বাবা-মায়ের এই তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেই। বিনোদনের দুয়ার আঁটা। ছুটিতে মামা বা পিসিবাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, বৃষ্টিতে ভেজার রোমাঞ্চ উপভোগ করা, বৈশাখের ঝড়ে আম কুড়োনো বিকেল আজ কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে! ফুটবল বা ক্রিকেট মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, হইচই, আনন্দ আর নেই বললেই চলে। লুকিয়ে গল্পের বই পড়া বা সিনেমা দেখা, অপু-দুর্গার মতো কল্পনার আকাশে বেলুন হয়ে ওড়ার কথা আর ভাবা যায় না। জীবনে নেই রোমাঞ্চ, হাসিখুশি, আনন্দযাপন। কবিতা পড়া, আত্মীয়স্বজন, ভাই-বোনদের সঙ্গে খুনসুটি বা চুটিয়ে গল্প আজ আর নেই। তাদের ইচ্ছে, স্বপ্নগুলি ইট চাপা ঘাসের মতো হলদে হয়ে গিয়েছে। প্রত্যাশার পাথরে পিষ্ট শৈশব-কৈশোর-যৌবনের সোনালি দিনগুলি গুমরে মরছে। একের পর এক টিউশন, কোচিং ক্লাস, শৃঙ্খলার শৃঙ্খলে বন্দি জীবন তাদের আর ভালো লাগে না। গান বা অঙ্কনের ক্লাসেও নেই স্বপ্ন উড়ানের ফুরসত। বাঁধা লক্ষ্যে পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে। পচে, গুমরে গুমরে মরুক স্বপ্নগুলি। কী এসে যায়! সত্যিই কি কিছু এসে যায় অভিভাবক বা অভিভাবিকার?
ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের সামনে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে টার্গেট। নেট পেতে হবে। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। সে লক্ষ্যেই তুমি ছোটো। প্রশ্ন উঠছে, নামী মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়াটাই কি জীবনের একমাত্র সাফল্য? এর বাইরে কি সফলতার আর কোনও পথ থাকতে পারে না? আইপিএলে ১৪ বছরের যে ছেলেটি দুরন্ত পারফরমেন্স করে নাম কামাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠা ও স্বপ্নের পৃথিবীতে, সে কি সফল নয়? যে ছেলেটি ভালো গান করে দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে, ফুটবল বা হকির মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিংবা ভালো লিখছে, সে কি সফল নয়? কাজের নানা ধারা রয়েছে। জীবনে রয়েছে নানা দিক। যে কোনও একটি ধারা বা দিকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই সে সফল। যে বিষয়টিকে সে পছন্দ করে, ভালোবেসে যার মধ্যে সে খুঁজে পায় আনন্দের রসদ, সে পথে সে এগোলে অসুবিধা কোথায়? সে পথেও তো সে পেতে পারে অর্থ, প্রতিষ্ঠা, হতে পারে তার স্বপ্ন সফল। অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার ছাড়াও জীবনের অন্যান্য ধারায় নিজেদের মেলে ধরতে চাইলে সন্তানদের আমরা সুযোগ দেব না কেন? আমাদের ইচ্ছে, প্রত্যাশা পূরণের জন্য সন্তানের প্রতি অবিচার করা কি উচিত হবে? সচেতন, দায়িত্বশীল অভিভাবক একবার ভাববেন না?
চারদিকে যে ইঁদুরদৌড়, তাতে শামিল হয়েছি আমরা, অভিভাবকরা। আমাদের কাছে সাফল্য মানে নিট বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উত্তীর্ণ হওয়া। সেটাই যেন আমাদের কাছে সেরার সূচক। জীবনে আয় করতে হবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। গাড়ি-বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স চাই। প্রয়োজন বিলাসিতা, আরাম, স্বাছন্দ্যের। তাই চলে না কোনও আপস। শৈশবেকে টুঁটি টিপে মারতে আমরা একটুও ভাবছি না। শৈশব, কৈশোর, যৌবনের আনন্দ উপভোগ করার ফুরসত নেই। অভাব ভালোবাসা, প্রেমের। নেই আবেগ বা কল্পনায় ভাসার সুযোগ। মনোরঞ্জন নৈব নৈব চ। প্রতিষ্ঠা পেতে হবে। আত্মনির্ভর হতে হবে। আমরা এগোচ্ছি ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে। বাড়ছে চাপ, হতাশা। হাঁপিয়ে উঠছে শিশুসন্তানরা। কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। স্বপ্নের কুসুম যখন ঝরে যাচ্ছে, তখন আকাশ থেকে পড়ছি আমরা। হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি।
পৃথিবীজুড়ে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, তাতে অল্পবয়সিরাই বেশি থাকে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ থেকে ২৯ বছরের ছেলেমেয়েরাই বেশি আত্মহত্যার পথে পা বাড়ায়। তথ্য মতে, চিন বাদে সব দেশে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরাই বেশি আত্মহত্যা করে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ছেলেদের ওপরই বেশি চাপ থাকে। বিষয়টি কি একবার ভেবে দেখব না? আমরা অভিভাবকরাও যেন প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে শামিল হয়েছি। যে স্বপ্ন, ইচ্ছে আমরা জীবনে পূরণ করতে পারিনি, সন্তানদের সফল জীবনের মধ্যে সেগুলিকে আমরা দেখতে বা ছুঁতে চাই। তাই সন্তানদের আমরা ছুটিয়ে নিয়ে যাই এক কোচিং সেন্টার থেকে আর এক কোচিং সেন্টারে। আমার সন্তানকে সেরা করতে হবে, প্রতিবেশী সকলের চেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করতে হবে, এই মানসিকতা আমাদের গ্রাস করেছে। তাই বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি দেখা গেলেই আমাদের সন্তানরা হতাশ হয়ে পড়ছে। চাপ নিতে পারছে না। প্রথম বা সেরা হওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনও পথ নেই। হাঁসফাঁস করে মরছে আমাদের সন্তানরা।
সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন আইআইটি সেন্টারে পড়ুয়াদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে। বাড়ছে এই প্রবণতা। বিভিন্ন জায়গায় কমিটি গঠন করে এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে। ভালো কথা। সেই কমিটিতে বিভিন্ন পেশার মানুষজনের সঙ্গে মনোবিদরাও থাকছেন। কিন্তু তাঁরা কি মানসিক বিষয়গুলি অনুধাবন করে যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন? প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে, শিশু মনের কান্না, হাহাকার তাঁরা কি শুনতে পাবেন? শিকলছেঁড়া আর্তি, আর্তনাদ তাঁরা কি শুনতে পাবেন? শিশু-কিশোররা চায় না যন্ত্রের কলরব, চায় সংগীতের স্নিগ্ধতা। কে গুরুত্ব দেবে তাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগাকে? খেলার মাঠ, ঘুড়ি ওড়ানো বিকেল কি তাঁরা ফিরিয়ে দিতে পারবেন? বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আনন্দযাপন! দৌড়তে হবে জোরে, আরও জোরে, আরও আরও… এই তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, বিধান-নিদান যা বেঁধে দিয়েছেন তাদের অভিভাবকরা। তাই পিষ্ট হও, কাঁদো, ভিতরে ভিতরে গুমরে মরো। সেরা হওয়ার বীজমন্ত্র আমরা তাদের কানে বুনে দিয়েছি। আর কোনও কথা শুনতে চাই না। জীবনে ভালো হও, না হও, সেটা বড় কথা নয়, ভালো রোজগার করতে হবে। কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন ফেরি করে চলেছি আমরা। সন্তানের জীবন হোক তাতে বিরক্তিকর, আনন্দহীন, থোড়াই কেয়ার!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দৌলতে সভ্যতা এগোচ্ছে। সে এগোচ্ছে বিলাসবহুল সুখী যাপনের দিকে। যত দিন যাচ্ছে, মনের আনন্দ, ইচ্ছেগুলি তত গৌণ হয়ে যাচ্ছে। মুখ্য হয়ে উঠছে অর্থ, গাড়ি-বাড়ি। বাজার অর্থনীতি বুনেছে বিলাসবহুল জীবনের স্বপ্ন, যা চরিতার্থ করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তাই জীবনে সেরা হতেই হবে। বড় মাপের চাকরি করতে হবে। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আয় করতে হবে। তাই শৈশব, কৈশোরের রামধনু আকাশে উড়তে দিইনি স্বপ্নের বেলুন, দিইনি স্বপ্ন উড়ানে শামিল হতে। দিইনি খুশির ডানায় আনন্দময় যাপনের ফুরসত। চাই, চাই, আরও বেশি চাই। তাই এই ‘চাই’কে ‘পাই’ করতে সন্তানদের দিইনি আড্ডা, হইচই, আনন্দযাপনের ফুরসত। বাড়ছে ক্লান্তি, কিন্তু শান্তি কোথায়! আমরা একবার কি ভেবে দেখব না, আমাদের প্রিয় সন্তানদের ভালো থাকার কথা, মানসিক শান্তির কথা?
ঝরে যাচ্ছে স্বপ্নকুসুম। শুকিয়ে যাচ্ছে সবুজের ডালপালা। ফুলের মতো শিশুরা নিরাশার অন্ধকারে ডুবতে ডুবতে ঝরিয়ে দিচ্ছে প্রাণ। বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। আমরা কি শুনতে পাচ্ছি না কুসুমসম প্রিয় সন্তানদের কান্না, হাহাকার, আর্তনাদ? এ কান্না, হাহাকারের কবিতা আগামীতে মহাকাব্য হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। তাহলে এভাবেই কি তারা তলিয়ে যাবে হতাশার অন্ধকারে? আমরা চোখের সামনে কি দেখব শুধু মৃত স্বপ্নের লাশ! আমাদের প্রিয় সন্তানরা জীবনে সফল হোক, এটা আমরা নিশ্চয়ই চাই। তবে তা করতে গিয়ে তাদের ওপর অত্যধিক চাপ প্রয়োগ করে তারা মৃত্যুর মুখে ধাবিত হোক, এটা আমরা নিশ্চয়ই চাই না। তারা বড় হোক ফুলের হাসিতে, ভ্রমরের চঞ্চলতায়, স্বপ্নের সবুজে হাসতে হাসতে, ভাসতে ভাসতে। প্রজাপতির পাখায় তারা জীবনের সাত রং আঁকুক। স্বপ্নরা উড়তে থাকুক খুশির ডানায়। আমরা কি তাদের দিতে পারি না হাসিখুশি, আনন্দময় যাপনের একটুকরো আকাশ?
