ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়
পুরুলিয়া

একদিন বাংলার ঠাকুমা-দিদিমারা লালকমল-নীলকমলের গল্প তাঁদের ঝুলি থেকে বের করে শিশু ও কিশোর মনে হিল্লোল তুলতেন। শ্লোক বলা কাজলাদিদিরা তাঁদের ভাইদের সামনে অচিনলোকের দরজা উন্মুক্ত করত। বাঁশবাগানের কল্পলোক বাঙ্ময় হয়ে উঠত। আর স্বপনকুমারের দীপক নামের ডিটেকটিভ একলহমায় সব মুশকিল আসান করে কিশোর মনের হিরোয় পরিণত হত।
সে মধুমাখা দিনগুলি আজ প্রবল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রযুক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে গিয়ে সুকুমার প্রবৃত্তিগুলি অতলান্তে তলিয়ে গিয়েছে। এখনও যাদের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি, অতীত রোমন্থন করতে গিয়ে তাঁদের মনে হয়, ‘মোরা আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম!’ বৈশাখের ঝড়ে আম কুড়োনোর হিড়িক, বৃষ্টিস্নাত হয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বাবা-মায়ের পালা করে বকুনি অথবা খালবিল, পুকুরের জলে সাঁতার কাটা শৈশব অথবা নুন-লঙ্কা সহযোগে কাঁচা আম বা কয়েতের গুষ্টি উদ্ধার আজ শুধুই সাহিত্যের খোরাক। গোপন স্মৃতিচারণ মাত্র।
বাঙালি মননের সুকুমার প্রবৃত্তি অর্থাৎ শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি ও খেলাধুলা বিষয়ক অভিরুচি একসময় অন্যান্য ভারতীয় প্রদেশকে ঈর্ষান্বিত করত। একদিন যারা রাজনীতি, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক বোধ এবং সাহিত্যের অঙ্গনে প্রাধান্য স্থাপন করে শ্লাঘাবোধ করত, আজকের বাঙালি প্রজন্ম তা থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে। নবীন বাঙালি প্রজন্মের সুকুমার প্রবৃত্তির এ অবক্ষয় যথেষ্ট হৃদয়বিদারী এবং তার সঙ্গে বাঙালি অস্মিতার পরিতাপের বিষয়ও বটে। একসময় যে বাঙালি শিশু মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে গড়ে তুলত তার কল্পনার স্বর্গরাজ্য, সে শিশুই আজ মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত। এ রূপান্তর নিছক প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, বরং একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও মানসিক দৈন্যদশার লক্ষণ।
সুকুমার প্রবৃত্তি বলতে বোঝায় মানুষের সেই সুকোমল, সৃজনশীল, সহানুভূতিশীল ও মননশীল মানসিক উপাদানগুলি, যা তাকে প্রাণবন্ত, মানবিক ও সংস্কৃতিসম্পন্ন করে তোলে। বাংলা সাহিত্যে এ প্রবৃত্তি রূপ পায় বঙ্কিমচন্দ্রের দেশাত্মবোধে, রবীন্দ্রনাথের প্রাকৃতিক প্রেমে, সুকুমার রায়ের হাস্যরসে, লালন ফকিরের মিলনসংগীতে, বিভূতিভূষণের নির্জন প্রকৃতিপ্রেমে এবং বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের দেশ গঠনের ভাবনায়। এ প্রবৃত্তি শিশুকাল থেকেই গঠিত হয়। খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গল্প বলা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো— এ সবই সুকুমার প্রবৃত্তির চর্চা। কিন্তু আজ তা ব্যাহত হচ্ছে। বাঙালি শৈশব একসময় ভয়কে জয় করে গাছের ডালে দোল খেত, নদীর জলে সাঁতার কাটতে অভ্যস্ত ছিল, বিকেলের খেলার মাঠে শোরগোল তুলত। পরিবার, পাঠশালা, বারোয়ারি— সবই ছিল এ নির্মাণের সহায়ক। শিশুরা নিজেদের আবিষ্কার করত খেলায়, গল্পে, প্রকৃতিতে। বাঙালি কিশোর-জীবনের রূপান্তরসাধনে খেলার মাঠ একটা বড় ভূমিকা পালন করত। খেলা মানে শুধুই শরীরচর্চা নয়, বরং তা ছিল শৃঙ্খলা, দলগত জীবন, পরাজয় ও সাফল্যের অভিজ্ঞতা।
কিন্তু হায়! আজকের নবীন প্রজন্ম তাদের অবসরযাপন ও বিনোদনের জন্য বেছে নিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং, টিকটক বা ইউটিউব। এখন এরা শুধু পশ্চিমি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার ভোক্তামাত্র। এ পরিবর্তনের ফলে বাঙালির মনোজগতে এক নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে গিয়েছে। আগের আবেগপ্রবণতা হ্রাস পেয়ে বাঙালি এখন যন্ত্রের বশীভূত। মেকি সংস্কৃতির ধ্বজাধারী। বাঙালি অভিভাবকরা এখন সন্তানের প্রথাগত সাফল্যের (ডিগ্রি, চাকরি, মার্কস) জন্য কেরিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে শামিল করাচ্ছেন। শিশুমনের সুকুমার প্রবৃত্তি ধূসর জগতের সংস্পর্শে বিস্বাদময় দূষণের শিকারে পরিণত হচ্ছে। ইঁদুর দৌড়ের চাপে শিশুরা আনন্দ হারিয়ে রোবটের জীবন মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
আজকের বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা, সুকুমার রায়ের গল্প বা সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের সঙ্গে একাত্ম হতে পারছে না। তারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক ‘নতুন সংস্কৃতি’-র বাহক, যেখানে দ্রুততা, চটক ও কৃত্রিম আনন্দই মুখ্য। এ বিচ্যুতি মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিপন্ন শৈশব ও বিষণ্ণ স্বপ্নের বশীভূত হয়ে নবীন প্রজন্ম ক্রমশ যান্ত্রিকতার অতলান্তে নিজেকে নিমজ্জিত করে ফেলছে। ক্রমবর্ধমান একাকিত্বের গহীন আঁধারে যৌবন মাথা কুটে মরছে। আত্মপরিচয়ের সংকটের ফলে পরিচয় সমস্যার কবলে পড়ে ছটফট করছে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন প্রজন্ম আজ এমন এক সমাজে বড় হচ্ছে, যেখানে আনন্দচর্চা, মননের অবকাশ নেই। তারা ‘সারভাইভ’ করতে শিখছে, বাঁচতে নয়। কল্পনাশক্তি ছাড়া কোনও জাতি অগ্রসর হতে পারে না। যারা ঠোক্কর খেতে খেতে বেড়ে ওঠে, তাদের ভিত্তি হয় বলিষ্ঠ। কেননা পতনই উত্থানকে সুদৃঢ় করে। নবীন বাঙালি প্রজন্মের সুকুমার প্রবৃত্তির অবক্ষয় কেবল সাংস্কৃতিক সংকট নয়, এটি এক ভয়ংকর অস্তিত্বসংকটকে ডেকে আনছে। পোক্ত শিকড় ছাড়া যেমন বৃক্ষের বাড়বাড়ন্ত সম্ভব নয়, তেমনই সুস্থ সংস্কৃতির আবাহন ব্যতীত জাতির অগ্রগতির পথ অবরুদ্ধ। সচেতন, সক্রিয়, নৈতিক যাপনচর্চা ছাড়া কোনও সমাজ টিকে থাকতে পারে না। সুনির্মল শিশু মনের বিকাশ ঘটলেই মননের পরিধি বিস্তার সম্ভব। আজ সুকুমার মনোবৃত্তি ক্রমশ পিছু হঠে অপসৃয়মান। তাই ফের নতুন জাগরণ চাই। নতুন করে পথচলা শুরু করলেই অন্ধকারের উৎসমুখ বন্ধ করা যাবে।

Right 👍