গৌতম সরকার
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
যোগমায়া দেবী কলেজ
কলকাতা

ইরান এবার অভ্যন্তরীণ সহিংসতার শিকার। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। একদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অন্যদিকে রিয়ালের দরের অস্বাভাবিক পতনে সাধারণ মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ও বাজার বন্ধ রেখে দেশের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের পদত্যাগের দাবিতে পথে নেমে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। এর জবাবে প্রশাসনের নিষ্ঠুর দমননীতির ফলে ইতিমধ্যেই ২৬০০-রও বেশি আন্দোলনকারীর মৃত্যু ঘটেছে। এই অবস্থায় ইরানকে সমুচিত জবাব দিতে ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতি নিয়েছে আমেরিকা। এই নীতিরই একটি প্রয়োগ হল চাবাহার বন্দরের উপর নয়া নিষেধাজ্ঞা। ভারত-সহ বিশ্বের বহু দেশ ওই বন্দরের মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রফতানি করে। আর এ কারণেই চাবাহার বন্দরকে অকেজো করে ইরানকে ভাতে মারতে চাইছে মার্কিন প্রশাসন।
ভারত ও চাবাহার বন্দর:
চাবাহার কথাটির অর্থ চারটি ঝরনা। পারস্য দেশে অবস্থিত ওই বন্দরের মাধ্যমে পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপে ব্যবসা চালায় ভারত। ইরানের দক্ষিণ-পূর্বে ওমান উপসাগরে অবস্থিত ওই বন্দরের নিকটেই আর এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হল হরমুজ প্রণালী। চাবাহারের ভৌগোলিক অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার সাহায্যে ইরান সরাসরি ভারত মহাসাগরের নাগাল পায়। ওটি প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার মাধ্যমে একদিকে ভারত মহাসাগর আর পারস্য উপসাগর যুক্ত হবে কাস্পিয়ান সাগরে। আর অন্যদিকে সেন্ট পিটার্সবার্গ হয়ে উত্তর ইউরোপের সঙ্গেও সংযোগ তৈরি হবে। ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর গড়ে উঠলে সুয়েজ খালের গুরুত্ব অনেক কমে যাবে, কারণ সেক্ষেত্রে ওই নয়া করিডোর ধরে সুয়েজ খালের চেয়ে ১৫ দিন কম সময়ে পণ্য আমদানি রফতানি করা সম্ভব হবে। চাবাহার বন্দর শুধু ভারতের জন্য নয়, বিশ্বের আরও অনেক দেশ, যেমন, ইরান, আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৩ সালে ইরানের সঙ্গে এক চুক্তিতে চাবাহার বন্দরের উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে রাজি হয় ভারত। তারপর দীর্ঘ রাজনৈতিক অশান্তির জেরে ইরানের ওপর বিবিধ নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক কাজকর্ম শুরু করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে এক ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী চাবাহার বন্দর নির্মাণে আর্থিক সহায়তা প্রদানে ভারত সম্মত হয়। ২০২৪ সালে ইরানের সঙ্গে দশ বছরের চুক্তি সম্পাদন হলে ভারত ৩৭০ মিলিয়ন ডলার বা ৩,৩৩৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা জানায়। ভারত সরকারের প্রস্তাবিত ২০৩০ সালে ১০ ট্রিলিয়ন এবং ২০৩৪ সালে ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে স্থিতিশীল বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খুব জরুরি। এর জন্য আরও জরুরি হল চাবাহারের মতো বাণিজ্যপথগুলির যোগাযোগ ঠিকঠাক থাকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কারণেই দিল্লির সাউথ ব্লক চিন্তিত।
চাবাহার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা:
আমেরিকার বিদেশ দফতরের মুখপাত্র থমাস পিগট জানিয়েছেন, ২০১৮ সালেই চাবাহার বন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল মার্কিন প্রশাসন। সে সময় ভারত-সহ বেশ কয়েকটি দেশকে কিছু দিনের বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। এখন তারা এই বিশেষ ছাড় প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই ভারত ও আফগানিস্তানকে ছ’মাস সময় দেওয়া হয়েছিল ওই বন্দর থেকে যাবতীয় ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার জন্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর যে সমস্ত দেশ ইরানের সঙ্গে বহির্বাণিজ্য চালিয়ে যাবে, তাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপাবে আমেরিকা। রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য আগেই দু’দফায় ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারপর আর কোনওভাবেই অতিরিক্ত ২৫ শতাংশের শুল্কের চক্করে পড়তে চাইছিল না ভারত।
ভারত ইতিমধ্যেই বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বসে আছে। বিরোধীরা স্বভাবতই সরকারের এই কর্মকাণ্ডে সরব হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাস্য ছিল, এত টাকা বিনিয়োগ করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপে ভারত কি এক্সিট নীতি গ্রহণ করবে?
চাবাহার ছাড়তেই হবে ভারতকে?
গত ১৫ জানুয়ারি ইকোনোমিক টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চাবাহার প্রকল্পে ভারতের দীর্ঘ একদশকের যোগদান ভেস্তে যেতে বসেছে। তার পরেই রাজনৈতিক মহলজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, শখ করে নয়, বাধ্য হয়েই ভারতকে এই প্রকল্প থেকে সরে আসতে হবে। এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩২ বিলিয়ন ডলার। তাই এই বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে ১২০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি স্বীকার করে নেওয়াই ভারতের পক্ষে বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে। তবে আর একদল বিশেষজ্ঞের মতে, ২০০৩ সাল থেকে শম্বুকের গতিতে চললেও এটি ভারত-ইরান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাই চাবাহার ছেড়ে বেরিয়ে আসা ভারতের জন্য স্ট্র্যাটেজিক ডিফিট হবে। সরকারি তরফের স্বীকারোক্তি, ভারত এখনই হাল ছাড়ছে না। আরব সাগরে এই স্বপ্নের প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে আলোচনার টেবিলে নয়াদিল্লি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কতটা দর কষাকষি করে উঠতে পারবে, তার ওপর।
এ প্রসঙ্গে বিদেশ মন্ত্রকের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চাবাহারে কাজ চালানোর বৈধ অনুমতি বা ওয়েভার ভারতের হাতে রয়েছে। তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে এই মেয়াদ আরও বাড়ানো যায় এবং প্রকল্পটি আগামী দিনে সচল থাকে।
ভারতের তুরুপের তাস:
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকে চাবাহার বন্দরের গুরুত্ব নিয়ে নরেন্দ্র মোদি জনসাধারণকে ওয়াকিবহাল করে আসছেন। ওই বন্দরের আসল গুরুত্ব লুকিয়ে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র এবং ভূ-রাজনৈতিক জটিল সমীকরণে।
পাকিস্তান মুক্ত করিডোর:
আগে ভারত থেকে আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ায় পণ্য পাঠাতে হলে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করতে হত। চাবাহার বন্দর ভারতকে সেই নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে সরাসরি ইরানে পণ্য পাঠিয়ে, তারপর সড়ক ও রেলপথে সেই পণ্য আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছে দিতে সহায়তা করছে৷
চিন-পাকিস্তান অক্ষের মোকাবিলা:
চাবাহার থেকে ১৭০ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তানের গদর বন্দর। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসাবে চিন সেখানে ঘাঁটি গেড়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে চাবাহারে ভারতের উপস্থিতি ভীষণ জরুরি। কারণ আরব সাগরে চিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে আঁতাঁত ভারতের নিরাপত্তার জন্য মোটেই কাম্য নয়। তাই চাবাহারে ভারতের উপস্থিতি গদর বন্দরের ওপর নজরদারি এবং আরব সাগরে চিনের একাধিপত্যে ভাগ বসানো এক চালেই হয়ে যাবে।
মনে রাখতে হবে, ভারত একবার চাবাহার ছেড়ে বেরিয়ে এলে পাকিস্তান ও চিন আপ্রাণ চেষ্টা করবে ওই বন্দরের দখল নিতে। সেটা ভারতের ভবিষ্যতের পক্ষে সুখকর হবে না। এখানেই মোদি সরকারের আসল লিটমাস পরীক্ষা।
আন্তর্জাতিক সংযোগ:
চাবাহারকে বলা হয় ইন্টারন্যাশনাল নর্থ সাউথ করিডোর, যার সাহায্যে ভারত মুম্বই থেকে ইরানের মধ্য দিয়ে রাশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে। ওই বন্দর সুয়েজ খালের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অনেক সস্তায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পণ্য পাঠাতে সাহায্য করে।
১২০ মিলিয়ন ডলারের রহস্য:
নিষেধাজ্ঞার বিপদ আঁচ করতে পেরে নয়াদিল্লি আগেভাগেই চাবাহার প্রকল্পের জন্য প্রতিশ্রুত ১২০ মিলিয়ন ডলার ইরানের হাতে তুলে দেয়। নিষেধাজ্ঞা একবার বলবৎ হয়ে গেলে ভারত থেকে ব্যাঙ্কিং চ্যানেলে ইরানে টাকা পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই সরকারি তরফে তড়িঘড়ি এই পদক্ষেপ।
প্রশ্ন উঠছে, এই বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ কী? বিরোধীরা এ বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা করতে ছাড়ছে না। তার ওপর চাবাহার বন্দরের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়া স্পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেডের বোর্ড থেকে পরিচালকদের গণপদত্যাগ এবং সংস্থার ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে। তাহলে কি সত্যিই চুক্তি ভেঙে বেরিয়ে আসছে ভারত?
সরকারি তরফে ব্যাখ্যা:
চাবাহার নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা ছড়ানো হচ্ছে। ভারত ওই বন্দর চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে যায়নি, কৌশলগত কারণে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়িয়েছে। নয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে আইনগত ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্থা ও কর্মকর্তাদের আইনগত সমস্যার বাইরে আনার চেষ্টা হয়েছে। সে কারণেই নিষেধাজ্ঞা আঁচ করে ভারতের তরফে প্রতিশ্রুতিমতো ১২০ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর ডাইরেক্ট পেমেন্ট সিস্টেম বন্ধ হলেও ইরান ইচ্ছামতো সেই টাকা বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ করতে পারবে। আইপিজিএল বোর্ডের সরকার মনোনীত পরিচালকদের পদত্যাগ ও সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে সরকারি তরফে জানানো হয়েছে, ভারতীয় অফিসিয়ালস ও সংস্থাগুলিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আইনি বিপদ থেকে রক্ষা করতে এটা করা হয়েছে। এই নীতি কাগজে কলমে ভারতের উপস্থিতি কিছুটা কমালেও আগামী দিনে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করতে এবং আফগানিস্তান-সহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
