শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

না ফেরার দেশে চলে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। স্বাধীনতার মাসে গত ৮ আগস্ট তাঁর পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বুদ্ধদেববাবু ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদ অলংকৃত করেন। ২০১১ সালের ২০ মে পর্যন্ত তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের দায়ভার সামলান। ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর প্রথম বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্বে। মন্ত্রিসভায় তাঁর স্থান ছিল ছ’নম্বরে। ১৯৮২ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে দ্বিতীয় বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জায়গা হয়নি। তথ্য-সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্ব সামলান রাষ্ট্রমন্ত্রী প্রভাস ফাদিকার। তারপর ১৯৮৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে তৃতীয় বামফ্রন্ট সরকারে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। তিনি তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর ছাড়াও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন, পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৯১ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে চতুর্থ বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব সামলান তথ্য ও সংস্কৃতি, পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের। ১৯৯৬ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পদমর্যাদায় জ্যোতি বসুর পরেই উঠে আসেন। দায়িত্ব পান উপমুখ্যমন্ত্রীর। তাছাড়াও স্বরাষ্ট্র (পুলিশ), তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরও সামলান। ২০০০ সালের ১১ নভেম্বর তিনি মুখ্যমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হন।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজ্যের সপ্তম ব্যক্তি, যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর তাঁর আগে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু। আর বর্তমানে অষ্টম ব্যক্তি হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
অন্তরে সাদা-সরল বুদ্ধদেববাবু বাইরের প্রকৃতিতে ছিলেন বজ্রকঠোর। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের মাঝামাঝি থেকেই নীতি নিয়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে সিপিএম নেতৃত্বের সংঘাত তৈরি হয়। প্রথমে দল তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর হলেও পরবর্তীকালে তাঁর প্রয়োজনীয়তা বুঝে নরম হয় ও গুরুত্ব দিতে শুরু করে। তিনি ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েই পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি, জৈব প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জোর দিতে শুরু করেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘লুক ইস্ট’ বা ‘পুবের দিকে তাকাও’ নীতির পুরোপুরি ফসল তুলতে কোমর বেঁধে নেমে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি বুঝেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গই এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একমাত্র প্রবেশদ্বার।
অন্য পোস্ট: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বামী বিবেকানন্দ
দূরদর্শী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি অর্থনৈতিক প্রগতি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে ঘুরে দাঁড় করানোর অঙ্গীকার করেছিলেন। শিল্পে উৎপাদনশীলতা এবং অগ্রগতির বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। ‘এক জানালা’ ব্যবস্থায় সরলীকরণ প্রক্রিয়ায় ক্ষেত্রভিত্তিক শিল্পনীতির বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন। তাঁর আমলে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এ রাজ্যে ১২১৮টি শিল্প সংস্থা গড়ে উঠেছিল। ২০০৪ সাল পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ লক্ষ। ২০০২ সালের ৮ জানুয়ারি চালু করেন দফতরের তথ্য বিতরণের জন্য নাগরিক পরিষেবার পোর্টাল ‘বাংলার মুখ’ । চালু করেন ই-গভর্ন্যান্স। স্কুল, অফিসে কমপিউটার শিক্ষা চালু করেন। চেয়েছিলেন ২০১০ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গকে তিনটি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর রাজ্যের অন্যতম করে গড়ে তুলতে। হস্তশিল্প ও সুতিবস্ত্র, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পের ওপর প্রভূত জোর দিয়েছিলেন। ২০০৫-‘০৬ অর্থবর্ষে ১৩০৯টি ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিটকে চূড়ান্তভাবে নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা করেছিলেন। ওই অর্থ বছরেই ৬৫৭০টি নতুন শিল্প ইউনিট স্থাপিত হয়েছিল।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শাসনকাল নিরুপদ্রব ছিল না। ঘরে-বাইরে তাঁর শত্রু ও সমালোচক বৃদ্ধি পেয়েছিল। রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ক্রমশ বেড়ে উঠেছিল। উত্তরবঙ্গে কামতাপুরি, দক্ষিণবঙ্গে মাওবাদী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে নিশ্চিন্ত থাকতে দিচ্ছিল না। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠেছিল। শেষমেশ ক্ষমতা হারাতে হয় তাঁকে। ২০১১ সালের ২০ মে থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে যান।
