ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

‘চল কোদাল চালাই, ভুলে মানের বালাই,/ ঝেড়ে অলস মেজাজ, হবে শরীর ঝালাই।/ যত ব্যাধির বালাই, বলবে, পালাই পালাই, পেটে খিদের জ্বালায় খাব ক্ষীর আর মালাই।’ এ গানটির মাধ্যমে গুরুসদয় দত্ত বাংলার ভাবজগতে এক আন্দোলনের ঢেউ তোলেন, যা ব্রতচারী আন্দোলন নামে খ্যাত হয়ে রয়েছে। এর মূল কথা ছিল শরীরচর্চার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও সহিষ্ণু সমাজ গঠন করা। ব্রতচারী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন গুরুসদয় দত্ত (১০ মে, ১৮৮২-২৫ জুন, ১৯৪১)। তিনি ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী, লোকসাহিত্য গবেষক এবং লেখক। তিনি বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বিরশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রামকৃষ্ণ দত্তচৌধুরী ছিলেন সম্ভ্রান্ত জমিদার। মায়ের নাম আনন্দময়ী দেবী।
১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে গুরুসদয় দত্ত একটি আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের আন্দোলনের ধারাস্বরূপ ব্রতচারী আন্দোলনের সূচনা করেন। ব্রিটিশ ভারতের বাঙালি নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম, বাঙালি জাতীয় চেতনা ও নাগরিকত্ববোধ তৈরি করা ছিল এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বহুবিশ্রুত মনীষীও এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ব্রতচারী সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল কলকাতার ১২ নং লাউডন স্ট্রিটে। অবিভক্ত বাংলার অনেক এলাকায় এ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর ব্রতচারী সমিতির মুখপত্র হিসাবে ‘ব্রতচারী বার্ত্তা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলার ব্রতচারী সমিতির উদ্যোগে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ‘বাংলার শক্তি’ নামেও একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। ব্রতচারী আন্দোলনে ভুক্তির জন্য প্রথমে তিনটি উক্তি স্বীকার করে নিতে হত— ১) আমি বাংলাকে ভালোবাসি, ২) আমি বাংলার সেবা করব এবং ৩) আমি বাংলার ব্রতচারী। তারপর পঞ্চব্রত— ব্রতচারীর প্রতিজ্ঞা, ব্রতচারীর ষোলো পণ, ষোলো পণের অতিরিক্ত এক পণ, ব্রতচারীর সতেরো মানা (নিষেধাজ্ঞা), ব্রতচারী বৃত্ত ইত্যাদি আবৃত্তি করে এ আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত হতে হত। ব্রতচারী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি ব্রতচারীদের জ্ঞান, শ্রম, সত্য, ঐক্য ও আনন্দের সঙ্গে জীবনযাপনের পথ প্রদর্শন করানো। ব্রতচারীদের সত্যনিষ্ঠা, সংযম, অধ্যবসায় ও আত্মনির্ভরতা ছিল এ আন্দোলনের বৈশিষ্ট।
বাংলার ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর তিনের দশক ছিল এক জটিল, অথচ সৃজনশীল পরিবর্তনের যুগ। সে সময় বাঙালি সমাজ নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সন্ধানে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পর্যালোচনায় নিমগ্ন ছিল। সে কারণে নানা আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক চরিত্র গঠনের একাধিক আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে। ব্রতচারী আন্দোলন এ প্রয়াসকে এক অভিনব সাংস্কৃতিক রূপ দিয়েছিল, যেখানে ব্যক্তিগত নৈতিকতা, শারীরিক সক্ষমতা, শ্রমের মর্যাদা এবং সম্মিলিত আনন্দ একসঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এক ঐক্যবদ্ধ জীবনের দর্শনে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এক দ্বৈতসংকটে পতিত হয়েছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষায় গঠিত আধুনিক চিন্তাশক্তি তাদের আত্মবিশ্বাস জাগালেও বাস্তব জীবনে সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, শারীরিক অক্ষমতা ও নৈতিক দুর্বলতা সমাজকে গ্রাস করেছিল। পশ্চিমি সভ্যতার ছায়ায় গড়ে ওঠা ‘বাবু সংস্কৃতি’ একপ্রকার কৃত্রিম অহংকারের জন্ম দিয়েছিল, যেখানে শরীরচর্চা, শ্রম ও ঐক্যবোধকে নিম্নস্তরের বিষয় হিসাবে দেখা হত। এমন পরিস্থিতিতে জাতির শারীরিক ও নৈতিক শক্তির পুনরুদ্ধারের জন্য এক নতুন আন্দোলনের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল। গুরুসদয় দত্ত সে প্রয়োজনকে উপলব্ধি করেছিলেন এবং ব্রতচারী আন্দোলনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও জাতীয় চরিত্রগঠনের এক সাংস্কৃতিক কর্মসূচি চালু করেন।
‘ব্রত’ শব্দটি ভারতীয় সংস্কৃতিতে গভীর ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে। ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে উপনিষদ, পুরাণ, এমনকী লোকসংস্কৃতির মধ্যেও ‘ব্রত’ মানে আত্মসংযম, শৃঙ্খলা ও উদ্দেশ্যনিষ্ঠ জীবনচর্চা। বাংলার সমাজজীবনে নারী-পুরুষ উভয়েরই ব্রতপালনের নানা ধারা ছিল— শিবের ব্রত, লক্ষ্মী ব্রত, পূর্ণিমা ব্রত ইত্যাদি। এ ব্রত সংস্কৃতি মূলত ব্যক্তিকে নিজ দায়িত্ব ও সমাজের প্রতি কর্তব্যের বোধে স্থিত করত। গুরুসদয় দত্ত সে ঐতিহ্যকে আধুনিক অর্থে পুনরায় জীবিত করেন। তিনি মনে করেন, ব্রত কেবল ধর্মীয় আচরণ নয়, এটি নাগরিক জীবনের নৈতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি। তাঁর ভাষায়, ‘ব্রতচারী সেই ব্যক্তি, যিনি জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে ব্রতনিষ্ঠ, অর্থাৎ শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্ম ও নৈতিকতার পথে চলেন।’ তিনি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রতচারী আন্দোলন শুরু করেন। লন্ডনে বসে তিনি ‘Five-fold Path of Bratachari’ রচনা করেন, যেখানে বলা হয়, ‘The Bratachari is he who lives by vows— of knowledge, work, worship, physical culture and joy.’ বাংলায় এ ভাবনাকে তিনি অনুবাদ করেন এভাবে— শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম, সংগঠন ও আনন্দ, এ পাঁচটি ব্রতই জীবনের মূল স্তম্ভ। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি বা ধর্ম নয়, সমাজকে টিকিয়ে রাখে নৈতিক চরিত্র। তাঁর মতে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু তথ্য আহরণ নয়, বরং ব্রতনিষ্ঠ চরিত্রের সৃষ্টি। তিনি ‘ব্রত’কে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে, ‘ব্রত মানে দায়িত্বের প্রতি অনুশাসন, নিজেকে সংযমের মাধ্যমে সমাজের কাজে নিয়োজিত করা।’ তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন জাতি নৈতিকভাবে দৃঢ় হয়। এ কারণে ব্রতচারী আন্দোলন একপ্রকার ‘জাতীয় পুনর্জাগরণের সংস্কার আন্দোলন’, যা জাতিকে ‘ব্রতনিষ্ঠ’ জীবনযাপনের মাধ্যমে একত্রিত করতে চেয়েছিল।
গুরুসদয় দত্ত বিশ্বাস করতেন, স্কুল ও কলেজই জাতীয় চরিত্র গঠনের মূল ক্ষেত্র। তাই তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, বিদ্যালয় শিক্ষার মধ্যে ব্রতচারী পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তাঁর মতে, পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান তখনই অর্থবহ, যখন তা বাস্তব জীবনের শ্রম, সংগঠন ও আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাঁর এ ভাবনার প্রভাবে ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় সরকার ব্রতচারী শিক্ষাকে বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৪০ সালের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিদ্যালয়ে ব্রতচারী পাঠ শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গুরুসদয়কে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘তুমি যে নতুন পথ দেখিয়েছ, তা আমাদের ভবিষ্যৎ জাতি নির্মাণে সহায়ক হবে।’ রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের আদর্শ ও গুরুসদয়ের ব্রতচারী দর্শনের মধ্যে অনেক মিল ছিল। দু’জনই বিশ্বাস করতেন, জীবনই শিক্ষা এবং শিক্ষা মানে আত্মোন্নয়ন।
ব্রতচারী আন্দোলন কেবল একটি শারীরিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল এক সামাজিক সংস্কার চেষ্টা। এটি মানুষকে তাদের সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছিল। গ্রামীণ সমাজে ব্রতচারী দল গঠন করে মানুষকে দলগত শ্রম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষার প্রসার ও উৎসবের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করা হত। ফলে গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নৈতিক অনুশাসন। তাই বলা যায়, ব্রতচারী আন্দোলনের উদ্ভব এক গভীর ঐতিহাসিক প্রয়োজনের ফল। সে প্রয়োজন ছিল জাতির নৈতিক ও সামাজিক পুনর্জাগরণের। আধুনিকতার নামে আত্মবিস্মৃত, শারীরিকভাবে দুর্বল, নৈতিকভাবে ক্ষয়িষ্ণু সমাজের সামনে গুরুসদয় দত্ত এক নতুন পথ খুলে দিয়েছিলেন, যেখানে জীবন মানে ব্রত, কর্ম মানে আনন্দ এবং সমাজ মানে সংগঠন। তাঁর এ দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ আধুনিক নগরজীবনের নৈতিকতা ও সামষ্টিগত শৃঙ্খলার সংকট ক্রমবর্ধমান।
