Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ভূত চতুর্দশী, ১৪ প্রদীপ, ১৪ শাকের তাৎপর্য

Share Links:

কাজল মুখার্জি

মহালয়ায় পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে খাদ্য ও জল দান করা হয়। আর কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে, অর্থাৎ কালীপুজোর ঠিক আগের দিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে প্রদীপ জ্বালানোর বিধান রয়েছে শাস্ত্রে। বাঙালি হিন্দুদের কাছে এই তিথি ‘ভূত চতুর্দশী’, অন্যদিকে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের একাংশে একেই ‘নরক চতুর্দশী’ বলে। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে নরকাসুরকে বধ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। সে কারণেই বাঙালির ‘ভূত চতুর্দশী’, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের একাংশে ‘নরক চতুর্দশী’।

এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এই দিনটি ছোট দিওয়ালি, রূপ চৌদাস, নরকা চৌদাস, রূপ চতুর্দশী বা নরকা পূজা নামেও পরিচিত। কোথাও কোথাও এই দিনে যমরাজ ও শ্রীকৃষ্ণের পুজো করা হয়। অনেকেই দীর্ঘজীবন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যে এই তিথিতে যমরাজের পুজো করেন।

ভূত চতুর্দশী পালনের একটি বিশেষ রীতি হল বাড়িতে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো। প্রায় একই সময়ে (প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর) পরলোকগত আত্মাকে স্মরণ করে পশ্চিমি দুনিয়ায় পালিত হয় হ্যালোইন ইভ।

২০০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই ভূতুড়ে উৎসবের ইতিহাস। হ্যালোইন ইভের অর্থ হল ‘পবিত্র সন্ধ্যা’। কেন জ্বালানো হয় ১৪টি প্রদীপ? প্রাচীন শাস্ত্র, পুরাণ, কল্পকথা অনুসারে এই রীতির নেপথ্যে নানাবিধ ব্যাখ্যা রয়েছে। যেমন, একটি মত হল, ১৪ জন প্রেত অনুচরকে সঙ্গী করে কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে অশুভ শক্তিকে বিনাশ করেন দেবী চামুণ্ডা। অন্য মত অনুসারে, এই দিন স্বর্গ ও নরকের দ্বার কিছুক্ষণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সেই দরজা দিয়ে পরলোকগত আত্মারা মর্ত্যে ফিরে আসে। পিতৃকুল ও মাতৃকুলের চৌদ্দপুরুষের অশরীরী আত্মা নেমে আসে গৃহস্থের বাড়িতে।

অন্য পোস্ট: রবীন্দ্রনাথও বিদ্যাসাগরকে চেনাতে পারেননি

এই তিথিতেই নাকি রাজা বলি অসংখ্য অনুচর-সহ ভূত, প্রেত নিয়ে মর্তে নেমে আসেন পুজো নিতে। বলি রাজা, পূর্বপুরুষের প্রেতাত্মা ছাড়াও অন্যান্য বিদেহী আত্মা এই দিন মর্তলোকে নেমে আসে। আর ভূত, পিশাচ, প্রেত থেকে বাঁচতে, অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপ থেকে বাঁচতে ও ‘নেগেটিভ’ এনার্জি বা অশুভ শক্তিকে বাড়ি থেকে তাড়াতেই ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়।

ভূত চতুর্দশীর সঙ্গে বলি রাজার সম্পর্ক কী? পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, শ্রীবিষ্ণুর ভক্ত প্রহ্লাদের পৌত্র দৈত্যরাজ বলি সাধনবলে শক্তি অর্জন করে স্বর্গ, মর্ত ও পাতাল জয় করে ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। এমনকী দেবতারাও তাঁর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছিলেন না। স্বর্গরাজ্য দখল করে দেবতাদের বিতাড়িত করার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। সেই অবস্থায় শ্রীবিষ্ণুর দ্বারস্থ হলেন দেবতারা। বলির তাণ্ডব থামাতে বামন রূপ ধারণ করে আবির্ভূত হলেন শ্রীবিষ্ণু। দানবরাজ বলির কাছে তিনটি চরণ রাখার জায়গা ভিক্ষা চাইলেন। ভিক্ষা দিতে রাজি হলেন বলি। দু’পা দিয়ে স্বর্গ ও মর্ত দখল করে নিলেন বামনরূপী শ্রীবিষ্ণু। তৃতীয় পা কোথায় রাখবেন, তা জিজ্ঞাসা করা মাত্র প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলি নিজের মাথা পেতে দিলেন বামন অবতারের চরণে। বলির মাথায় পা রেখে তাঁকে পাতালে প্রবেশ করান বামন অবতার। সেই থেকে পাতালই হল দৈত্যরাজ বলির আবাস। তবে তাঁর এই আত্মাহুতি দেখে শ্রীবিষ্ণু বলিকে অমরত্ব প্রদান করেছিলেন। সেই সঙ্গে বছরে একটি দিন তাঁকে ভূত, প্রেতাত্মা, পিশাচ, অশরীরীর সঙ্গে এই পৃথিবীতে আসার অনুমতি দেন। সেই দিনটিই হল ভূত চতুর্দশী।

এই দিনই যম দীপ দান করার বিধান রয়েছে। এছাড়াও ধর্মরাজ, মৃত্যু, অন্তক, বৈবস্বত, কাল, সর্বভূতক্ষয়, যম, উড়ুম্বর, দধ্ন, নীন, পরমেষ্ঠী, বৃকোদর, চিত্র ও চিত্রগুপ্ত, যমলোকের এই ১৪ জনের উদ্দেশে তর্পণ করার রীতিও প্রচলিত রয়েছে। বলিরাজ জেনে বুঝেও দান করেছিলেন বলে ভগবান বিষ্ণু রাজা বলির নরকাসুর রূপের পুজোর প্রবর্তন করেন। নরকাসুররূপী রাজা বলি কালীপুজোর আগের দিন ভূত চতুর্দশীর তিথিতে অসংখ্য অনুচর-সহ ভূত, প্রেত নিয়ে মর্তে নেমে আসেন পুজো নিতে। আর মানুষ পরলোকের ভূত-প্রেতকে দূরে রাখতে ১৪ শাক খেয়ে, ১৪ প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং ১৪ ফোঁটা দিয়ে এই তিথিকে উদযাপন করে আসছে বহুকাল থেকেই।

১৪টি শাক হল, (১) ওল (২) কেঁউ (৩) বেতো (৪) সরষে (৫) কালকাসুন্দে (৬) নিম (৭) জয়ন্তী (৮) শাঞ্চে (৯) হিলঞ্চ (১০) পলতা (১১) গুলঞ্চ (১২) ভাটপাতা (১৩) শুষনি ও (১৪) শৌলফ। তিথিটি চতুর্দশী, তাই ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়ে থাকে পরোলোকগত পিতৃপুরুষ, প্রেতাত্মা, ধর্ম, বিষ্ণু, কান্তারপতি বা অরণ্যে অধিষ্ঠিত দেবতার উদ্দেশে।

অন্য পোস্ট: কষ্টেসৃষ্টে কিপ্টে মামা

পৃথিবী, জল, বায়ু, অগ্নি, আকাশ নিয়ে পঞ্চভূত। মানুষের মৃত্যুর পর দেহ পঞ্চভূতেই মিলিয়ে যায়। তাই ভূত চতুর্দশীতে পৃথিবী, জল, বায়ু, অগ্নি, আকাশ, এই পঞ্চভূতকে সম্মান জানানো হয়। এই প্রথাই যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে, কিন্তু কালীপুজোর ঠিক আগের দিনই কেন এই রীতি পালিত হয়? আসলে শাস্ত্রে ১৪ সংখ্যাটির বিশেষ গুরুত্ব আছে। কালীপুজোর আগের রাত ভূত চতুর্দশী। ঊর্ধ্বলোকের সপ্তলোক অর্থাৎ সপ্তসর্গ— ভূ, ভুব, স্ব, জন, মহ, তপ, সত্য। আর পাতালের দিকে তাকালে সপ্তলোক পরিস্ফুটিত হয়— অতল লোক, বিতল লোক, সুতল লোক, তলাতল লোক, মহাতল লোক, রসাতল লোক, পাতাল লোক। এই দুই লোক মিলিয়ে ১৪। এই ১৪ লোকে জীবের অবস্থান বোঝাতেই ১৪ বাতি দেওয়া, যাতে তারা আলোকিত হয়।

আবার গণিতের ভাষায় নয় ও পাঁচ যোগ করলে হয় ১৪। দুই চোখ, দুই নাসিকা ছিদ্র, দুই কান, এক মুখগহ্বর, পায়ুদ্বার, লিঙ্গ। আর সেই সঙ্গে পঞ্চভূত— ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। মানব শরীরে এই দিকগুলিকে জাগ্রত করার প্রতীক হিসাবেও ১৪টি দীপ জালানো হয়ে থাকে।

আর  ১৪ শাকের বিধান কী বলছে? আসলে শাক এমন একটি জিনিস, যা সব জায়গায় জন্মায়। তাই ১৪ শাকের মাধ্যমে ১৪ লোকের সব জীব যেন শাকভাতে থাকতে পারে, সেটাই প্রার্থনা করা হয়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए