Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ভালো থাকি কেমনে

Share Links:

বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়

মুখমণ্ডল জুড়ে প্লাস্টিক হাসি ঝুলিয়ে আমরা দিব্যি ঘুরে বেড়াই, দম দেওয়া ঘড়ির মতো অহর্নিশ কাজ করে চলি। সমাজ ও কর্মক্ষেত্র রূপ রঙ্গমঞ্চে শুধুই অভিনয় করে যাওয়া। গ্রিন রুমে (পড়ুন সুখী গৃহকোণ) ফিরে আবার যে কে সেই। পাউডারের প্রলেপ উঠে গিয়ে একেবারেই বেআবরু হয়ে পড়া। দিনান্তের অভিনয় শেষে ভিতরে ভিতরে রক্তাক্ত, পরিশ্রান্ত শরীরটাকে টানতে টানতে কোনওক্রমে ডাগ আউটে এনে ফেলা। পরের দিনের অভিনয়কে আরও বেশি সুচারু ও ত্রুটিহীন করার লক্ষ্যে স্ক্রিপ্ট ভাবনা ও প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ। এভাবে ভেসে থাকা, চালিয়ে নেওয়া। যখন কেউ জিজ্ঞেস করেন, কেমন আছেন? তাৎক্ষণিক সহাস্য উত্তর থাকে, ভালো আছি, বেশ ভালো। একেবারে ভরসাযোগ্য কাছের লোকের সকাশে, অবশ্যই আশপাশে নিজের মতো কোন অভিনেতা না থাকলে, উত্তরটা কখনও কখনও পালিশ ধরে রাখতে পারে না। ভালো যে নেই, সেটা কথা ও ভাবে পরিস্ফুট হয়। গড় মানুষের পরিস্থিতি বর্তমানে এরূপ। হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা জাত সামাজিক ও পেশাগত অসদ্ভাব এবং হীনমন্য আস্ফালন আপনাকে হৃদয় ও মন খুলে কথা বলতে উৎসাহ জোগাবে না।

মানুষ সব সময় ভালো থাকে না, ভালো-মন্দ নিয়েই জীবন। ধনী-নির্ধন, ভোগী-ত্যাগী, গোরা-কালা, সকলের ক্ষেত্রেই এটা সমানভাবে সত্য। কিন্তু ক্ষণিকের ভালো থাকার পর যখন আপনি দুঃসময়ের সম্মুখীন হয়েছেন, লড়াইটা একান্তই আপনার। সে লড়াই আপনাকেই লড়তে হবে হাসি বদনে, সামলে নিতে হবে সর্বশক্তি দিয়ে। কারণ ওই যে বললাম, আপনার একনিষ্ঠ ঋণাত্মক শুভানুধ্যায়ীরা এটা বুঝতে পারলে আপনার মন্দ সময়ের ভরপুর সুযোগ নিয়ে নেবে। সেক্ষেত্রে বেল্টের নীচে মারতেও তাদের বাধবে না। এ বিষয়ে তারা অত্যন্ত বাস্তববাদী ও অবশ্যই সুযোগসন্ধানী। আবেগ, প্রক্ষোভ, মানবিক মূল্যবোধ, সহানুভূতি তাদের থেকে আশা করাই বাতুলতা।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এক বিশ্ব বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার শেখান কীভাবে রোমান্টিক ভাবালুতা (sentimentality) আবেগকে অস্বীকার করতে হয়। তাঁর সাড়া জাগানো ‍‘আমস অ্যান্ড দ্য ম্যান’ নাটকে তিনি পরিষ্কার করে লিখেছেন, ‍‘তোমার শত্রু যখন দুর্বল, তখন তাকে তুমি নির্দয়ভাবে প্রহার করো।’ বর্তমানে সর্বক্ষেত্রে জীবনযুদ্ধ একই নীতিতে চলে। কঠোর কঠিন বাস্তবের সামনে ভাবালুতা, সরলতার কোনও স্থান নেই। তবে আবেগ চাপা দেওয়ার কাজটাও অতটা সোজা নয় মোটেই। আর তাই আমরা আঘাত পেলে কেঁদে ভাসাই এবং আনন্দের আতিশয্যে উদ্বেল হই।

শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতার জ্ঞানযোগে একজন স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যে কোনও পরিস্থিতিতেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ থাকবে না। কিন্তু আমরা কতজন সে অর্থে স্থিতপ্রজ্ঞ হতে পেরেছি? পুরোটাই ম্যানেজমেন্ট। কেউ মনের সুখে উদাসী গান ধরে, কেউ বা হৃদয় নিংড়ে লিখে চলে, আবার কেউ দিনান্তে ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরটাকে আড্ডার ঠেক পর্যন্ত নিয়ে আসে দু’দণ্ড ভালো থাকার আশে, জল থেকে মাথা বের করে একটু শাস নেওয়ার অভিপ্রায়ে। এখন আবার শহরগুলোতে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের মতো আচরণ ব্যবস্থাপনার (behavioural management) কোর্স হয়েছে। বড় বড় শহরে আবার লাফিং ক্লাব দেখা যায়। সেখানের সমাবেশ মূলত একটুক্ষণের জন্য চলমান বিরামহীন অভিনয়কে সরিয়ে রেখে রাখাল দাসের মতো অভিনয়ের অট্টহাসিকে আপন করে নেওয়া। কান্নার মতো হাসিও একজনের মানসিক স্থিতির আবেগী বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কিন্তু লাফিং ক্লাবের হাসিটা স্বাভাবিক নয়, কষ্টে সৃষ্ট। তাই এটা আর একটা ভিন্নধর্মী অভিনয় ছাড়া কিছু নয়। অর্থাৎ সেখানেও সেই অভিনয়। অতএব লাভের অঙ্ক শূন্য।

আমরা সাধারণ মানুষরা স্থিতপ্রজ্ঞ না হয়েও দৈনন্দিনের জনারণ্যে মিশে থেকে আত্মরক্ষার্থে আত্মঅবদবনে, আবার কখনও আত্মরক্ষার সযত্ন বিজ্ঞাপনের স্বার্থে সুন্দর অভিনয় করে চলি। আত্মঅবদমন নয়, চাই আত্মনিয়ন্ত্রণ। কারণ অবদমনে থাকে ধর্ষকাম প্রবৃত্তি। আত্মনিয়ন্ত্রণে হৃদয় ও মনের ভারসাম্যযুক্ত মেলবন্ধনের ছটা একজনকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। এ পৃথিবীতে আত্মবিশ্বাসী মানুষ কখনওই খারাপ থাকতে পারে না। স্বামী প্রণবানন্দ বলেছেন, নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখাই ধর্ম, বিশ্বাস হারানোই পাপ। তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস (over confidence) একজনকে অহংকারী বানায়। এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হন নম্র, ভদ্র, যেখানে একজন অহংকারী হন উদ্ধত ও দুর্বিনীত।

একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের ভাষ্য যেখানে থাকে ‍‘আমি পারব’, সেখানে একজন অহংকারী বলেন, ‍‘আমিই পারব’। আত্মবিশ্বাস-প্রজ্ঞার সঙ্গে অহংকারের ঘোর বিরোধ। এ প্রসঙ্গে একজন বিখ্যাত বাঙালি, যিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন নিরহংকার ঋষিতুল্য মানুষ, তাঁর কথা না বললেই নয়। প্রখ্যাত রবীন্দ্র স্নেহধন্য সাহিত্যিক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী তাঁর রবীন্দ্র স্মৃতিকথা আখ্যানের এক জায়গায় স্থিতপ্রজ্ঞ রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর পুত্রের দাহকর্ম সেরে বাড়ি ফিরছেন। পথে প্ল্যাটফর্মে কতিপয় গুণগ্রাহী ও প্রকাশকের সঙ্গে তাঁর দেখা। সদ্য পুত্রহারা রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রিত রেখে তাঁদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় বার্তালাপ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। সম্ভবত তখনকার দিনে আচরণ ব্যবস্থাপনার শিক্ষা training ছিল না। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তাঁর আচরণ পুরোটাই ছিল আত্মোপলব্ধিসঞ্জাত। আমাদের মতো তাঁকে কষ্ট করে স্বাভাবিক আবেগের প্রতিকূলে হেঁটে কিছু লুকোতে হয়নি। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই গীতা স্থিরীকৃত একজন প্রকৃত স্থিতপ্রজ্ঞ বা পণ্ডিত ব্যক্তি। শ্রীমদ্ভাগবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যিনি মনোগত সমুদয় বাসনা পরিত্যাগ করেছেন, যিনি দুঃখে ভেঙে পড়েন না, আবার সুখেও নিষ্পৃহ থাকেন, যার মধ্যে ভয় নেই, ক্রোধ নেই, আসক্তি নেই, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যাক্তি। আমরা গৃহী মানুষরা সাধারণত আশা-নিরাশার দোলাচলে সততই উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন থাকি। আবার সেই গীতার কথাতেই আসি। তাতে বলা হয়েছে, আমার অধিকার কর্ম ফলে নয়, ফলের আশা না করে কর্ম করে যেতে হবে। এটাই নিষ্কাম কর্ম। কর্ম ও ফলে আসক্তি ত্যাগ করে নিত্যানন্দে পরিতৃপ্ত থাকাই আমাদের ধ্যেয়নিষ্ঠা হওয়া উচিত। নিষ্কাম কর্ম প্রত্যাশার সফেন বুদবুদ তৈরি করে না। তাই হাওয়া বেরিয়ে গেলেও কর্মযোগীকে এটা প্রভাবিত করতে পারে না। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি, টিউটররা সব নামী-দামি। বৎসরান্তের ফলাফল যত ভালোই হোক না কেন, তা প্রত্যাশা রেখাকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রত্যাশা সর্বদাই মরীচিকার মতো। প্রত্যাশার পারদ চড়চড় করে এত উপরে ওঠে যে, তা সন্তুষ্টির স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারে না। শ্রীমদ্ভাগবদগীতায়  একজন পণ্ডিত মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘যস্য সর্বে সমারম্ভা: কামসংকল্পবর্জিতা:।/ জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মানং তমাহু: পণ্ডিতং বুধা:।।’ অর্থাৎ যার সমস্ত কর্মই ফল কামনাবিহীন এবং জ্ঞানরূপ অগ্নি দ্বারা সমুদয় কর্ম দগ্ধ হয়েছে, তাকেই পণ্ডিত বলে।

মোদ্দা কথা, হচ্ছে, উচ্চপ্রত্যাশা কর্মে মনোনিবেশের পথে বাধাস্বরূপ। প্রত্যাশার গাছ ডালপালা মেললে পরিণামে তা হতাশা উদ্রেক করে। আন্তরিক ভালো থাকা শুধু আমাদের নিজেদের দৈহিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নির্ভর করে না। আপনজনদের কুশলে থাকা না থাকা আমাদের ভালো থাকাকে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। আর এ জিনিস তো সংসারে ঘটতেই থাকে। তাই খারাপ থাকার কালাংশই প্রলম্বিত হয়ে চলে আমাদের জীবনে। আর প্রজ্ঞার অভাব হেতু অভিনয়কে সম্বল করে দিনাতিপাত। ‍‘ভালো আছি, এই বেশ ভালো আছি’, এই উচ্ছল প্রকাশ ‘প্রত্যয়’ (conviction)-এর গভীর থেকে উঠে আসে না। বচন এবং বদনকে সমরৈখিক অবস্থানে নিয়ে আসার সে কী প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা আমাদের! সখা, ভালো থাকি কেমনে!

4.5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए