অজয় ভট্টাচার্য

বনগাঁ শহরের ছয়ঘরিয়ার জোড়া শিবমন্দিরের অদূরেই প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠাকুরদা গৌরহরি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভগ্নপ্রায় বাড়িটি আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে অতীত গৌরবের সাক্ষী হয়ে। রাখালদাসের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি আজ নিজেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়। বিভিন্ন শরিকের মধ্যে ভাগ হয়ে সর্বাঙ্গে অযত্নের ছাপ নিয়ে এটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে হয়তো কালপ্রবাহের চিহ্ন নিয়ে একদিন ইটের স্তূপে পরিণত হবে।
বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে চোখে পড়বে মস্ত বড় ফলকহীন দরজা। বিশাল উঠোনের পাশেই মণ্ডপ ঘর ও মণ্ডপ ঘরসংলগ্ন দালান বাড়ি। প্রায় ৩০০ বছর আগে রাখালদাসের ঠাকুরদা গৌরহরি বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঠাকুরদালানে দুর্গাপুজোর সূচনা করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে যে, গৌরহরি বন্দ্যোপাধ্যায় একদিন স্বপ্নে অদ্ভুতদর্শন এক দেবীমূর্তি দেখতে পান। তার দশটি হাতের মধ্যে দু’টি হাত কেবল বড়ো। বাকি আটটি বেড়ালের সামনের পায়ের মতো ছোট। গৌরহরি ভাবলেন, দেবী তাঁকে এই রূপেই পুজো করার নির্দেশ দিতে স্বপ্নে দেখা দিয়েছেন। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। স্বপ্নাদেশ পাওয়া দেবীর আদলেই নির্মিত হয় দেবীমূর্তি। কালে কালে তার নাম হয়ে যায় ‘বেড়ালহাতি দুর্গা’।
পুজো শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ঠাকুরদালানে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। আজও বেড়ালহাতি দুর্গার পুজো হয়ে চলেছে এই ঠাকুরদালানে। দূরদূরান্ত থেকে অনেকে আসেন এই দেবীমূর্তি দর্শন করতে। একসময় সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত বলির প্রথা চালু ছিল। কিন্তু পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।
বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজো বলে কথা! তাই প্রতিমা নিরঞ্জনেও থাকত নানা চমক। দশমীর দিন দুপুরের পর থেকেই শুরু হত সিঁদুরখেলা। দেবীকে বরণ করে সিঁদুরখেলা সাঙ্গ হতে হতে আকাশে দেখা দিত সন্ধ্যাতারা। আর তার পরই হত প্রতিমা নিরঞ্জন। বড় হওয়ার পর রাখালদাস নিজে থাকতেন প্রতিমা নিরঞ্জনের দায়িত্বে।
বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ি থেকে একটু দূরে নাওভাঙা নদী। এটি হরিদাসপুর ইস্কন মন্দিরের গা ঘেঁষে বেরিয়ে এদিকে এসেছে। যদিও বর্তমানে নাওভাঙার অবস্থা আর পাঁচটা নদীর মতোই মৃতপ্রায়। কেবল বর্ষায় দু’কুল ছাপিয়ে নদীটি তার অতীত গৌরবের কথা জানান দেয়। তবে নাওভাঙা ছোট নদী হলেও তার দু’ধারে এখনও অনেকটা জায়গা জুড়ে অকৃত্রিম প্রকৃতি টিকে আছে। এই নদীতেই বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। দু’টি নৌকোর উপর প্রতিমা রেখে প্রথমে প্রতিমাকে সাত পাক ঘোরানো হয়। তারপর নৌকো দু’টিকে ধীরে ধীরে দু’দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিমা পড়ে যায় জলে। প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকের তালে আকাশ-বাতাস জুড়ে আওয়াজ ওঠে, ‘আসছে বছর আবার হবে’।
