মহাশোরগোল প্রতিবেদন: সাধারণ মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নানা জায়গায় বিভিন্ন উপলক্ষে আয়োজিত হয় লোক উৎসব। তেমনই একটি লোক উৎসব হয় বাণীপুরে। এ বছর বাণীপুর লোক উৎসব ৬৯ বছরে পড়ল। গত ৩ জানুয়ারি এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে এবারের বাণীপুর লোক উৎসবের সূচনা হয়। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাণীপুরের এই উৎসবের নাম ইতিমধ্যে জেলা ছাড়িয়ে দূরদূরান্তে পৌঁছে গিয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বৃহত্তম এই মেলায় প্রতিবছরের মতো এ বছরও সাতটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। ২০২৪ সালে প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে মঞ্চগুলির নামকরণ করা হয়েছে। যেমন, মূল মঞ্চের নাম রাখা হয়েছে বিশিষ্ট শিল্পপতি রতন টাটা এবং বিশিষ্ট শিল্পী ওস্তাদ জাকির হোসেনের স্মৃতিতে। এরকমভাবে যাত্রামঞ্চের নাম রাখা হয়েছে সুকুমার ঘোষ মঞ্চ। সাতটি মঞ্চে ন’দিন ধরে চলবে স্থানীয় এবং বহিরাগত শিল্পীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে বাউল গানের জন্য স্থায়ী বাউল মঞ্চ। রয়েছে আর্ট গ্যালারি। এ বছর শুরু করা হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন মঞ্চ। প্রয়াত বিখ্যাত নাট্যকার মনোজ মিত্রের নামে করা হয়েছে আইটি অডিটোরিয়াম। এসব মঞ্চে প্রতিদিন আয়োজন করা হচ্ছে নাটক, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, বাউল গান, কবিগান, কীর্তন, ভাটিয়ালি গান প্রভৃতি।
এই মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন গ্রামীণ এবং লুপ্তপ্রায় খেলার প্রতিযোগিতা। মহিলাদের কাবাডি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল স্নাতকোত্তর সরকারি শারীরশিক্ষা কলেজের বিপি এড এবং এমপি এড মহিলা কাবাডি দল, বাণীপুর মহিলা মহাবিদ্যালয় এবং বিথারিন কে পি হাইস্কুল। এছাড়া রাখা হয়েছে জিমন্যাস্টিক, যোগাসন, ব্রতচারী, ভলিবল, আট দলীয় ফুটবল প্রতিযোগিতা, দ্বিদলীয় মহিলা ফুটবল প্রতিযোগিতা, ক্যারাটের অভি প্রদর্শন প্রভৃতি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ‘টাগ অব ওয়ার’ প্রতিযোগিতা, যা দড়ি টানাটানি বলে পরিচিত। টাগ অব ওয়ার অলিম্পিক গেমসের একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত খেলা। আধুনিক অলিম্পিক গেমসে এই দলগত খেলাটি (১৯০০ সালের প্যারিস অলিম্পিক থেকে ২০০০ সালের অ্যান্টুওয়ার্প অলিম্পিক গেমস পর্যন্ত) অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে তা অলিম্পিকস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু টাগ অব ওয়ার-এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানশিপ অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি দর্শক মনোরঞ্জনকারী চিত্তাকর্ষক তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ খেলা। এই খেলাটি বাণীপুর লোক উৎসব কমিটি অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্রাচীন খেলাকে দর্শকদের দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।
এই লোক উৎসবে বেশ কিছু প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। যেমন, পুষ্প প্রদর্শনী, কৃষি প্রদর্শনী, হস্তশিল্প প্রদর্শনী (বাঁশ, কাঠ, বেত, পাট শোলার তৈরি জিনিসপত্রের)। এসব জিনিসের পাশাপাশি বাংলা থেকে হারিয়ে যেতে বসা নকশিকাঁথা এবং পটচিত্রের পসরাও বসেছে। রয়েছে বাংলার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর বিভিন্ন স্টল। তাছাড়া মেলার চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী রয়েছে প্রচুর জিলিপি, বাদাম এবং ফাস্টফুডের দোকান। প্রতিদিন সাতটি মঞ্চের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এই মেলাকে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য মেলা থেকে অনন্য করে তুলেছে।

একসময় শীত পড়তেই গ্রামগঞ্জে যাত্রাপালার আসর বসত। এখন টিভি সিরিয়ালের কারণে যাত্রাশিল্প আর নেই বললেই চলে। বাণীপুর লোক উৎসব কমিটি মেলায় দর্শকদের বিনামূল্যে যাত্রা দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। ৩ থেকে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন যাত্রাপালার আয়োজন করেছে মেলা কমিটি। এই যাত্রাপালাগুলির মধ্যে রয়েছে ‘মহারাজ হরিশ্চন্দ্র’, ‘কৃষ্ণহারা বৃন্দাবন’, ‘নীড়ভাঙা ভালোবাসা’, ‘বউমা তোমার পায়ে নমস্কার’, ‘অচিন গাঁয়ের বধূ’ প্রভৃতি।

