বাপি মণ্ডল

বয়স ৭৩। গতর ভেঙেছে। বুকে বসেছে পেসমেকার। তবু দু’মুঠো ভাতের জন্য সকাল-সন্ধে আজ তিনি ভ্যান চালান। জানেন তাঁর পরিচয়? শুনলে অবাক হবেন। তিনি বাবু দাস। দেশের অন্যতম প্রাচীন পুরসভা থেকে সিপিএমের প্রতীকে জেতা দু’বারের কাউন্সিলর।
বাবু দাস উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের গৈপুরের বাসিন্দা। তখন মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনে বাংলাদেশ উত্তাল। রাজাকার বাহিনী বেলাগাম অত্যাচার শুরু করেছে। বাবু ওপার বাংলার খুলনা জেলার পাইকগাছায় থাকতেন। আশপাশের বেশ কয়েকটি হিন্দু মহল্লায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল। সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা বাবু বাবা-মায়ের হাত ধরে রাতের অন্ধকারে দেশ ছাড়লেন। কাঁটাতার পেরিয়ে বনেদি গোবরডাঙায় ঠাঁই নিলেন। ১৯৭৭ সালে রাজ্যে পালাবদল হল। হাজার হাজার তরুণের চোখে তখন ইনকিলাবের রঙিন স্বপ্ন ভাসছে। লাল ঝান্ডার আহ্বানে বাবুও শামিল হলেন। প্রয়াত বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরীর ‘লাঙল যার, জমি তার’ কথাটা বাবুর খুব ভালো লেগেছিল। মেহনতি মানুষের অধিকারের লড়াই। বাবুর হাতেও তখন কাস্তে-হাতুড়ি-তারার লাল ঝান্ডা জ্বলজ্বল করছে।
অভাবী পরিবারের ছেলে বাবু। দলের কাছ থেকে কখনও কোনও সুযোগ-সুবিধা নেননি। দিনমজুরি করেছেন। প্যান্ডেল বাঁধার কাজ করেছেন। পাড়ার মোড়ের মাথায় মুদিখানার দোকান করেছেন। ২০০০ সালে গোবরডাঙা পুরসভার নির্বাচন। দল বাবুকেই প্রার্থী করল। বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর বাবু কাউন্সিলর ছিলেন।
বাবু বহু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু সে ভালোবাসায় কি পেট ভরে! ঘরে যে নিত্য অভাব। অতি কষ্টে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। দলের অনেকেই তখন আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। বাবু সে সব কখনও করেননি। করতে চানওনি। তাই পেট চালাতে অবশেষে তিন চাকার ভ্যানের প্যাডেলে তিনি পা রাখলেন। ভ্যান চালিয়েই তাঁকে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করতে হয়। স্ত্রী জ্যোৎস্না দাসও বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। গোবরডাঙা রেল স্টেশনের উত্তরদিকের ভ্যানস্ট্যান্ডে আজও বাবুকে দেখা যায়। বয়স হয়েছে। শরীর ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর যে বিশ্রাম নেওয়ার উপায় নেই। তিনি যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘পদ্মানদীর মাঝি’র সেই কুবের। ‘শরীর থাক আর যাক’, রাত পোহালে তিনি ভ্যান নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন।
আকাশে মেঘ হয়। আঁধার হয়ে আসে চরাচর। ঝড়-বৃষ্টির দুর্যোগে ভ্যানে যাত্রী বোঝাই করে বাবু এগিয়ে চলেন। তাঁকে টপকে পাশ দিয়ে ঝড়ের বেগে নতুন কাউন্সিলরের স্করপিও গাড়ি ছুটে চলে যায়।
