অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

শেষ হয়েও শেষ হল না এশিয়া কাপ ২০২৫ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। শুরুর আগে থেকেই বিভিন্ন প্রতিকূল সমস্যার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে খেলা। গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে ২৬ জনকে। প্রত্যুত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানে ঢুকে ন’টি জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’। তাই এশিয়া কাপ শুরুর আগে থেকেই ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আপত্তি জানানো হয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকার তার পরেও এশিয়া কাপে অংশ নিতে দল পাঠানোর জন্য ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে অনুমতি দিয়েছিল। এ টুর্নামেন্ট ভারতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যেহেতু পাকিস্তান খেলবে, তাই ভারত টুর্নামেন্ট থেকে সরে আসে। তারপর এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল নিরপেক্ষ ভেন্যু সৌদি আরবের আবুধাবিতে করে। কিন্তু ভারতীয় জনগণ ভারতীয় দলের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলায় তীব্র আপত্তি জানায়। এমনকী পহেলগামে শহিদ পরিবারও আপত্তি জানায়। এ পরিস্থিতিতে ভারত এশিয়া কাপে অংশগ্রহণ করে। সেখানেই ছিল বড় চমক। ভারত ক্রিকেটীয় সৌজন্যের বাইরে গিয়ে দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করেছে। টুর্নামেন্টে ফাইনাল-সহ ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে তিনটি ম্যাচ খেলেছে। কিন্তু কোনও ম্যাচেই টস করার পর পাকিস্তানের অধিনায়কের সঙ্গে ভারতীয় ক্রিকেটার করমর্দন করেননি। তিনটি ম্যাচেই ভারত পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করে জয়ী হয়েছে এবং খেলা শেষে উভয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে করমর্দন করার প্রথা রয়েছে, তা সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেটাররা সব দলের সঙ্গে করমর্দন করলেও পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে তা করেননি। এটা ভারতের এক জঙ্গিরাষ্ট্রের প্রতি প্রতিবাদ। প্রতিবাদ পহেলগামে শহিদ ২৬ জনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে।
পহেলগাম হামলার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর অপারেশন সিঁদুর এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের অপারেশন নো করমর্দন পাকিস্তানি ক্রিকেট দলকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, যা ১৪০ কোটি ভারতীয়ের মনের জ্বালা অনেকটা মিটিয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের এশিয়া কাপে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে যাঁরা ছিলেন, পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এভাবে অপদস্ত করায় তাঁদের মনের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। আর ফাইনালে রীতি অনুযায়ী এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পাকিস্তানের নকভি মহসিনের জয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার কথা। কিন্তু ভারতীয় দল তাঁর হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকার করে। ঠায় দাঁড় করিয়ে রাখে পাকিস্তানি চেয়ারম্যানকে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে। ভারতীয় ক্রিকেট দল সঞ্চালক সাইমন ডুলকে জানিয়ে দিয়েছিল, তারা নকভি মহসিনের হাত থেকে ট্রফি নেবে না। কিন্তু নকভিও ট্রফি তুলে দিতে অনড় ছিলেন। তাই নকভিকে দাঁড় করিয়ে রাখে। সেটাও আর একটি মধুর প্রতিশোধ। কিন্তু নকভিও অন্য কাউকে দিয়ে ট্রফি তুলে দিতে অস্বীকার করে। তিনি ট্রফি নিয়ে চলে যান। এদিকে রানার্সআপ পাকিস্তানকে প্রাইজ মানি ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার চেক তুলে দিলে তাদের অধিনায়ক সলমন আলি আঘা সে চেক ছুড়ে ফেলে দেন। ফাইনাল খেলার শুরুতে টস করার সময় দু’জন সঞ্চালককে একসঙ্গে মাঠে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। রবি শাস্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত হন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের দাবিতে ওয়াকার ইউনুস। এ ঘটনাও ব্যতিক্রমী এবং ক্রিকেট মাঠে প্রথম দেখা যায়। এ টুর্নামেন্ট যেন অবিকল অপারেশন সিঁদুরের প্রতিচ্ছবি। পার্থক্য শুধু একটি খেলার মাঠে ভারতীয় ক্রিকেটারদের এশিয়া কাপ অপারেশন, আর অন্যটি ছিল ভারতীয় জওয়ানদের অপারেশন সিঁদুর। দু’টিতেই নিরঙ্কুশ জয় ভারতের। ভারত ১১ বার এশিয়া কাপ জিতেছে। তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য হল, একই টুর্নামেন্টে পাকিস্তানকে তিনবারই গুঁড়িয়ে দেওয়া। ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এশিয়া কাপ জয়কে পহেলগামে নিহত পরিবারের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন। এ টুর্নামেন্টে প্রাপ্ত অর্থ ভারতীয় সেনাবাহিনীকে দান করেছেন। তাই খেলার মাঠও কখনও কখনও যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরিণত হয়।
