সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার সহপাঠী পদার্থবিজ্ঞানী অশোক সেন দ্বিতীয় সুপার স্ট্রিং বিপ্লব এনে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানকে নতুন রূপ দিয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর পরে এত বড় তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ভারত পায়নি। কিন্তু সে সাধারণ জীবনযাপন বজায় রেখেছে। সাইকেল চালিয়ে কাজে গিয়েছে এবং ওর ৩ মিলিয়ন ডলার (৩০ কোটি টাকা) পুরস্কারের বেশিরভাগ অংশ দান করেছে। দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃত মহত্ত্ব কাকে বলে।
১৯৫৬ সালে কলকাতায় অশোকের জন্ম। তার জটিল গণিতের ওপর সহজাত আকর্ষণ ছিল। শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হয়। ওই সময় সে আমার সহপাঠী ছিল। যে কোনও জটিল প্রশ্ন করলে সহজ করে বুঝিয়ে দিত। কোনও অহংকার ছিল না। এম এসসি থেকে সমীকরণ ও তাত্ত্বিক ধাঁধার প্রতি তার আকর্ষণ বেড়ে ওঠে। প্রেসিডেন্সি থেকে বেরিয়ে সে আইআইটি কানপুরে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে এবং স্টনি ব্রুকের স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক থেকে ডক্টরেট করে। পরে ফার্মিল্যাব ও স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাকসেলারেটর সেন্টারে পোস্ট ডক্টরেট পদে অধিষ্ঠিত হয়।
বিদেশে প্রচুর লাভজনক অফার থাকা সত্ত্বেও অশোক ভারতে ফিরে আসে। সে আটের দশকের শেষের দিকে মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে যোগ দেয় এবং ১৯৯৫ সালে প্রয়াগরাজের হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে যায়। সেখানে শুধু চক, ব্ল্যাকবোর্ডের প্রাচীন ধারায় কাজ করে গভীর চিন্তাভাবনার ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কার করে। তখনই সে ফেলো অব রয়্যাল সায়েন্স হয়। নয়ের দশকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অশোকের কাজ স্ট্রিং তত্ত্বকে নতুন রূপ দিয়েছে। স্ট্রিং তত্ত্ব ছয়ের দশকে উদ্ভূত হয়েছিল। শক্তিশালী-দুর্বল সংযোগ দ্বৈততা এবং বর্তমানে ‘সেন অনুমান’ (সেন কনজেকচার) নামে পরিচিত ধারণার ওপর তার কাজ স্ট্রিং তত্ত্বের বিভিন্ন সংস্করণ কীভাবে একসঙ্গে ফিট হতে পারে, সে সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে। কেউ কেউ একে ‘দ্বিতীয় সুপারস্ট্রিং বিপ্লব’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
২০১২ সালে অশোককে তার দূরদর্শী কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথম মৌলিক পদার্থবিদ্যা পুরস্কার (ফিল্ডস মেডাল) দেওয়া হয়েছিল, যার আর্থিক মূল্য নোবেল পুরস্কারের প্রায় তিনগুণ। অনেকেই ভেবেছিলেন যে, তার জীবন বদলে যাবে। কিন্তু সে উলটে পুরস্কারের উল্লেখযোগ্য অংশ ছাত্রদের এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সহায়তার জন্য দান করেছিল। স্ট্রিং তত্ত্ব পদার্থ বিজ্ঞানের এমন একটি কাঠামো, যেখানে একটি বিন্দুর মতো কণার পরিবর্তে একটি একমাত্রিক দড়ির মতো জিনিসের কথা ভাবা হয়, যা বিভিন্ন কম্পাঙ্কে আন্দোলিত হয়। তা বিভিন্ন কণা সৃষ্টি করে, যা আমরা প্রকৃতিতে দেখতে পাই। এই তত্ত্বে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্বকে একত্রিত করার প্রয়াস রয়েছে। তবে অনেক কাজ এখনও বাকি রয়েছে।
নোবেল পুরস্কার না পেলেও অশোককে এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানী হিসাবে গণ্য করা হয়। সে ২০০১ সালে পদ্মশ্রী ও ২০১৩ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। এছাড়াও অশোক থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ১৯৯৭ সালে। আর ২০০৬ সালে পেয়েছে পায়াস গোল্ড মেডাল। ২০০৮ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। অশোক এখন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক।
