প্রদীপ মারিক
অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বই তো বঙ্গবাসীর গর্বের। বিচারপতি থাকাকালীন তিনি যেমন ঐতিহাসিক রায় দিয়ে সমগ্র বঙ্গবাসীর মন জয় করে নিয়েছিলেন, তেমনই সাংসদ থাকাকালীন যুক্তিযুক্ত বক্তৃতা দিয়ে সংসদ ভবনের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। বিচারপতি থাকাকালীন তিনি যেমন বঙ্গবাসীর কাছে আপন ছিলেন, তেমনই সাংসদ হয়েও তাঁদের কাছে খুবই প্রিয় হয়ে রয়েছেন। তাই বঙ্গবাসী অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে।
গ্যাস্ট্রো ইনটেস্টাইনাল সেপসিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত তমলুকের বিজেপি সাংসদ তথা কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। ১৪ জুন তিনি বাড়িতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। হঠাৎ তাঁর পেটে ভীষণ ব্যথা শুরু হয়। বাড়িতে বেশ কয়েকবার বমিও করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিউ আলিপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা।
অভিজিৎবাবুর অসুস্থতার খবর পেয়েই হাসপাতালে যান রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁকে দেখতে গিয়েছেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিনই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সচিবালয় থেকে অভিজিৎবাবুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। জানানো হয়েছিল, প্রয়োজন হলে পিএমও পাশে থাকবে।
বিচারপতি হিসাবে অভিজিৎবাবু কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি বিচারপতির পদ থেকে অবসর নিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন এবং তমলুক কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে সাংসদ হন।
প্রতিবাদের মুখ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি যত দিন বিচারপতি ছিলেন, একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে কেঁচো খুঁড়ে কেউটে ধরার মতো দুর্নীতির একেবারে শিকড় ধরার চেষ্টা করেছেন। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজ্যে যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে একটার পর একটা ঐতিহাসিক রায় দিয়ে তিনি বিচারব্যবস্থায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বঙ্গবাসী তো বটেই, সমগ্ৰ দেশবাসীর কাছ থেকে তাঁর স্যালুটই প্রাপ্য। আজ এরকম ব্যক্তিকেই তো দরকার, যিনি দেশের হয়ে কাজ করতে পারবেন।
বিচারপতি হিসাবে পদত্যাগ করেই অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, আদালতে যে কাজ তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন, তা আরও বৃহত্তর ক্ষেত্রে মানুষের জন্য করতে চান। তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন। একেবারে ঠিক কাজ। তিনি মোদির মতো একজন সৎ সাহসীর সেনাপতি হতে পেরেছেন। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি-সহ একাধিক মামলায় রায় দিয়ে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ঝড় তুলে দিয়েছেন। নিয়োগ মামলাগুলিতে তাঁর রায় চাকরি প্রার্থীদের কাছে রাতারাতি তাঁকে করে তুলেছে ‘ভগবান’। মানুষের কাছে তিনি প্রিয় বিচারক হয়ে উঠেছিলেন। সংবাদমাধ্যম থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, সব জায়গাতেই তাঁকে নিয়ে চর্চা চলছিল।
বাংলায় শিক্ষক দুর্নীতি নিয়ে বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ই কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর একাধিক পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠেছে বা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু কোনওভাবেই তিনি দমেননি। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েও বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। তবে দেখা যাচ্ছে, তিনি থেমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার এবং সৎ সাহসী ব্যারিস্টারদের প্রশংসা করেছেন। বিচারপতি থাকাকালীন এজলাসেই তিনি বর্ষীয়ান আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভাট্টাচার্যকে গুরু হিসাবে মানতেন। তিনি এতটাই দূরসৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন যে, বুঝেছিলেন, একমাত্র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যই নিয়োগ দুর্নীতির কথা প্রকাশ্যে আনতে পারবেন। কারণ আবেদন না উঠলে তো বিচার করা সম্ভব নয়। আর বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যই সেই দুঁদে আইনজীবী, যিনি অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবেন না। আবার কুণাল ঘোষের উপন্যাস পড়েও তিনি অবলীলায় বলতে পেরেছেন, কুণালবাবু বেশ ভালো লিখেছেন। তাঁর লেখার হাত খুব ভালো।
রাজনীতিতে প্রবেশ করেই একবারে বাঘের মতো গর্জন। নরেন্দ্র মোদি যেমন বলেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’, তেমনই নির্ভীক অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি যোগ্য চাকরি প্রার্থীদের কান্নাকে মর্যাদা দিয়েছেন। বঙ্গবাসী অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে। শুধু এ বঙ্গ নয়, ভারতের জন্য তাঁর অনেক কাজ করা বাকি রয়েছে।
