
শম্পা দেব
কলকাতার এই এলাকাটায় লোকসংখ্যা খুবই অল্প। সদর রাস্তা পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু গলির ভিতরে যতই যাওয়া যায়, ততই মানুষ কমতে থাকে। ওয়ান সাইড রাস্তা, তাই যে গাড়িগুলি প্রবেশ করে, সবই এই গলির মানুষদেরই। ডানদিকের পরপর কয়েকটি বাড়ি ভট্টাচার্য, সান্যাল, দত্ত আর চক্রবর্তীদের। উলটোদিকের কয়েকটি বাড়ি মণ্ডল, রায়, গাঙ্গুলি আর ঘোষদের। প্রায় সব কটি বাড়ির ছেলেমেয়েরাই বিদেশে থাকে। কারও কারও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বুড়ো-বুড়িরা বিকেল হলেই নিজেদের মতো চেয়ার রাস্তায় নিয়ে এসে গল্প করতে বসে।
এর মধ্যে খবর পাওয়া গেল, দত্ত বাড়ির ছেলে হঠাৎ করে আমেরিকা থেকে এসেছে বিদেশে মা-বাবাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সবাই খুব খুশি এই ভেবে যে, যাক, আমাদেরগুলোর মতো বিদেশে গিয়ে ভুলে যায়নি বাবা-মাকে।
কিন্তু কাজের মেয়ের থেকে রায় গিন্নি জানতে পারলেন, বাচ্চা হবে গো, তাই ওঁদের নিতে এসেছে। ওখানে তো কাজের মেয়ে পাওয়া যায় না।
কিন্তু দত্তরা যাওয়ার আগে কয়েকজন স্টুডেন্টকে ঘরভাড়া দিয়ে চলে গেলেন। পাড়ার সবাই অসন্তুষ্ট। এসব ছেলেেক কেউ ভাড়া দেয়! মদ খেয়ে হইহুল্লোড় করবে। পাড়ার সেই শান্তি আর থাকল না।
কিন্তু পরপর দুটো ঘটনায় সবার ধারণা বদলে গেল। মাঝরাতে রায় গিন্নি ছেলেকে ফোন করে বললেন, তোর বাবার খুব বুকব্যথা হচ্ছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তুই ডাক্তারকে কল কর।
ছেলে বিকাশের যুক্তি, মা, এত দূর থেকে আমি কী করব? বাবাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। আমি অফিসে আছি। জানোই তো বিদেশের ডিসিপ্লিন। তুমি ঘোষ কাকু, মণ্ডল কাকুদের ফোন করে জানাও।
রায় গিন্নি তাই করলেন। কিন্তু কেউ ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোচ্ছেন, কারও শরীর খারাপ, বিছানা থেকে উঠতেই পারছেন না। অবশেষে স্টুডেন্টগুলিই তাঁকে নার্সিংহোমে ভর্তি করে দিল। শুধু তাই নয়, সারারাত তারা নার্সিংহোমে ছিল। অবশেষে সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর রায়বাবুকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে গেল।
কিন্তু আরও বিপদ অপেক্ষা করছিল। একদিন ঝড়বৃষ্টির রাতে শহর কলকাতা যখন ঘুমের অতলে তলিয়ে ছিল, তখন চক্রবর্তী বাড়িতে ডাকাত ঢোকে। ঘরের মধ্যে একটি আওয়াজ হতেই চক্রবর্তীবাবু তাকিয়ে দেখেন, সামনে দু’জন লোক মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে বন্দুক নিয়ে ঘরের চাবি চাইছে। ভয়ে তাঁরা চাবি বের করে দেন।
এদিকে ওই যুবকদল সেদিন রাতে পার্টি, নাচ-গানে ব্যস্ত ছিল। বারান্দায় এসে একজনের চোখে পড়ে, চক্রবর্তী বাড়িতে আলো জ্বলছে। সন্দেহ হয়, কিছু ঘটেছে। তারা গিয়ে দেখে, বাইরে থেকে গেট খোলা। দরজায় ধাক্কা মারতেই খুলে যায়। একমুহূর্তে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। দু’পক্ষের ধস্তাধস্তির মধ্যে একজন দুষ্কৃতীর গুলি একজন ছাত্রের হাতে লাগে। তবু কোনওরকমে তারা ডাকাতদের কবজা করে। পুলিশ দুষ্কৃতীদের ধরে নিয়ে যায়।
তারপর একদিন এই পাড়ায় মহাসমারোহে উৎসব হচ্ছে। পাড়ার প্রবীণরা সকলে মিলে এই তরুণদের জন্য খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। গানবাজনা চলছে। সান্যালবাবু বললেন, নাচো যুবকরা। ফূর্তি করো। আনন্দ করো। তোমরা না থাকলে আমাদের কী হত, বলো তো? কে বলে, বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সমাজকে কলুষিত করছে! তোমরা নতুন প্রজন্মের ছেলেরা আমাদের রক্ষাকবচ। এভাবে সারাজীবন আমাদের পাশে থেকো।


বেশ ভালো!