রবিশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়

বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিবৃত্তে বলিষ্ঠ পদচারণা থাকলেও ইতিহাসের পাতায় সেভাবে আলোচিত নন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার প্রথম দাবি তিনিই রাখেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট অত্যন্ত বলিষ্ঠ যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, যে রাষ্ট্রে ৬ কোটি ৯০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ অর্থাৎ ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, ৭.২ শতাংশ উর্দু আর বাকিরা অন্য ভাষাভাষী, স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত বাংলা। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে সময় প্রবল আধিপত্যকামী মহম্মদ আলি জিন্নার হুঙ্কারে ধীরেন্দ্রনাথের সেই প্রবল প্রত্যাশা ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। যদিও ধীরেন্দ্রনাথের এই দাবিতে অত্যন্ত সহমত পোষণ করে তাঁর এই আন্দোলনে সহযোদ্ধা হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ধীরেন্দ্রনাথ গণপরিষদের বক্তৃতায় বলেন, ‘We are to consider that in our state it is found that the majority of the people of the state speak the bengali language, then Bengali should have an honoured place even in the central Government.’ পাকিস্তানি রাজনীতির কাছে যথারীতি নাকচ হয়ে যায় ধীরেন্দ্রনাথের এই প্রস্তাব। ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথের ওপর নেমে আসে নির্মম রাষ্ট্রীয় অত্যাচার। তা নিজের চোখে দেখেছেন রমণী শীল। জেলে থাকার সময় তিনি ধীরেন্দ্রনাথের ক্ষৌরকর্ম সম্পাদন করতেন। স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ভাষা আন্দোলনের রূপকার ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তর ওপর নির্মম অত্যাচার চালায় পাকিস্তান বাহিনী। তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করার জন্য নিষ্ঠুরভাবে দৈহিক নির্যাতন চালায় পাকিরা। সর্বাঙ্গে জখম নিয়ে তাঁকে হামাগুড়ি দিয়ে টয়লেট যেতে দেখেছি। শক্তিশালী আঘাতের কারণে তাঁর একটি চোখ প্রায় বেরিয়ে গিয়েছিল। ফুলে গিয়েছিল মুখ। মেরে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বাঁ পা। এভাবে একপর্যায়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল মনীষীতুল্য ওই ব্যক্তিকে। একটি নিচু জায়গায় কিংবা গর্তের পারে দাঁড় করিয়ে দত্তবাবুকে গুলি করা হয়েছে।’
সুতরাং বাংলা ভাষা আন্দোলনের সর্বপ্রথম সৈনিক হিসাবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অন্যতম পথ প্রদর্শক। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল প্রায় ১১টার পর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে হাজার হাজার ছাত্র জমায়েত হতে থাকেন, যাঁদের মূল স্লোগান ছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই/ রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’, ‘উর্দুর সঙ্গে বিরোধ নাই/ সব কিছুতে বাংলা চাই’। কিছুক্ষণ পরেই জমায়েত ১৪৪ ধারা অতিক্রম করতে গেলে রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট পুলিশবাহিনী অত্যন্ত নির্মমভাবে লাঠি চালাতে শুরু করে। ছাত্ররাও পালটা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে বেধে যায় অযাচিত খণ্ডযুদ্ধ। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। এভাবে এক অসম যুদ্ধের মধ্যে বেলা তিনটে নাগাদ পুলিশ নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালালে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রফিক উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত প্রমুখ গণ-আন্দোলনের ছাত্র। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় আব্দুস সালামের। প্রতিবাদে পরের দিন শুরু হয় গণবিক্ষোভ কর্মসূচি। সেখানেও অত্যন্ত নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে পুলিশ ও মিলিটারি গুলি চালালে মৃত্যু হয় হাইকোর্টের এক কর্মচারী, একজন রিকশাওয়ালা ও এক কিশোরের।
তৎকালীন পাকিস্তান সরকার শুধু বাংলা ভাষাকে অস্বীকার করেছিল, তা নয়, বাংলা ও বাঙালির যা কিছু, এমনকী বাঙালি রমণীর পোশাককেও তারা অস্বীকার করেছিল। অবশেষে ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটির তাৎপর্য অনুধাবন করে এই ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।
মাতৃভাষা হল মাতৃসম। ভাষা আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই যে, এই গণ-অভ্যুত্থান তিনটি ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। প্রথমত, এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ভাষার সঙ্গে ধর্মের কোনও বিরোধিতা নেই। দ্বিতীয়ত, এই আন্দোলন নিশ্চিতভাবেই বহুত্ববাদকে অস্বীকার করার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। তৃতীয়ত, সব ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য, বিশেষত মাতৃভাষা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আগামী প্রজন্মের কাছে আদরণীয় হয়ে থাক এই ভাষা। পৃথিবীর প্রতিটি অশান্ত আবহাওয়ায় ঝরে পড়ুক বাংলা ভাষার সঞ্জীবনীর সুধা। অপু-দুর্গার রেলগাড়ি দর্শন, অবন ঠাকুরের ক্ষীরের পুতুল কিংবা দক্ষিণারঞ্জনের ঠাকুরমার ঝুলির আবেগ গায়ে মেখে আমরা যেন আর বিস্মৃত হয়ে না যাই রফিক উদ্দিন, জব্বার, বরকত, সালামের মতো ভাষা আন্দোলনের এসব শহিদকে। কখনও যেন ভুলে না যাই ভাষা আন্দোলনের জনক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে।
