তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রাক্তন সংস্কৃতি অধিকর্তা এবং সাহিত্য অকাদেমি, বঙ্কিম, বিএফজেএ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক

স্কুলের পাঠক্রমে কি থিয়েটারকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত? এরকম একটি বিতর্ক এখন নিয়মিত আলোচিত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সব মহলে৷ স্কুলের বর্তমান পাঠক্রমে মিউজিক অন্তর্ভূক্ত হলেও নাটকের প্রয়োজন স্বীকৃত হয়নি৷ সরকারি বদান্যতায় কোনও কোনও নাট্যদল বিভিন্ন স্কুলে কর্মশালার ব্যবস্থা করলেও তা নিতান্তই সাময়িক ও যথেষ্ট নয়৷ অথচ আমরা কে না জানি, বড়দের মতো ছোটরাও নাটকে অংশগ্রহণে উৎসাহী এবং কোনও ফুরসতে তারা নিজেদের বাড়ির খালি ঘরে বা ক্লাবঘরে নাটকের মহড়া দিয়ে থাকে৷ কখনও বাড়ি বা পাড়ার কোনও মুক্ত খালি জায়গায় ছোট ছোট নাটক মঞ্চস্থ করে থাকে৷ তার দর্শকেরও অভাব ঘটে না৷ স্কুলের বার্ষিক উৎসবে নাটক মঞ্চস্থ করার দাবি চিরন্তন৷
নাটক কেন স্কুলের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, তা নিয়ে ক্রমশই জমে উঠছে বিতর্ক৷ এ কথা অস্বীকার করা যায় না, স্কুলশিক্ষার বর্তমান পাঠক্রম অনেকটাই যান্ত্রিক৷ সে যান্ত্রিকতাই অবশ্য পছন্দ অধিকাংশ অভিভাবকের৷ সাধারণভাবে অভিভাবকরা চান তাঁদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হোক। একটি নিশ্চিন্ত পেশায় নিয়োজিত হয়ে সুখে জীবনযাপন করুক৷ তাঁরা চান, ছোটরা শুধুই পড়বে, পড়বে আর পড়বে, আর ক্লাসে শুধুই ফার্স্ট হবে৷ স্কুলজীবনে কোনও ছাত্রছাত্রীরই এর বাইরে আর কোনও পৃথিবী থাকতে নেই৷ ছোটদের মনে এরকম একটি ক্লান্তিকর ভাবনা ঢুকিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে চান অভিভাবকরা৷
সন্তানের ভবিষ্যৎ ভাবনায় মশগুল অভিভাবক বিস্মৃত হন সন্তানের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রটি৷ অভিভাবকরা হয়তো এ তথ্যটি ভুলে থাকতে চান, তাঁদেরও একটি ছোটবেলা ছিল। সে সময় তাঁদের একটি নিজস্ব পৃথিবী ছিল। সেটা ছিল কল্পনার নানা রঙে রঙিন। সেখানে ইচ্ছে করলেই পিঠে দুটো ডানা লাগিয়ে উড়ে যেতেন নীল আকাশের কোথাও অথবা দিগন্ত পেরিয়ে না–দেখা দেশ থেকে দেশান্তরে৷ অভিভাবকরা এ কথা ভুলে যান বলেই তাঁদের সন্তানসন্ততির ছেলেবেলার কথা মনে রাখেন না বা মনে রাখতে চান না৷ ছোটদের ছেলেবেলারও যে একটা আলাদা মাধুর্য আছে, তা বিস্মৃত হয়ে তাদের গড়ে তুলতে চান পড়ুয়া রোবট হিসাবে৷ তার মধ্যে এসে পড়েছে বিশ্বায়নের হাওয়া৷ বিশ্বায়নের পৃথিবীতে কোনও আত্মীয়স্বজন নেই, বন্ধুবান্ধব নেই, আছে শুধু আত্মকেন্দ্রিকতা৷ সেই আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে অবলম্বন শুধু প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতা৷ ক্লাসের মধ্যে পাশেই বসে থাকে যে বন্ধুটি, তাকে যেনতেন প্রকারেণ হারিয়ে দিয়ে প্রথম হওয়াটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য৷ সে সাহায্য চাইলেও তার দিকে হাত বাড়ানো নিষেধ৷ সে পৃথিবীতে কল্পনার স্থান নেই, আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া নেই, শিমুলগাছের নীচে পড়ে থাকা পাখির ডিম কুড়িয়ে পাওয়া নেই, পথের পাশে কুঁইকুঁই করে কাঁদতে থাকা বিড়ালছানা কুড়িয়ে পাওয়া নেই৷ আছে শুধু স্বার্থসিদ্ধি৷ ফলে ছোটরা ক্রমশ হয়ে উঠছে স্বার্থান্ধ। তাদের জীবনে স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া অন্য কোনও লক্ষ্য নেই৷ এমন আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবীতে বড় হতে থাকে যে স্কুলপড়ুয়া, সে তার ব্যাগের মধ্যে ভরে নিয়ে যায় রিভলভার। বন্ধুর সঙ্গে সামান্য অবনিবনা হলে তাকে রক্তাক্ত করে দিতে দ্বিধাবোধ করে না৷ সামান্য আইপডের লোভে কুণ্ঠাবোধ করে না বন্ধুর বোনকে মাথা থেঁতলে হত্যা করতে৷
স্বীকার না করলেও এ কথা বাস্তব যে, অদূর ভবিষ্যতে ছোটদের সামনে ঘনিয়ে আসছে এরকমই একটি ভয়ংকর ছবি, যা সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যাবে গোটা অভিভাবককুল৷ বর্তমান প্রজন্মের ছোটরা ঠিক কোন লক্ষ্যে পৌঁছতে চায়, তা নিয়ে অসীম ভোগবাদের মধ্যে বড় হতে থাকা প্রজন্ম এই মুহূর্তে দিশাহীন৷ এ কারণেই বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের সামনে এক অন্য পৃথিবীর দরজা খুলে দেওয়া প্রয়োজন৷
নানা মহল থেকে দাবি উঠেছে, স্কুলের পাঠক্রমে নাটকের অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন৷ যান্ত্রিক শিক্ষার হাত থেকে তাকে মুক্ত করতে চাই পড়াশোনার ফুরসতে তার অন্য এক ভূমিকা, পড়াশোনার বাইরে নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে নিয়োজিত করতে পারার সুযোগ৷
অনেকেরই নিশ্চয় স্মরণে আছে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তিনিকেতনে গুরুত্ব দিয়েছিলেন নাটক প্রযোজনাকে৷ তিনি নিজেই নাটক লিখেছেন। সে নাটকে নিজেই অভিনয় করেছেন। অভিনয় করিয়েছেন শান্তিনিতেকনে পাঠরত ছাত্রছাত্রীদের৷ খোলা আকাশের নীচে সে অভিনয়ের মাদকতা নিশ্চয়ই স্মরণযোগ্য৷
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন খোলামেলা পরিবেশে ছোটদের শিক্ষা দিতে। তিনি মনে করতেন, সেটাই হবে তাদের কাছে শিক্ষার আদর্শ পরিবেশ, মনের মতো শিক্ষা৷ নাটকের মধ্যেও তারা পাবে এক মুক্ত পৃথিবী, যার নিত্য অনুশীলনে তাদের মানসিক গঠনে আসবে সংঘবদ্ধতা ও ঔদার্য৷ থিয়েটার অনুশীলনে মন ও বুদ্ধির খেলা চলে একইসঙ্গে৷ সম্পূর্ণ অন্য ভূমিকায় নিয়োজিত করতে পেরে তারা নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারবে নিজেকে৷ তাদের নিজের ভিতরেও যে নানা সত্তা লুকিয়ে থাকে, তাকে খুঁজে বের করতে পারলে ক্রমশ বাড়তে থাকবে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস৷ থিয়েটার প্রক্রিয়া সাহায্য করে ব্যক্তিত্ব বিকাশে৷ মঞ্চে উঠে বিশেষ একটি ভূমিকায় অভিনয় করার সময় ভিতরে বেড়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস৷
থিয়েটারের অন্য আর এক ভূমিকা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো৷ এখনকার ছাত্রছাত্রীদের খেলার সময় নেই বললেই চলে৷ ক্লাসে তো নয়ই, ক্লাসের বাইরেও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যোগাযোগের কোনও সুযোগ নেই আজকের ব্যস্ততার দিনে৷ থিয়েটার প্রযোজনায় থাকে খোলামেলা পরিবেশ। রিহার্সালের সময় একইসঙ্গে থাকে সিরিয়াসনেস আর হইহুল্লোড়। তার মধ্যে তৈরি হয় একধরনের খেলা–খেলা আনন্দ৷ স্কুলের ক্লাসে পাশাপাশি বসে পরস্পরের মধ্যে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতার খেলা চলে। প্রত্যেকে তখন প্রত্যেকের প্রতিদ্বন্দ্বী। কেউ কাউকে একইঞ্চিও জায়গা ছাড়ে না৷ অথচ নাটক করতে গিয়ে সে প্রতিযোগীরাই হয়ে ওঠে পরস্পরের বন্ধু ও সহকর্মী৷ থিয়েটারে অভিনয়ের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা থাকে, তা স্বাস্থ্যকর। তার মধ্যে কোনও বৈরিতা নেই। একক স্বার্থ জড়িত থাকে না৷ ফলে অভিনয়ের বাইরে পরস্পরের মধ্যে যে বন্ধুত্ব হয়, তা নির্ভেজাল৷ থিয়েটারে সরাসরি মানুষে মানুষে প্রতিক্রিয়া ঘটে। তা থেকে বেড়ে ওঠে সমষ্টির অনুভূতি৷
আজকের পৃথিবী থিয়েটারকে দেখছে কমিউনিকেশন মিডিয়াম হিসাবে৷ একাধিক কুশীলব সারাক্ষণ মুখোমুখী হয়ে রিহার্সাল থেকে মঞ্চায়ন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কাল আরও গভীরভাবে চিনতে শেখেন নিজেদের৷ যেহেতু থিয়েটার একটি সমবেত প্রয়াস, সেখানে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হয়, ফলে তাতে পরস্পরের মধ্যে ভাববিনিময়, চেনাজানা, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়৷ ভিন্ন একটি চরিত্রে অভিনয় করার সময় বাস্তব জীবনে সে ধরনের মানুষকে খুব দ্রুত চিনতে শেখে ছোটরা। তাতে অন্য মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে, তার সুখ–দুঃখের শরিক হতে পারে৷
থিয়েটার ছোটদের মনে এনে দিতে পারে রূঢ় বাস্তবকে কল্পনার চিত্ররূপ৷ যে বাস্তবকে তারা দেখে বা অনুভব করে, যখন নাটকের মধ্য দিয়ে সেই বাস্তবকে ফুটিয়ে তোলে মঞ্চের রঙিন পটভূমিতে, তখন তাদের মনে সৃষ্টি হয় এক আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া৷ তাদের কল্পনার জগতে বাস্তবের পদক্ষেপ ঘটে ও কিশোরমনে তৈরি হয় এক অন্য উচ্চতা৷
অনেক ক্ষেত্রে বাবা–মা দু’জনই ব্যস্ত থাকেন তাঁদের চাকরি নিয়ে। সে ক্ষেত্রে এখনকার ছোটরা বেশিরভাগ সময় বাধ্য হয় একা থাকতে৷ বাধ্য হয় একা–একা খেলতে৷ সেই একাকিত্ব তাদের মনে তৈরি করে একঘেয়েমি৷ তারা জেদি হয়ে পড়ে। হয়ে যায় দুর্বিনীত। বাবা–মা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন সন্তানকে সামলাতে৷ স্কুল পর্যায়ের নাটকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা আবিষ্কার করতে পারবে সুস্থ মনে বেঁচে থাকার এক অন্য উপায়৷ একা–একা অভিনয় করাও একধরনের খেলা৷ স্কুলে নাটক করার সুযোগ ও অভিজ্ঞতা থাকলে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ থাকে৷ বাড়িতে অবসর সময় কখনও একাই রাজা, কখনও একাই মন্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করে জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে পারে ছোটরা৷ সবাই মিলে একসঙ্গে অভিনয় করতে শিখলে একসময় তাদের মধ্যে আসবে নিজেকে বোঝার ক্ষমতা৷ একইসঙ্গে তাদের মধ্যে বেড়ে উঠবে নিজেকে প্রকাশ করার প্রবণতা৷ অভিনয় একধরনের সৃজনশীলতা৷ ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র নির্মাণের ক্ষমতা তাদের ভিতরে জন্ম দেয় সৃজনশীলতা৷ থিয়েটারের আবহাওয়ায় বড়ো হয়ে উঠলে তাদের ভিতরে থাকবে সৃষ্টির আনন্দ৷ সকলে একসঙ্গে চলার মধ্যে কুশীলবরা বুঝে যায় শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা৷ রিহার্সালের জন্য হাজির হতে হয় ঠিক সময়৷ নিজেদের মধ্যে তৈরি করতে হয় বোঝাপড়া৷ হতে হয় একে অপরের পরিপূরক৷
নাটকে অভিনয়ের মধ্যে প্রত্যেকেই অনুভব করে সেল্ফ ট্রেনিংয়ের৷ মঞ্চে অন্যের সঙ্গে মুখোমুখি অভিনয় করতে গেলে নিজেকে তৈরি করতে হয় আলাদাভাবে, যাতে তার সহ-অভিনেতারা তার খারাপ অভিনয়ের জন্য অসুবিধেয় না পড়ে যায়৷ নাটকে অভিনয় শুরু করলে ছোটরা ক্রমে বুঝে যাবে, তার একটা অন্য সত্তা আছে। সমাজে তার গুরুত্ব অন্যদের চেয়ে বেশি৷ তাকে সমীহ করছে অন্যরা৷
থিয়েটার করতে হলে সংলাপ মুখস্থ করা দরকার৷ স্কুলের পরীক্ষাতেও মুখস্থ করতে হয়, কিন্তু সেখানে থাকে পরীক্ষার চাপ। ফলে স্মৃতির ওপর একটা ভয়ংকর চাপ থাকে৷ কিন্তু অভিনয়ের জন্য যে মুখস্থ করতে হয়, তাতে কোনও পরীক্ষা থাকে না। ফলে স্মৃতিশক্তির ওপর কোনও বাড়তি চাপ থাকে না। তাতে মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ে৷ অনেক সময় অভিনয় করতে যেতে হয় বাইরের কোনও জেলা বা রাজ্যে। তাতে বহু মানুষের সংস্পর্শে এসে বদলে যায় জীবন সম্পর্কে ধ্যানধারণা৷ আসলে স্কুলে থিয়েটারের প্রচলন শুধু ছোটদেরই ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সহায়ক নয়, গোটা সমাজের পক্ষে হবে একটি মঙ্গলকর ঘটনা৷
