Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৩)

যুগের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যা স্বাধীনতার আগে-পরে ছিল, আজ তা নেই।  এ নিয়ে ধারাবাহিক নিবন্ধ।

ছবি: লেখক।

Share Links:

শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

অতীতে পরাধীন ভারতে দেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে উড়োজাহাজ, ডুবোজাহাজ, জলজাহাজ ছিল।  তার সঙ্গে ছিল মেঠোজাহাজ, মরুজাহাজ ইত্যাদি। উটকে মরুজাহাজ বলা হত। পালকিকে বলা হত মেঠোজাহাজ। বর্তমানে পালকির ব্যবহার হয় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোয়। এছাড়াও আজকাল বিয়েবাড়িতে শখে পালকির ব্যবহার নজরে পড়ছে। অতীতে শখে নয়, পালকির ব্যবহার ছিল প্রয়োজনে। পালকি ও নৌকো ছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত পরিবহণ। ইতিহাসের পাতা, উপন্যাসের কাহিনিতে পালকির কথা আছে। রাজারাজড়াদের নিজস্ব হাতি-ঘোড়া যেমন থাকত, তেমন পালকিও থাকত।

গ্রামবাংলায় পালকি ভাড়ায় পাওয়া যেত। যাঁরা পালকি কাঁধে নিতেন, তাঁদের ‘বেহারা’ এবং ‘কাঁহার’ বলা হত। কাঁহাররা যেখানে থাকতেন, সে জায়গাকে তখন কাঁহারপাড়া বলা হত। প্রত্যেক গ্রামের আশপাশে কাঁহারপাড়া থাকত। সেখানে লোক পাঠিয়ে বা নিজে গিয়ে মুখে-মুখে চুক্তি করলেই পালকি সময়মতো ঘরে চলে আসত।  কাঠ, লোহার দণ্ড দিয়ে দু’জন বসার মতো পালকি তৈরি হত। আট থেকে দশজন শক্তপোক্ত সুঠাম শরীরওয়ালা বেহারা পালকি বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিযুক্ত হতেন। পালকি যখন মাঠঘাট দিয়ে আসত, তখন বেহারাদের কলরব ও পালকি গান শোনা যেত। তা শুনে বোঝা যেত, পালকি আসছে।

আজ যেমন দ্রুতগামী বাস, লরি, ছোট গাড়ি রয়েছে, অতীতে তেমন ছিল না। চার, পাঁচ, ছয়ের দশকেও বাষ্পচালিত বাস চলত। পাঁচ-ছয়ের দশকে বাসগুলি খুব ছোট হত। সাধারণ এবং গরিব মানুষ বাসে যাওয়ার চেয়ে হেঁটে যাতায়াত করতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন। ছয়ের দশকের মধ্যভাগ থেকে বাসে ভিড় নজরে আসতে থাকে। রাস্তা সংকীর্ণ ছিল। রাস্তার ধারে বড় বড় বৃক্ষ থাকত। পাঁচের দশকের আগে থেকেই অ্যাম্বাসাডর ও জিপ গাড়ি  খুব জনপ্রিয় হয়। জিপের পিছনে লেখা থাকত ‘লেফ্ট হ্যান্ড ড্রাইভ’ । বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ি রাস্তায় চলত। মোটরবাইক তেমন ছিল না। গ্রামবাংলা ও মফস্‌সল শহরে অবস্থাপন্ন মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী, চিকিৎসক মোটরবাইকে চড়তেন। গ্রামে কখনও কখনও মোটরবাইক, অ্যাম্বাসাডর, জিপ ঢুকলে শিশুরা সেগুলির পিছনে পিছনে দৌড়ত। শহরে একমাত্র স্থানীয় পরিবহণ ছিল সাইকেল রিকশা। মফস্‌সল শহরে দিনরাত সাইকেল-রিকশার দেখা মিলত।

বর্তমান সময়ে পরিবহণের একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ ত্রিচক্রযানটি অবলুপ্তির পথে। স্বাধীনতার আগেই সাইকেল ছিল। স্বাধীনতার পরেও গ্রামবাংলার মানুষ সাইকেল চালিয়ে একজায়গা থেকে অন্যত্র যেতেন। তবে আজকের দিনে সাইকেলের যেমন আধিক্য, তদানীন্তনকালে তা ছিল না। দরিদ্র পরিবারে সাইকেল ছিল না। ছয়ের দশকেও দেখেছি, মধ্যবিত্তের ঘরে সাইকেল এসেছে। প্রাইমারি ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, স্থানীয় ডাক্তারবাবু ও তাঁদের কমপাউন্ডাররা, অফিস-আদালতের কর্মীরা, পুলিশকর্মী, বনকর্মী, আফগারি কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মীরা সাইকেল চালিয়ে ডিউটি করতে বা কার্যালয়ে যেতেন। পোস্ট অফিসের ডাকপিওন সাইকেল চালিয়ে ঘরে-ঘরে চিঠিপত্র-মানি অর্ডার দিতে আসতেন।

স্বাধীনতার আগে ও কয়েক দশক পরেও গ্রামগঞ্জে চুরি-ডাকাতির উপদ্রব ছিল ভীষণ বেশি। গ্রামগঞ্জে বিদ্যুতের আলো সাতের দশক অবধি বেশিরভাগ গাঁয়ে পৌঁছয়নি। টেলিফোন, মোবাইল ফোন, কিচ্ছু ছিল না। রাত বাড়লেই মানুষের ভয় লাগত,  এই বুঝি বাড়িতে ডাকাতি হবে! ভয়ে সোনা-রুপো বা মূল্যবান অন্যান্য ধাতুর অলংকার গ্রামের মানুষ ঘরে রাখতেন না। শহরে গিয়ে পোদ্দার ঘরে জমা দিয়ে আসতেন। গ্রামের মানুষ সন্ধ্যায় রাতের খাবার খেয়ে ফেলতেন। স্বাধীনতার আগে বা পাঁচ-ছয়ের দশকে রান্নাবান্নার কাজে স্টিলের বাসনের ব্যবহার ছিল না। কাঁসা, পেতল, জার্মান, কলাই করা টিনের বাসনপত্র-কলসি ব্যবহার করা হত। জার্মান ধাতুর বাসনপত্র— ঘটি, গ্লাস, কলসি ঠাকুরঘরের পুজোতেও ব্যবহৃত হত।

জার্মান  ধাতু ছিল তামা, দস্তা ও নিকেলের সংমিশ্রণ। লোহার কড়াই, মাটির হাঁড়ি, মাটির খোলা, মাটির কলসি, মাটির জলের কুঁজো সেকালের সংসারের সামগ্রী ছিল। কলাই করা বা এনামেলড থালা-বাটির ব্যবহার তখন ঘরে ঘরে হত। দেখতে সাদা ফটফটে বাসন সংসারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করত। রাতে চৌকিদারি প্রথা ছিল। গভীর রাতে মানুষ যখন ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতেন, তখন চৌকিদার হাতে লন্ঠন ও লাঠি নিয়ে গৃহকর্তার নাম ধরে জাগিয়ে দিয়ে যেতেন। চোর তাড়াতে হাঁক পাড়তেন— ও…হই…।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए