সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ শহরে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। একই পরিবারের ষোল, চৌদ্দ ও বারো বছর বয়সি তিন বোন কোরীয় জ্বরে আক্রান্ত ছিল। তারা কোরিয়ার সংগীত, বিশেষত পপ সংগীতের ভক্ত বা ফ্যান ছিল। এর মধ্যে বিটিএস অবশ্যই অন্যতম। বিটিএস প্রসঙ্গে পরে আসছি।
ওই তিন বোন শুধু কোরীয় পপ সংগীত নয়, কোরিয়ার সব কিছুর ফ্যান— কোরীয় সাহিত্য, চলচ্চিত্র, কার্টুন প্রভৃতি। এর ফলে তাদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হত। বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। তারা তাদের চার বছরের বোনকেও দলে টানতে গিয়েছিল। তখন অভিভাবকরা বাধা দিতে বাধ্য হন। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। তখন অভিভাবকরা তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। তারপর তিন বোন চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তারা রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। তারা থাকত একটি কমপ্লেক্সের দশতলার ফ্ল্যাটে। জানালায় গ্রিল ছিল না, খোলা। বড় বোন জানালার ধাপিতে বাইরের দিকে পিঠ করে বসে এবং পিছনদিকে উলটে যায় ইচ্ছে করে। অন্য দুই বোন তাকে অনুসরণ করে। উলটোদিকে অন্য টাওয়ারের আটতলা থেকে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক দেখতে পেয়ে চিৎকার করতে করতে নীচে নেমে এসে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। অন্যরাও ছিলেন। হাসপাতাল জানায়, তিনজনই মৃত।
এবার আসি বিটিএস প্রসঙ্গে। বিটিএস ক্রেজ বা উন্মাদনা এই মুহূর্তে গোটা ভারত তথা বিশ্বের বিশেষত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ভয়ংকর রকমের বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মুম্বই শহরে এক প্রেক্ষাগৃহে সম্প্রতি বিটিএস গানের দলের (মূলত চার সদস্যবিশিষ্ট) মাত্র এক সদস্যের একটি গানের ভিডিয়ো বড় পরদায় প্রদর্শিত হয়েছে গত ৭ জানুয়ারি। দর্শকদের বেশিরভাগ তরুণী, বয়স পনেরো থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর। তাঁরা চূড়ান্তভাবে উদ্বেলিত। তাঁরা দাঁড়িয়ে উঠে গানের তালে তালে নাচছিলেন, মুখে ধ্বনি দিচ্ছিলেন— উচ্ছ্বসিত প্রশংসাসূচক ধ্বনি।
বাংতান বয়েজ বা বিটিএস দক্ষিণ কোরিয়ার এক অত্যন্ত জনপ্রিয় কে-পপ (কোরীয় পপুলার) গ্রুপ। তারা উদ্যমী পরিবেশনা, অর্থপূর্ণ গানের কথা বা লিপি ও নিবেদিতপ্রাণ ভক্তদের জন্য পরিচিত। ভক্তদের তারা আর্মি বলে। Butter এবং Dynamite-এর মতো হিট গানের মাধ্যমে তারা বিশ্বব্যাপী বহু রেকর্ড ভেঙেছে।
বিটিএস সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গানের অনুষ্ঠান করে বেড়ায়। পনেরো মিনিটের মধ্যে সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষ লাখ লাখ টাকা খরচ করে দেখতে যায়। টিকিটের দাম লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বিটিএসের বিশাল জনপ্রিয়তা বিভিন্ন কারণের ওপর নির্ভর করে:
অনন্য শব্দ: তারা কে-পপ, হিপ-হপ এবং রকের ধারা মিশ্রিত করে। শ্রোতাদের কাছে এর আবেদন অসাধারণ।
অর্থপূর্ণ কথা: তাদের গানগুলি প্রায়শই আত্মক্ষমতায়ন, প্রেম ও ব্যক্তিগত বিকাশের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। তা বিশ্বব্যাপী ভক্তদের অনুপ্রাণিত করে।
প্রকৃত সংযোগ: সদস্যরা তাঁদের একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, সংগ্রাম ও আবেগ ভাগ করে ভক্তদের সঙ্গে এক শক্তিশালী বন্ধন গড়ে তোলেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি: তাঁরা সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়, ভক্তদের সঙ্গে জড়িত, পরদার আড়ালে বাস্তব জীবনের সমস্যা ভাগ করে নেন।
গ্লোবাল আউটরিচ: আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং বিশ্বব্যাপী ইভেন্টগুলিতে সংগীত পরিবেশন তাঁদের পরিধি প্রসারিত করেছে।
ডেডিকেটেড ফ্যানবেস (আর্মি): তাঁদের ভক্তরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। নিবিড় সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার ও প্রসারের ফলে ওই দলের সংগীত প্রচেষ্টাকে তাঁরা সমর্থন করেন।
বিটিএসের সংগীত ও বার্তা আত্মভালোবাসা, গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যক্তিগত বিকাশের মতো বিষয়গুলিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। তাদের গানগুলি প্রায়শই শ্রোতাদের নিজস্ব ব্যক্তিগত সমস্যা ও আবেগের সঙ্গে মিলে যায় এবং তাঁদের জীবনসংগ্রামকে কাটিয়ে উঠতে উৎসাহিত করে। গ্রুপের বার্তা বিশ্বব্যাপী ভক্তদের কাছে অনুরণিত হয়, সম্প্রদায়গত এবং স্বত্বের অনুভূতি তৈরি করে।
কে-পপ সংস্কৃতিতে বিটিএসের প্রভাবের কিছু মূল দিক হল:
প্রচলিত বাধা ভেঙে বিটিএস কে-পপকে বিশ্বব্যাপী মূলধারায় ঢুকিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও স্বীকৃতিকে অনুপ্রাণিত করেছে।
অনুপ্রেরণাদায়ক ভক্ত নিবিড় সংযোগ: ভক্তদের প্রতি তাদের নিষ্ঠা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়াযুক্ত বিষয়বস্তু শিল্পী-ভক্ত সংযোগের জন্য এক নতুন মান স্থাপন করেছে।
সাংস্কৃতিক বিনিময়: বিটিএস তাদের সংগীত এবং বার্তার মাধ্যমে কোরীয় সংস্কৃতি ও ভাষা প্রচার ও আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়াকে উৎসাহিত করে।
