সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

সাহিত্যে চুরি চিরকালই আছে। দেশে দেশে কালে কালে। ইংরেজিতে এর একটি গালভরা নাম আছে, প্লেজিয়ারিজমের ক্রিয়াপদ প্লেজিয়ারাইজ। বাংলাতেও এর একটি গম্ভীর পরিভাষা আছে, কুম্ভীলকবৃত্তি। তবে এর রকমফের আছে। কালিদাস মহাভারতের উপকাহিনি অবলম্বনে রচনা করেছিলেন অভিজ্ঞানশকুন্তলম্। সেটা চুরি নয়, কারণ তা ছিল মহাভারতের একটি উপকাহিনির ধাঁচে নতুন সৃষ্টি।
তুলসীদাস, কাশীরাম দাস বা কৃত্তিবাস ওঝা সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। তাঁরা সবাই নতুন রূপে মহাকাব্য নির্মাণ করেছিলেন। সেক্সপিয়ার সম্পর্কে বহুবার চুরির অভিযোগ ছিল, তিনি নাকি ক্রিস্টোফার মার্লোর থেকে নকল করেছিলেন। তবে এলিজাবেথের যুগে একে অপরের থেকে অভিযোজন করা বা ধার করা স্বাভাবিক ছিল।দু’জন সহযোগিতা করে লিখে থাকতে পারেন। তাঁদের ভাষাভঙ্গি, উপমা, অলংকরণ অনেকাংশেই মেলে। ট্যাম্বারলেইন বা জিউ অব মাল্টা থেকে সেক্সপিয়ার ধার নিতে পারেন। কিন্তু তাঁর মৌলিক সাহিত্য গুণ এত বেশি ছিল যে, তাঁকে অসাধারণ মৌলিক সাহিত্যিকের মর্যাদা দিতেই হয়। মার্লোর ট্যাম্বারলেইন ও জিউ অব মাল্টার সঙ্গে সেক্সপিয়ারের লেখার কিছু মিল আছে। ইটালির গল্প দ্য ট্র্যাজিক স্টোরি অব রোমিয়াস অ্যান্ড জুলিও থেকে সেক্সপিয়ার রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট লিখেছেন, স্যাক্সো গ্র্যামাটিকা থেকে হ্যামলেট, জিওফ্রির হিস্টোরিয়া রেগাম ব্রিটানি থেকে কিং লিয়ার, রাফায়েল হলিনসেডের দ্য ক্রনিকলস থেকে ম্যাকবেথ ও বারমুডায় জাহাজডুবির ঘটনা নিয়ে উইলিয়াম স্ট্রেচির বিবরণের ওপর ভিত্তি করে টেম্পেস্ট লিখেছিলেন। এগুলি প্লেজিয়ারিজম নয়। নবনির্মাণ।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে কীভাবে আধুনিক কবিরা প্লেজিয়ারাইজ করেছেন, দেখুন। একবার এক রবীন্দ্রবিদ্বেষী বলেন, ‘দেখুন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কেমন বলিষ্ঠ ভাষা! রবীন্দ্রনাথের এমন আছে?’ সেটা কী, দেখা যাক। শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘মেঘগুলি গাভীর মতো চরে’, আর রবীন্দ্রনাথ যেতে নাহি দিব কবিতায় লিখেছেন, ‘খণ্ড শুভ্র মেঘগুলি নীলাম্বর শুয়ে/ মাতৃস্তন্যপানরত গোবৎসের ন্যায়।’ শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন অন্তত ৭০ বছর পরে। সুতরাং তাঁর পক্ষেই সম্ভব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে প্লেজিয়ারাইজ করা।
একইরকমভাবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘তোমাকে আরো বেশি দেখি, যখন তোমাকে দেখি না।’ এই আইডিয়া স্পষ্টভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে নেওয়া। তিনি লিখেছেন, ‘নয়ন সমুখে তুমি নাই,/ নয়নের মাঝখানে নিয়াছ যে ঠাঁই’, অথবা ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে,/ অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে’, অথবা ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে,/ রয়েছ নয়নে নয়নে।’
জয় গোস্বামীর অন্যতম বিখ্যাত কবিতা মেঘ বালিকা। এই কবিতাটি প্রায় পুরোটাই প্লেজিয়ারাইজেশন। প্রথমে যিনি লিখেছেন, তাঁর পুরো নাম ভুলে গিয়েছি। পদবি দাশগুপ্ত। কেউ যদি পুরো নাম জানাতে পারেন উপকৃত হব।
নজরুল আরও প্লেজিয়ারিজম লিখেছেন, ‘এসো শারদ পথের পথিক, এসো শিউলি ঝরানো পথে।’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এসো গো, শারদ লক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে/ এসো ঝরা মালতীর নিভৃত কুঞ্জে বকুল বিছানো পথে।’ রবীন্দ্রনাথ আগে লিখেছেন।
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া একটি গান— ‘আরও কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে,/ আরও কিছু কথা না হয় বলিতে মোরে।’ সিনেমায় লিপ দিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। আর রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আরও কিছুক্ষণ না হয় বসিও পাশে,/ আরও যদি কিছু কথা থাকে, তবে তাই বলো।’ রবীন্দ্রনাথ আগে লিখেছেন।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি…’, আর নজরুল লিখেছেন, ‘অঘ্রাণে মা গো, আমন ধানের সুঘ্রাণে ভরে অবনী।’ রবীন্দ্রনাথ আগে লিখেছিলেন।
