শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

গত শতকের চার, পাঁচ, ছয়ের দশক কিংবা তার বহু আগে বিউটি পার্লারে কনে সাজানো কল্পনাও করা যেত না। সেটা ছিল বড় খোঁপা বাঁধার যুগ। কনের চুলের দৈর্ঘ্য কম থাকলে সুতো বা নাইলনের তৈরি একধরনের চুল ব্যবহার করা হত। গ্রাম ও মফস্সল শহরের মানুষ ওই চুলকে ‘টেসেল’ বলতেন। কনের সাজে খোঁপায় ফিতে ব্যবহার করা হত। সে সময় সোনালি, সবুজ, লাল, গোলাপি, হলদে, সাদা প্রভৃতি রঙের নাইলনের ফিতে পাওয়া যেত। বালিকা থেকে মহিলারা সেই ফিতে দিয়ে মাথা বাঁধতেন। বিকেলে নারকেল তেল চুলে মেখে ফিতে দিয়ে মাথা বাঁধা ছিল কুমারী ও এয়োতি মেয়েদের একটি নিত্য কাজ। বিয়ের বেশ কিছু দিন আগে থেকে বিবাহযোগ্যা কন্যা শরীর, মুখ, হাত, পায়ে কাঁচা হলুদ মাখতেন।
সেকালে ঘরে ঘরে স্নানঘর ছিল না। গ্রামের বালিকা-এয়োতি সবাই পুকুরে যেতেন স্নান করতে। তখন বাজারে গা পরিষ্কারের করার জন্য এত সাবান মিলত না। যে সাবান মিলত, তা দিয়েই কাজ চলত। শ্যাম্পু মিলত না। পুকুরঘাটের মাটি ঘষে মাথার চুল পরিষ্কার করতেন। এত প্রসাধনী দ্রব্য ছিল না। কুমকুম, নখপালিশ, স্নো, পাউডার, হিমানি, সেন্ট, কাজল ছিল তৎকালীন প্রসাধনী। গাঁয়ের গোলদারি দোকানে সে সব মিলত। কাঁধে বোঝা চাপিয়ে গাঁয়ে ফেরিওয়ালারা আসতেন রং-সিঁদুর বেচতে। তাঁদের কাছেও সমস্ত প্রসাধনী মিলত।
ছয়ের দশকে বাংলা বা হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের দেখানো হেয়ার ব্যান্ড খুব জনপ্রিয় ছিল। হেয়ার ব্যান্ডগুলির নাম ছিল সে সময়ের সিনেমার নামে। যেমন, ‘লাভ ইন টোকিও’, ‘আলো আমার আলো’, ‘এন্টনি ফিরিঙ্গি’ ইত্যাদি। ‘জয় বাংলা’ নামেও প্রসাধনী বিক্রি হতে দেখেছি।
সে সময় কনের কপালে আলপনা আঁকার জন্য চন্দন বা খড়িমাটি ব্যবহার করা হত। পানের ডাঁটা, দেশলাই কাঠি, কুচিকাঠি কপালে আলপনা আঁকার সময় তুলির কাজ করত। চোখে কাজল পরানো হত।
কনে সাজাতেন আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের মধ্যে যিনি এসব কাজ পারতেন, তিনি। পায়ে আলতা পরানো থেকে নখ কাটার কাজ করতেন নাপিত বউ। ভ্রু প্লাক করার উপায় ছিল না। বিয়ের সময় কনেরা বেনারসি পরতেন। বরকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিয়ে দিতেন নাপিত ভাই অথবা বরের মামা কিংবা কোনও আপনজন। বরের পায়ে আলতা পরিয়ে দিতেন নাপিত বউ।
সেকালে বিয়েতে বর বা কনেকে বই, কলম, শাড়ি, ধুতি প্রভৃতি উপহার দেওয়ার রীতি ছিল। বিয়েবাড়িতে গ্রন্থ উপহার দেওয়ার চল কবে ফিরে আসবে, কে জানে!
সে সময় কনেকে হতে হত গৃহকর্মনিপুণা। রান্নবান্না, মুড়ি ভাজা, ধান সেদ্ধ করা, সোডায় কাপড় কাচা, ঢেঁকিতে পাহার দেওয়া, উঠোনে গোবর নাতা দেওয়া, দরজায় মাড়ুলি দেওয়া, আসন-কার্পেট বোনা, সব জানতে হত।
গ্রাম ও মফস্সলে মেয়েদের আজকের মতো গান-বাজনা-নাচ শেখার কোনও সুযোগ ছিল না। লেখাপড়া প্রাইমারি কিংবা সেভেন-এইট অবধি। মহিলাদের মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা ছিল না। ঘরেই প্রসব হত। প্রত্যেক গ্রামে অভিজ্ঞ ধাইমা থাকতেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন ত্রাণকর্ত্রী। তিনিই ছিলেন বিধাত্রী, ধাত্রীমা। (চলবে)
