অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

এককোষী প্রাণী থেকে বহুকোষী মানুষ, সবারই বাঁচার জন্য খাদ্য প্রয়োজন। গুহা যুগের মানুষকেও সকাল থেকে বেরিয়ে সারাদিন খাদ্য সংগ্রহ করতে হত। খাদ্যের জন্য গুহামানবকে শিকারের পিছনে ছুটতে, গাছে চড়তে কিংবা বন্যপ্রাণীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কখনও ছুটে পালাতে, কখনও-বা সাঁতার কেটে নদী পেরোতে হত। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে কঠোর পরিশ্রম করে খাদ্য জোগাড় করতে হত। তাই তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাদ্যের জন্য ঘুরে বেড়াতে। মানুষ যখন চতুষ্পদী থেকে দ্বিপদে উন্নীত হল, তখন মানবদেহের এক বিরাট শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটেছিল। বিশেষ করে হৃদপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালনে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছিল। তারপর ধীরে ধীরে গুহাজীবন থেকে আধুনিক জীবনে উত্তরণ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন-জীবিকায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন।
আহার্য বস্তু মানেই কি ভালো খাদ্য ? মানুষের শরীরবৃত্তীয় কাজকর্ম পরিচালনার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। খাদ্যের মধ্যে অবশ্যই তার প্রয়োজনীয় উপাদান উপযুক্ত মাত্রায় থাকতে হবে। উপাদানগুলি আমরা সবাই জানি। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট। এই তিনটি উপাদান আমাদের প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয়, কিন্তু এছাড়া রয়েছে খনিজ লবণ, ভিটামিন এবং জল। জল থেকে শক্তি পাওয়া যায় না। কিন্তু জল শারীরবৃত্তীয় কাজে অপরিহার্য। এই তিনটি উপাদান শক্তি না দিলেও মানবদেহে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথম তিনটি উপাদান আমাদের প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয়। বাকি তিনটি উপাদান শক্তির জোগান দেয় না। কিন্তু দেহগঠনে তাদের ভূমিকা কোনও অংশে কম নয়।
এছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে বর্তমানে খাদ্য বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেন— ফাইবার। দেহগঠন কিংবা শক্তি উৎপাদনে এর কোনও ভূমিকা না থাকলেও খাদ্য পরিপাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার আমাদের পরিশ্রম লাঘব করেছে। চাষির হাতে লাঙলের পরিবর্তে ট্রাক্টর এসেছে। বড় বড় অট্টালিকায় সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয় না। আবিষ্কৃত হয়েছে লিফট। মুহূর্তেই বিনা পরিশ্রমে ৭০, ৮০, এমনকী ১০০ তলা ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেয়। বাড়িতে এখন চাপাকলের প্রয়োজন ফুরিয়েছে, রান্নাঘরে আর শিল-নোড়ার ব্যবহার হয় না। এমন আরও নানাভাবে বিজ্ঞান মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে তুলেছে। মানুষ আয়েশি জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পরিশ্রম লাঘব করা এসব যন্ত্র মানুষকে যেমন সুখ দিয়েছে, পাশাপাশি এই লাইফ স্টাইলে কিছু রোগেরও প্রাদুর্ভাব হয়েছে। এগুলির মধ্যে অন্যতম সুগার, যার পোশাকি নাম ডায়াবেটিস। একে বলা হয় মানুষের নীরব ঘাতক বা Silent Killer. অনেকেই আমরা প্রথমে এই রোগ বুঝতে পারি না। তারপর কোনও সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে যখন রক্তপরীক্ষা করাতে বলেন, তখন হয়তো সুগার ২৫০-৩০০। অথচ রোগী তেমন কোনও সমস্যা বুঝতে পারেন না। তারপর শুরু হয় সুগারের চিকিৎসা। ডাক্তার বলে দেন, এই ওষুধ কখনও বন্ধ করা যাবে না। উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রেও প্রথমে কিছু বোঝা যায় না। তারপর ডাক্তারের কাছে গেলে দেখা যায়, উচ্চ রক্তচাপ অনেকটাই বেশি। এক্ষেত্রেও ওষুধ সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
এরকম অনেক রোগ আছে, যার জন্য সারা জীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হয়। আধুনিক গবেষণায় জানা গিয়েছে, এসব রোগের প্রধান কারণ ভুল খাদ্যাভাস, শরীরচর্চায় অনীহা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। বর্তমানে মানুষ ঝুঁকেছে ফাস্ট ফুড এবং জাঙ্ক ফুডের দিকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সুস্থ জীবনযাপন করার জন্য দু’টি জিনিসের প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাদ্য এবং নিয়মিত শরীরচর্চা। বর্তমান প্রজন্ম এই দু’টি বিষয় থেকেই বিরত। এমনকী শিশুরাও খেলাধুলার সুযোগ পায় না। এখনকার শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত কম। কারণ শিশুদের বৃদ্ধি, বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে খেলাধুলা বা শরীরচর্চার বিকল্প নেই। পৃথিবীতে এখনও এমন কোনও ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া পেশির শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যার মাধ্যমে ব্রেকফাস্ট এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করে সুস্থ এবং দীর্ঘদিন জীবনযাপন করা যায়।
তাই আসুন, সুস্থ পরিবার, সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ জাতি গড়তে আমরা আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন করি।
(লেখক কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুষ মন্ত্রকের অধীনে যোগ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং যোগ থেরাপিস্ট)
