শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

যুগ পালটায়। সমস্ত কিছুর ধরনও পালটায়। আজ থেকে একশো বছর আগে যা ছিল, এখন তা নেই। আজ যা আছে, তা একশো বছর আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তিত। একশো বছর যেতে হবে না, পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে যা ছিল, এখন তা নেই। সংস্কৃতি, উৎসব, সব ক্ষেত্রেই এখন বিস্তর ফারাক।
বয়স্করা বলেন, সেদিনটাই ভালো ছিল। আবার বর্তমান প্রজন্মের ধারণা, তারাই ভালো আছে। বিয়েবাড়ির কথাই ধরুন, একসময় অর্থাৎ এই সত্তর-আশি বছর আগেও এমন উজ্জ্বল আলো ছিল না। গ্রামগঞ্জে ক্যাটারিং প্রথা ছিল না। বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণে কার্ড ব্যবহার ছিল না। কাগজে ছাপা নিমন্ত্রণপত্র পাঁচের দশক থেকেই কিছু পরিবারে ধীরে ধীরে শুরু হয়। তার আগে, এমনকী সাতের দশকেও বিয়েবাড়িতে ঘরের কর্তা বা গিন্নি পান-সুপুরি দিয়ে নিমন্ত্রণ করে যেতেন। দূরের আত্মীয়দের পোস্টকার্ড পাঠানো হত অথবা লোক গিয়ে পান-সুপুরি দিয়ে যেতেন। পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণে তখন মার্জনা চাইতে হত। কুটুম্বরা বিয়েবাড়িতে যেতেন বাঁশের ডালায় বা মাটির খোলায় মিষ্টি এবং ধুতি অথবা শাড়ি নিয়ে। বউভাত দুপুরে হত। বউভাতের মেনুতে থাকত শাল বা কলাপাতায় ভাত, শাক, ডাল, কুমড়ো বা বাঁধাকপির তরকারি, সুক্তো, বরবটি-নারকেল ঘণ্ট, মাছের কাঁটা দিয়ে ছ্যাঁচড়া, মাছের ঝোল।পাতেই এসব দিয়ে দেওয়া হত। জল দেওয়া হত, কিন্তু জলপানের পাত্র ঘটি-গ্লাস বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হত। মাটিতে বসে খেতে হত। পাড়ার ছোকরা ও আত্মীয়-কুটুম্বরাই পরিবেশন করতেন।
পাঁচ-ছয়ের দশকে ভাতের ভোজে মিষ্টি বা বোঁদে দেওয়া হত না। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে লুচি, বুটের ডাল, কুমড়ো বা বাঁধাকপির ঝাল, দই ও বোঁদে থাকত। সেকালে বোঁদের অভাবে আখের গুড় দিতেও আমি দেখেছি। চার, পাঁচ, ছয়ের দশকে গ্রামের নিমন্ত্রিতরা বুট, কোট, পাজামা, পাঞ্জাবি পরে যেতেন না। খালি গায়ে, কাঁধে গামছে ঝুলিয়ে লুঙ্গি, ধুতি পরে হাতে গ্লাস বা ঘটি নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যেতেন। ঘরের জন্য পাতে কিছু ফেলে রাখতেন। ঘটি বা গ্লাসে তা তুলে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। নিজেরা খেয়ে ঘরের জন্য ‘ছাঁদা’ নিয়ে যেতেন।
বরযাত্রী গমন বেশ মজার ছিল। মেয়ের বিয়েতে রাতে লুচি, পোলাও, বিভিন্ন সবজি, কাঁটা চচ্চড়ি, মাছ, মাংস, মিষ্টি, বোঁদে থাকত। পাঁচ-ছয়ের দশকে বরযাত্রীদের পেটপুরে বা যাচাই খাওয়ানোর চল দেখেছি। গ্রামের কনেঘরের লোক নেমন্তন্ন খাওয়ার ডাক পেতেন গভীর রাতে, কখনও ভোরে। পেটপুরে বা যাচাই তো দূরের কথা, গ্রামের কনঘরের লোকদের পাতে ভাঙা মাছের টুকরো পড়ত। বিয়েবাড়িতে বরযাত্রীদের অত্যাচার ছিল চরম, যা খেতেন, নষ্ট করতেন তার চেয়ে অনেক বেশি।
সে সময় রসগোল্লা, দই পরিবেশনের লোকদের হিরো হিসাবে গণ্য করা হত। রাতে হ্যাজাক জ্বালিয়ে আলোকিত করা হত। অবস্থাপন্নরা শহর থেকে জেনারেটর আনিয়ে নিতেন। সে সময় প্যান্ডেল বলে কিছু ছিল না। ঘরসংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় গোবরের গুলনি লেপে (ছঁচ দেওয়া বলা হয়), বাঁশ পুঁতে সামিয়ানা বা ত্রিপল টাঙানো হত। বিয়েবাড়ি বা শ্রাদ্ধকাজে রান্নার সরঞ্জাম, যেমন, পেতলের বড়ো হাঁড়ি, কড়াই, গামলা গ্রামের ষোলোআনা থেকে আনা হত। বিয়েবাড়ি বা উৎসবে ঘরের বউ-মেয়ে এবং আত্মীয়স্বজন মহিলারা কাঁখে কলসিতে জল ভরে নিয়ে গিয়ে বড়ো ড্রামে ঢালতেন। মেয়ের বিয়েতে কনেঘর ও বরঘরের পুরোহিতদের মধ্যে ভীষণ তর্ক লেগে যেত। নাপিত খুব সুন্দর বিয়ের ছড়া শোনাতেন। বরঘর ও কনেঘর থেকে ছাদনাতলায় লাল, হলুদ, নীল, সবুজ, সাদা কাগজে ছড়া-কবিতার ‘প্রোগ্রাম’ হাতে হাতে দেওয়া হত। বিয়ের শুভকাজে ঘরের গিন্নিরা ঢেঁকিতে মশলা কুটতেন।
আজ যে কোনও বিয়েবাড়ির জাঁকজমকপূর্ণ ব্যবস্থাপনা অতীতের চেয়ে অনেক উন্নত। বর্তমানে যেমন কনেযাত্রীদের যাওয়ার রীতি শুরু হয়েছে, অতীতে তা ছিল না। নববধূকে শ্বশুরবাড়িতে রাখতে যেতেন কনেঘরের দু’-একজন। বরযাত্রীরা এখনকার মতো দামি গাড়িতে যেতেন না। বরযাত্রী ও বর যেতেন গরু বা মোষের গাড়ি, রিকশা, পালকি, জিপ বা ছোট গাড়ি, লরি প্রভৃতিতে। বাদ্য বলতে ঢোল-সানাই, ব্যান্ডপার্টি, কাড়া-নাকড়া। ছাদের উপর, গাছের ডালে মাইকের হর্ন বেঁধে গান বাজানো হত। স্বাধীনতার পর রাস্তা তৈরি হলে বরযাত্রীদের নিয়ে বাস গ্রামে ঢুকতে শুরু করে। (চলবে)
