Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

মাদক নয়, অভিবাসন নয়, আসল কারণ তেল

আমেরিকার আর্থিক কাঠামো ভীষণভাবে পেট্রোডলারের ওপর নির্ভর করে। চিন, রাশিয়া ও ইরান ইতিমধ্যেই বিশ্বকে ডলারমুক্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এখন ভেনেজুয়েলা তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এই সংকট থেকে নিজের দেশকে রক্ষা করতে ট্রাম্প যেটা করেছেন, তার সঙ্গে মার্কিন সন্ত্রাসের ইতিহাস যথেষ্টই সঙ্গতিপূর্ণ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

মার্কিন সেনার হাতে অপহৃত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো।

Share Links:

গৌতম সরকার

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্টের মসনদে বসার পর বিশ্বের প্রায় কোনও দেশই স্বস্তিতে নেই, ভেনেজুয়েলাও ব্যতিক্রম নয়। গত বছর জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার প্রথম দিন থেকেই মাদুরো সরকারের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে শুরু করে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ধরিয়ে দেওয়ার পুরস্কারমূল্য বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়। তাই উত্তেজনা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল। তারই ফলশ্রুতিতে গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলা চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক গ্রেফতার করে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি করে রাখা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল, মাদুরোর অপরাধ কী? কেন এই রাজনৈতিক নেতা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতন্ত্রের প্রথম নাগরিকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলেন? আমেরিকা নিজের মতো করে বহু কারণ দেখিয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, অভিবাসন, মাদক সরবরাহ, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ইত্যাদি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মুখ্য অভিযোগ হল অভিবাসন ও মাদক পাচার। তাঁর মতে, ২০১৩ সালে প্রায় ভেনেজুয়েলার ৮ মিলিয়ন মানুষ মাদুরো প্রশাসনের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং দমন পীড়ন সহ্য করতে না পেরে আমেরিকায় গিয়ে আস্তানা গেড়েছে। ট্রাম্পের আরও অভিযোগ, আমেরিকাকে জব্দ করতে মাদুরো সরকার তাদের কারাগার ও মানসিক হাসপাতাল খালি করে বহু মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিযোগ হল, মাদক পাচার, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল ফেন্টানিল এবং কোকেন। এছাড়া ট্রাম্প ওই দেশের দু’টি গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বলে চিহ্নিত করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, মাদুরো স্বয়ং ‍‘দে লস সোলেস’ কার্টেলটির নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে মাদুরো জানিয়েছেন, তিনি কোনও কার্টেলের সুপ্রিম বস নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ জানিয়ে মাদুরো বলেছেন, ‍মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যে এক অভিযোগ। আসলে ট্রাম্প চাইছেন, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভেনেজুয়েলার বিশাল পেট্রোলিয়াম তেলের দখল নিতে।

ট্রাম্পের দাবি, তাঁদের এই যুদ্ধ মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে এক অ-রাজনৈতিক সংগ্রাম। যদিও বিশেষজ্ঞরা এই বিশ্লেষণে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের মতে, এই সংঘাত না ড্রাগের বিরুদ্ধে, না সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের সংকটের বিরুদ্ধে তো নয়ই। তাঁরা যুক্তি দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা বিশ্বের ১ শতাংশেরও কম কোকেন তৈরি করে। মাদুরোর বিরুদ্ধে কোনওরকম সন্ত্রাসবাদী সংগঠন চালানোর অভিযোগ নেই। আর গণতন্ত্রের অবমাননা রুখতে ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্বপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, একথা একজন শিশুও বিশ্বাস করবে না। কারণ সেটা হলে যে দেশে ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন’ শব্দবন্ধটি প্রায় নিষিদ্ধ বলা চলে, আমেরিকা সেই সৌদি আরবের মিত্র দেশ হতে পারত না। তাহলে এই অভিযানের আসল কারণটা কী? একটি দেশের রাজধানী শহরের অন্দরমহলে ঢুকে সেদেশের প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক গ্রেফতার করে নিজের দেশে নিয়ে যাওয়া ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। রাশিয়া জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় হামলার যে অজুহাত আমেরিকা দেখাচ্ছে, সেটা সঠিক নয়। ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে তাদের সংহতি পুনর্ব্যক্ত করে রাশিয়া উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুত স্পষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছে, এই আক্রমণ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অমার্জনীয় লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতির এক অগ্রহণযোগ্য অসম্মান। অন্যদিকে চিন জানিয়েছে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য শক্তি প্রয়োগ এবং দেশের প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার করে নিজের দেশে বন্দি করে রাখা, এই আধিপত্যবাদ আন্তর্জাতিক আইন এবং একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছু নয়।

নিজের দেশের মধ্যেও ট্রাম্প সমালোচিত হচ্ছেন৷ সে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসের অনলাইন সংস্করণের এডিটোরিয়াল বোর্ডের কলামে ট্রাম্প কর্তৃক ভেনেজুয়েলায় হামলার ঘটনাকে অবৈধ ও অপরিণামদর্শী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এডিটোরিয়াল বোর্ড উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এই হামলার ফলে দেশটির জনগণের কষ্ট বাড়বে। সেদেশের আঞ্চলিক অস্থিরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে মার্কিন ভাবমূর্তির স্থায়ী বিনাশ ঘটবে। অন্যদিকে গত ৫ জানুয়ারি জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্কবার্তা দিয়েছেন, এ ধরনের আগ্রাসন বিশ্বজুড়ে বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যতই অভিবাসন বা মাদক পাচারের অভিযোগ তুলুন না কেন, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক আক্রমণ এবং মাদুরোর গ্রেফতারের পিছনে আসল কারণ কিন্তু এগুলি নয়। আসল কারণ খুঁজতে গেলে অনেকটা পিছনে যেতে হবে। ১৯৭৪ সালে তদানীন্তন মার্কিন ডিপ্লোম্যাট এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞানী হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে সৌদি আরবের একটি চুক্তি হয়েছিল। সে চুক্তির শর্ত ছিল, সৌদি আরব তাদের সমস্ত তেল ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করবে, অন্য কোনও মুদ্রার বিনিময়ে নয়। ফলে সারা বিশ্বে ডলারের চাহিদা বাড়বে, আর আমেরিকা যথেচ্ছ ডলার ছাপাতে পারবে। এখন ভেনেজুয়েলা তাদের পেট্রোডলার উপার্জনের উৎসে আঘাত হেনেছে। ২০১৮ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ঘোষণা করেছিলেন, তাঁরা নিজেদের ডলার বাণিজ্য থেকে মুক্ত করতে চায়। সেইমতো এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের অধিকারী দেশ ভেনেজুয়েলা তাদের তেল ডলারের পরিবর্তে ইউয়ান, ইউরো, রুবলে বিক্রি করতে শুরু করেছে। এছাড়া তারা BRICS-এ যোগদানের আর্জি জানিয়েছে। SWIFT-কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চিনের সঙ্গে একটা সরাসরি পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি করেছে। এসব দেখে প্রমাদ গুনছে আমেরিকা।

ভুললে চলবে না, আমেরিকার আর্থিক কাঠামো ভীষণভাবে পেট্রোডলারের ওপর নির্ভর করে। চিন, রাশিয়া ও ইরান ইতিমধ্যেই বিশ্বকে ডলারমুক্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এখন ভেনেজুয়েলা তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এই সংকট থেকে নিজের দেশকে রক্ষা করতে ট্রাম্প যেটা করেছেন, তার সঙ্গে মার্কিন সন্ত্রাসের ইতিহাস যথেষ্টই সঙ্গতিপূর্ণ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ঘোষণা করেছিলেন, ‍তখন থেকে তাঁর দেশ সমস্ত তেল ডলারে নয়, ইউরোর বিনিময়ে বিক্রি করবে। তার পরিণতি কী হয়েছিল, আমরা নিশ্চয় ভুলিনি। তিন বছর পর ইরাকে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে সাদ্দামকে হত্যা করে আমেরিকা নবনিযুক্ত সরকারকে পুনরায় ডলারের অঙ্কে তেল বিক্রি করতে বাধ্য করেছিল। এখানেই শেষ নয়, ২০০৯ সালে গদ্দাফি আফ্রিকান কারেন্সি ‍‘গোল্ড ডিনার’-এ তেল বিক্রির ইচ্ছাপ্রকাশ করলে তাঁরও একই পরিণতি হয়েছিল। ‍‘ন্যাটো’ বোমা মেরে লিবিয়াকে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। খুন হওয়ার আগে গদ্দাফিকে পাশবিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। তাই মাদুরোর ওপর আক্রমণ ও গ্রেফতার নতুন কিছু নয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর কপালে কী আছে, তা সময়ই বলবে। এখন দেখার, এই প্রেক্ষিতে বিশ্বের বাকি দেশগুলি কী ভূমিকা পালন করে। আমেরিকার মিত্রদেশেরও কিন্তু অভাব নেই। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যেই মাদুরোর অপসারণকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, তারা ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে। তবে যতই এর পিছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধির চুলচেরা বিচার করা হোক না কেন, আমেরিকার ভেনেজুয়েলা আক্রমণ অনেকটাই অর্থনৈতিক। এই সন্ত্রাস একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, আমেরিকা ভয় পেয়েছে। তারা বুঝতে পারছে, ডলারের বাজার শুকিয়ে আসছে। যখন কোনও দেশ বোমা মারার ভয় দেখায় নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করতে, তার একটাই অর্থ হয়, তথাকথিত সেই মুদ্রার মৃত্যু শুধু সময়ের অপেক্ষা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए