Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

গীতা দত্ত: সাফল্য ও ব্যর্থতার করুণ মিশ্রণ

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

ভারতের সংগীত জগতে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে ছাড়া গীতা দত্তর মতো প্রভাব আর কোনও গায়িকার নেই। তিনি সারা জীবনে বহু গান গেয়েছেন, অথচ বেঁচেছিলেন মাত্র  ৪১ বছর ৭ মাস। জীবনের শুরুটা হয়েছিল সুজলা শ্যামল বাংলার পূর্ব ভাগে এক সম্পন্ন জমিদার বংশে। কিন্তু তাঁর পরিবার বুঝেছিল, সেখানকার বিরূপ পরিবেশে থাকা সম্ভব নয়। তাই ১৯৪২ সালে তাঁর পিতামাতা জমি-সম্পত্তি ছেড়ে পালিয়ে আসেন এদিকে এবং মুম্বই শহরে একটি বাড়ি কেনেন। তাঁদের বাড়ি ছিল প্রাক-স্বাধীনতা পর্বের বাংলার ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর মহকুমায়। এখন সেটা রয়েছে নবগঠিত শাহরিয়ারপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলায়। বিয়ের আগে তিনি গীতা রায় নামেই পরিচিত ছিলেন।

গীতা যখন মুম্বই আসেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ১২ বছর। মুম্বইয়ে তিনি বেঙ্গলি হাইস্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি তাঁর পিতামাতার ১০ সন্তানের অন্যতম। বাংলায় থাকতেই তিনি সংগীতগুরু হীরেন্দ্রনাথ নন্দীর কাছে গানের তালিম নেন। মুম্বই আসার মাত্র চার বছরের মাথায় ১৯৪৬ সালে ১৬ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে তাঁর পা রাখা সুরকার কে হনুমান প্রসাদের বদান্যতায়। পৌরাণিক ছবি ভক্ত প্রহ্লাদ-এ দু’টি গানের মধ্য দিয়ে তাঁর আত্মপ্রকাশ। তিনি গানগুলির দু’টি করে কলি গেয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে ‘দো ভাই’  ছবিতেই তাঁর পূর্ণ আবির্ভাব জনপ্রিয় মেরা সুন্দর সপনা বিত গয়া  দিয়ে। এর সুরকার ছিলেন শচীনদেব বর্মন।

গীতা দত্ত দু’বছরে পনেরোটি ছবিতে গান গেয়েছেন। ১৯৪৯-এর মধ্যে তিনি অন্যতম মুখ্য প্লে-ব্যাক গায়িকা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। জনপ্রিয় গানগুলি হল, শহিদ, এক থি লড়কি, দারোগাজি, শবনম ও জিৎ  এবং অন্যান্য। দারোগাজি ও জোগান ছবি মুক্তি পায় যথাক্রমে, ১৯৪৯ ও ১৯৫০ সালে। মোট ১২টি গান ছিল। সুর করেছিলেন বুলো রানি। ১৯৫১ সালে শচীনদেবের সুরে ‘বাজি’ ছবির গান তগদির সে বিগড়ি হুই তকদির বনা লে  তাঁকে খ্যাতির তুঙ্গে তোলে। সে সময় গীতা রায় ‘বাজি’র পরিচালক গুরু দত্তর প্রেমে পড়েন গানের রেকর্ডিং চলাকালীন। পরপর ছবির গান হিট করায় তিনি পাঁচের দশকে সবচেয়ে দামি শিল্পী হয়ে যান এবং সর্বাপেক্ষা চাহিদাসম্পন্ন গায়িকা হিসাবে পরিগণিত হতে থাকেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ১২টি ও ১৯৪৯ সালে ২৫টি ছবিতে গান করেন।

গীতা গুজরাটি ভাষা না জানলেও এই ভাষার গানেও রাতারাতি খ্যাত হন। ১৯৪৮ সালে চারটি, ১৯৫০ সালে ছ’টি ও ১৯৫১ সালে দু’টি গুজরাটি ছবিতে তিনি নেপথ্য কণ্ঠে গান করেন। ১৯৫৫ সালে ফের গুজরাটি ছবি ‘নাগদেবতা’য় তিনি পাঁচটি গান করেন। আর ১৯৫৬ সালে তাঁর ভাই মুকুল রায়ের সুরে গুজরাটি ছবি ‘বিধাতা’য় তিনি চারটি গান করেছিলেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে গীতা দত্ত প্রায় ২৫টি গুজরাটি ছবিতে ৮০টি গান গেয়েছিলেন।

মাতৃভাষায় গান না গাইলে গীতাকে কি কেউ ছেড়ে দিত? তাঁর গাওয়া বাংলা গান সংখ্যায় অল্প, কিন্তু প্রত্যেকটি অনন্যসুন্দর। বাংলায় তিনি ১৯৫৬ সালে মহাকবি গিরিশচন্দ্র ছবিতে দু’টি গান রেকর্ড করেন। ১৯৫৭ সালে পৃথিবী আমারে চায় ও ১৯৫৮ সালে ইন্দ্রানী ছবির গানগুলি উন্নত মানের হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে সোনার হরিণ, ১৯৫৯ সালে মধ্যরাতের তারা ও সাথীহারা প্রভৃতি ১১টি ছবিতে তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে গান করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে লুকোচুরি ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে কিশোর কুমারের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া তাঁর গানগুলি অমর হয়ে রয়েছে। এগুলির মধ্যে অন্যতম ‘শুধু একটুখানি চাওয়া’ গানটি। বাংলা সিনেমার গান ছাড়াও তিনি কানু ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত ও সলিল চৌধুরীর সুরে ভক্তিমূলক, লোকসংগীত ও অন্যান্য ঘরানার গান গেয়েছেন।

বাজি ছবির সেটে দু’জনের দেখা হওয়ার পর গীতা রায় প্রায়ই গুরু দত্তর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়ি মুম্বইয়ের মাতুঙ্গায় যেতেন এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গেও মেলামেশা করতেন। কিন্তু এই ভালোবাসা পরিণয়ে পরিণত হতে কিছু বাধা ছিল। প্রথমত, গীতা রায় ছিলেন তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আবার গুরু দত্ত ছিলেন তখনও প্রায় উপার্জনহীন। তার ওপর গুরু দত্ত ছিলেন অবাঙালি। কিন্তু গুরু দত্তর পরিবারের সদস্যদের উৎসাহে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়। সাক্ষাতের তিন বছর পর ২৬ মে, ১৯৫৩ বিয়ে সম্পন্ন হয় সান্তাক্রুজে গীতা রায়ের মায়ের বাড়িতে।

বিবাহিত জীবন কিন্তু সুখের হয়নি। প্রথমত, দু’জনের ব্যক্তিত্ব ছিল দু’রকমের, যা কেউ বিয়ের আগে বোঝেননি। তার ওপর ছিল ঠাসা কর্মসূচি। এর থেকেও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সবচেয়ে যা আঘাত দিয়েছিল, তা হল, গুরু দত্ত ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতি হয় যে, গীতা দত্ত প্রায়ই তাঁর মায়ের সান্তাক্রুজের বাড়িতে থাকতেন, আর গুরু দত্ত ব্যস্ত থাকতেন তাঁর পেশায়। বিচ্ছিন্নতার শুরু এখান থেকেই।

এর পর গুরু দত্ত এই ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগাতে শুরু করেন ১৯৫৭ সালে। ১৯৪৩ সালে হিন্দি ভাষায় গৌরী নামে একটি ছবি নির্মিত হয়েছিল। তিনি সে ছবির রিমেক করতে যান ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় এবং তাতে গীতা দত্তকে মুখ্য ভূমিকায় রাখেন। ১৯৫৭ সালে কলকাতায় শুটিং শুরু হয়। একটা অজানা কারণে কয়েকদিনের মধ্যে শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। ছবিটি অসমাপ্ত থাকায় গুরু দত্তর আর্থিক ক্ষতি হয়। বিমল মিত্র ছিলেন লেখক এবং নবেন্দু ঘোষ ছিলেন পরিচালক। সেটে গুরু দত্তর সঙ্গে একটা উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। গুরু দত্ত শুটিং গুটিয়ে দু’দিনের মধ্যে কলকাতা ছেড়ে চলে যান। ১৯৬৩ সালে গীতা দত্ত পালি হিলে তাঁদের বাড়ি ভেঙে ফেলার পর তিন সন্তানকে নিয়ে বান্দ্রায় চলে যান। আর গুরু দত্ত পেডার রোডে একা একটি ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করেন।

বিয়ের পর গীতা গুরু দত্তর প্রায় সব ছবিতে গান করেছিলেন। যেমন, মিঃ অ্যান্ড মিসেস, পিয়াসা, কাগজ কে ফুল, সাহেব, বিবি অওর গুলাম। ১৯৫৬ সালে তাঁর ভাই মুকুল রায় প্রযোজিত সয়লাব ছবিতে আর্থিক ক্ষতির পর গীতা দত্ত নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৫০-এর শেষের দিকে তাঁর সংগীত জীবনে পতন আরম্ভ হয়। ব্যক্তিগত জীবনে অশান্তি, প্রায়ই রিহার্সালে অনুপস্থিত থাকা এবং অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর কেরিয়ারের ক্ষতি করেছিল। সে সময় শচীনদেব বর্মন ও ওপি নায়ার লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলেকে বেশি করে কাজ দিতে থাকেন। ১৯৬৪ সালে গুরু দত্ত মারা যাওয়ার পর গীতা আরও ভেঙে পড়েন। চলচ্চিত্রে তাঁর গান করা আরও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। ১৯৬৭-তে বাংলা বধূবরণ ও ১৯৭১-এ হিন্দি অনুভব-এ তিনি গান করেন। তাঁর শেষ কাজ ছিল ১৯৭২ সালে তালাত মামুদের সঙ্গে মিডনাইট ছবিতে, কিন্তু সেটি মুক্তি পায়নি। ১৯৭২ সালে লিভারের সিরোসিসে তিনি মারা যান। ২৫ বছরে তিনি ১৪০০ গান করেছিলেন বাংলা, গুজরাটি, মারাঠি, মৈথিলি, ভোজপুরি, পাঞ্জাবি ও নেপালি ভাষায়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए