প্রদীপ মারিক
পৌষ-মাঘ মানেই আপামর বাঙালির পিঠা উৎসবের মাস। পৌষের অঙ্গ হিসাবে পিঠাপুলি না রাখলে রসনার আশ মেটে না কোনও বাঙালির। রকমারি পিঠার সঙ্গে পুরুলিয়ার মানুষদের এক অজানা সম্পর্ক আছে। পিঠার ইতিহাসের সঙ্গে লালমাটির ইতিহাসের মেলবন্ধনটিও ভারি চমৎকার। বাংলায় পিঠেপুলি শব্দটারই চল। তবে শুদ্ধ শব্দটি কিন্তু পিঠা। এই শব্দটি এসেছে আসলে সংস্কৃত ‘পিষ্টক’ শব্দ থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ পিষ্ট।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ থেকে জানা যায় যে, চালের গুঁড়ো, ডাল বাটা, গুড় ও নারকেল দিয়ে তৈরি রসনা তৃপ্তিকারী মিষ্টিরই পিঠা নাম দেওয়া হয়েছিল। পিঠার মূল উপাদানই হল নতুন ধান অর্থাৎ চালের গুঁড়ো। বাংলার খাদ্য সংস্কৃতিতে ঠিক কোন সময় এর উৎপত্তি, ইতিহাসে তেমন দৃষ্টান্ত পাওয়া না গেলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল কাব্যগ্রন্থগুলিতে পিষ্টক শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই এক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যেতে পারে, পিঠার প্রচলন বাঙালি সমাজে অনেক প্রাচীন।
পুরুলিয়ায় পিঠা বানানো হয় পৌষ মাসের শেষের চার দিন। চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর এবং আখান নামে পরিচিত সেই দিনগুলি। টুসু পরবে এই পিঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কুড়মি জাতির কাছে। কুড়মালি ভাষার বেশ কিছু গানে এই পিঠার উল্লেখ পাওয়া যায়। চাঁউড়ির দিন বাড়ির মহিলারা গোবরমাটি দিয়ে ঘর পরিষ্কার করে চালের গুঁড়ো তৈরি করেন। পরম্পরা মেনে এখনও ঢেঁকিতেই ছাঁটা হয় চাল। বাঁউড়ির দিন অর্ধচন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি ও চতুষ্কোণাকৃতির পিঠা তৈরি করে তাতে চাঁছি, তিল, নারকেল বা মিষ্টি পুর দিয়ে ভর্তি করা হয়। স্থানীয়রা এই পিঠাকে ‘গড়গইড়্যা পিঠা’ বা ‘বাঁকা পিঠা’, অনেকে ‘উধি পিঠা’ বা ‘পুর পিঠা’ও বলে থাকেন। ‘পুর পিঠা’ থেকেই পুলি পিঠে কথাটি আসে। পুলি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পোলিকা’ থেকে। নারকেলের পুর দেওয়া পিঠাকেই পুলি পিঠে বলা হয়েছে হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইয়ে। এমনকী হাল আমলের যে চিকেন পাটিসাপটা কনসেপ্ট, তাও কিন্তু পুরুলিয়ার কুড়মিদের থেকে পাওয়া। টুসু বিদায়ের দিন ‘মাস পিঠা’ বা ‘মাংস পিঠা’ বানিয়ে থাকেন এই জাতির লোকরা। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, আর্যরা যখন চাল বা নানা ধরনের শস্যের গুঁড়ো পাথরে কুটতে শুরু করেছিল, সেটাকেই বলা যেতে পারে পিঠার আঁতুড়ঘর। বৈদিক যুগেও আমরা কিন্তু পিঠার উল্লেখ পাই। তখন যজ্ঞে ব্যবহার হত যব। সেই যব দিয়ে একধরনের পিঠা তৈরি হত, যার নাম ‘পুরোডাশ’। এই পিঠাকে অত্যন্ত পবিত্র খাবার বলে গণ্য করা হত। মহাভারতেও পুরোডাশ পিঠের উল্লেখ রয়েছে। কর্ণ যখন অঙ্গরাজ্যের রাজা হিসাবে অভিষিক্ত হন, তখন ভীম বলেছিলেন, ‘কুকুর যজ্ঞের পুরোডাশ খেতে পারে না। তুমিও অঙ্গরাজ্য ভোগ করতে পারো না।’
বাঙালির লৌকিক ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে পিঠাপুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বহুকাল ধরে। এই প্রথা লৌকিক এবং নান্দনিক সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। সাধারণত শীতকালের রসনা জাতীয় খাবার হিসাবে পিঠা অত্যন্ত পরিচিত। মুখরোচক খাদ্য হিসাবে বাঙালি সমাজে বিশেষ আদরণীয়। এছাড়াও আত্মীয়স্বজন ও মানুষে মানুষে পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনকে আরও দৃঢ় ও মজবুত করে তুলতে পিঠাপুলি উৎসবের আয়োজন করা হয়।
একসময় একান্নবর্তী প্রত্যেক বাঙালি পরিবারে পৌষ সংক্রান্তির দিন হেঁশেল ম-ম করত পিঠাপুলি আর পায়েসের গন্ধ। বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তখন তৈরি হত নানারকমের পিঠা। পুলি পিঠের মধ্যে থাকত মুগের পুলি, ভাজাপুলি, দুধপুলি, চন্দ্রপুলি আর সেদ্ধ পুলি। অন্য ধরনের পিঠা বলতে, পাটিসাপটা, গোকুল পিঠা, পোস্তর পিঠা, নারকেল পিঠা, সরুচাকলি, গড়গইড়্যা, পাতসিজা ইত্যাদি।
একসময় গ্রামবাংলার শীত মানেই ছিল কাঁথা এবং পিঠা। কাঁথায় কে কত সুন্দর ফুল তুলবে, সেই আশায় শীতের দুপুরে রোদ পোহাতে পোহাতে চলত সেলাই। দোকানে গিয়ে দামি সুতো কিনে কাঁথা সেলাই করার বিলাসিতা ছিল না। বাতিল শাড়ির পাড় থেকে সুতো সংগ্রহ করে কাঠের টুকরোয় নানা রঙের সুতো পেঁচিয়ে রাখা হত। সেগুলি ব্যবহার করেই তৈরি হত দারুণ সব কাঁথা। একটা সময় কাঁথাই ছিল তক্তপোষ, খাট, বিছানায় শীত নিবারণের একমাত্র সম্বল। যতই এখন ব্ল্যাংকেট কিংবা অন্য কিছু আসুক, কাঁথা আছে কাঁথাতেই একই স্বমহিমায় তার শৈল্পিক আভিজাত্য নিয়ে। শীতকাল মানেই নকশি কাঁথায় বসে মিঠে রোদ গায়ে মেখে সেদ্ধ নারকেল পুলি, সরুচাকলি খেঁজুর রসে ডুবিয়ে মোজ করে খাওয়া।
