অজয় ভট্টাচার্য

‘প্রজাতন্ত্র’ শব্দটির অর্থ যদি এই হয় যে, ‘প্রজাবর্গের প্রতিনিধি কর্তৃক পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা’, সেক্ষেত্রে ‘প্রজাতন্ত্র’ কথাটি যে গোলমেলে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারণ যে রাষ্ট্র প্রজারাই পরিচালনা করেন, সে রাষ্ট্রে প্রজা কারা? প্রজারাই তো সেখানে রাজা। অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় প্রজা ছাড়া আর কোনও শাসক নেই। রাষ্ট্রের সকলে একাধারে প্রজা এবং রাজা।
সব মিলিয়ে প্রজাতন্ত্র যেন সোনার পাথরবাটির মতো। গোলমালটা আরও বেড়ে যায়, যখন দেখা যায়, প্রজাতন্ত্র বলতে বাংলা ভাষায় দু’টি পৃথক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে ‘প্রজাতন্ত্র’ শব্দের অর্থ হিসাবে বলা হয়েছে, প্রজাবর্গের সমানাধিকারবাদ। অর্থাৎ প্রজাদের পরামর্শানুসারে অথবা বিভিন্ন প্রজার প্রতিনিধিদের ঐকমত্যানুসারে রাজ্যশাসন তথা democracy। ‘চলন্তিকা’-র পুরোনো সংস্করণেও একই অর্থ দেওয়া রয়েছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত নবীন ‘সংসদ’ অভিধানে লেখা হয়েছে, প্রজাবর্গের নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা রাষ্ট্রশাসন বা শাসিত রাষ্ট্র তথা republic। যদিও ‘ডেমোক্র্যাসি’ আর ‘রিপাবলিক’ এক নয়। অর্থাৎ বিগত বিশ-ত্রিশ বছর আগেও বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের খুব একটা স্পষ্ট পৃথকীকরণ করা ছিল না, যা আজকের দিনে একটি নির্দিষ্ট অর্থ ধারণ করেছে।
আবার ‘রিপাবলিক’ বোঝাতে অভিধানে আরও একটি শব্দ পাওয়া যায়। সেটি হল ‘সাধারণতন্ত্র’, যার অর্থ রাজা ব্যতিরেকে প্রজার প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র তথা republic। এই অর্থে সাধারণতন্ত্রও প্রজাদের প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র, অথচ তা প্রজাতন্ত্র নয়। কী গোলমেলে প্লট!
আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে এসব নিয়ে অনেক ভাবনা হয়েছে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শব্দগুলি মোটামুটি একটি নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করেছে। প্রজাতন্ত্রে প্রজারাই রাজা নির্বাচন করেন। যিনি রাজা, তিনি একাধারে আবার প্রজাও। কারণ প্রজাদের মতো তিনিও রাজা নির্বাচনে ভোটাধিকার ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তাই এই ব্যবস্থায় রাজার মধ্যে দ্বিবিধ সত্তা দেখতে পাওয়া যায়। তিনি একাধারে রাজা এবং প্রজা। আগে এত সব সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ধারণার পার্থক্য নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন ছিল না। ইদানীং সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন হয়েছে।
‘গণতন্ত্র’ ও ‘প্রজাতন্ত্রের’ তফাত নিয়েই আমরা সচেতন হয়েছি, তা শুধু নয়, ‘সার্বভৌমত্ব’ আর ‘প্রশাসনিকতা’ নিয়েও আজ আমরা সচেতন। ‘সার্বভৌমত্ব’ হল, আইন প্রণয়ন ক্ষমতা, দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা, যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা। প্রাক-আধুনিক রাষ্ট্রে এই সার্বভৌম ক্ষমতা সব সময় কেন্দ্রীভূত ছিল না। একই ভূখণ্ডে একাধিক ক্ষমতাশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন জারি করত, কর আদায় করত, অপরাধের শাস্তি দিত। আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। যদিও বিশ্বব্যাপী কোনও কোনও ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব বিতর্কিত। বিশ্বায়নের যুগে দুর্বল দেশ অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন হয়েছে পুঁজির কাছে।
তথ্যসূত্র: প্রজা ও তন্ত্র, পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
