কাজল মুখার্জি

২৬ জানুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়, ভারতীয় গণতন্ত্রের আত্মপরিচয়ের দিন। এ বছর ভারত ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবস উদ্যাপন করল।
১৯৫০ সালের এই দিনেই কার্যকর হয়েছিল ভারতের সংবিধান। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় ভারত নিজেকে ঘোষণা করেছিল একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসাবে। সেই ঘোষণা কেবল আইনের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল বহু কোটি মানুষের আশা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের দলিল।
সাধারণতন্ত্র মানে শুধু রাষ্ট্রপতি, সংসদ বা সংবিধান ভবন নয়, আইনের চোখে সবাই সমান, ভোটের অধিকার সবার এবং রাষ্ট্রের মালিক জনগণ নিজেই। দিনটিতে দিল্লির রাজপথে কুচকাওয়াজে দেখা গিয়েছে দেশের সামরিক শক্তি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সাধারণতন্ত্র দিবসের প্রকৃত গুরুত্ব লুকিয়ে রয়েছে রাজপথের বাইরেও, গ্রামের স্কুলে, শহরের বস্তিতে, পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায়, ভোটকেন্দ্রের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের চোখে।
৭৭ বছরে ভারত অনেক দূর এগিয়েছে। অর্থনীতি বড় হয়েছে, প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে জীবনযাত্রা, মহাকাশ থেকে ডিজিটাল পরিকাঠামো, সবখানেই ভারতের উপস্থিতি স্পষ্ট। তবু এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু কঠিন প্রশ্নও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গণতন্ত্র কি শুধু ভোটে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে? সংবিধানের অধিকার কি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছোচ্ছে? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়, ধর্মনিরপেক্ষতা, এই মৌলিক মূল্যবোধগুলি কি আমরা যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারছি?
আজকের সাধারণতন্ত্র দিবস তাই শুধুই উৎসব নয়, একটি আত্মসমীক্ষার দিন। আমরা নাগরিক হিসাবে কীভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করছি, ভিন্নমতকে কতটা সম্মান দিচ্ছি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন ভারত রেখে যেতে চাই, এ প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার দিন।
সংবিধান প্রণেতারা একটি নিখুঁত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাননি, তাঁরা দেখিয়েছিলেন একটি সংশোধনযোগ্য, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের পথ। আজ সে পথ ধরে এগোনোর দায়িত্ব আমাদের। ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবসে দাঁড়িয়ে তাই নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি, সাধারণতন্ত্র সরকার নয়, আমরা সবাই। সংবিধান কাগজে লেখা আইন নয়, আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও মূল্যবোধ।
