প্রদীপ মারিক
শীত মানেই খেজুর রস। শীতের সকালে এই রস এক গ্লাস গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ার মজাই আলাদা। বাঙালিদের কাছে খেজুর রসের জুড়ি মেলা ভার। গ্রামের শিউলিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বড় কড়াইয়ে ফুটিয়ে গুড় তৈরি করেন।
শীত পড়তেই ভোজনরসিক বাঙালির যেন নতুন করে মনে পড়ে জয়নগরের নাম। জয়নগরের মোয়া খেতে হবে যে! নরম, কিঞ্চিৎ রসসিক্ত এই মোয়াই যেন শীতের অনুভূতিটা আরও বাড়িয়ে দেয়। শীতের ক’টা দিন জয়নগরের মোয়া খান না, এমন বাঙালি বিরল।
মোয়ার জন্মদাতা হিসাবে বেশি শোনা যায় বহড়ুর যামিনী বুড়োর কথা। তিনি নিজের চাষ করা কনকচূড় ধানের খই ও নলেন গুড় দিয়ে মোয়া তৈরি করে একটি অনুষ্ঠানে পরিবেশন করেন। সেখানে এসেছিলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব। তিনি মোয়া খেয়ে তৃপ্তি পান।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপি, কাকদ্বীপ ও নামখানা অঞ্চলের প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে কনকচূড় ধানের চাষ হয়। নলেন গুড়ের উৎস খেজুর গাছ। শীতকালে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন শিউলিরা। সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের রস পাওয়া যায় জিরেন কাঠ অর্থাৎ কয়েকদিন বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে, এমন খেজুর গাছ থেকে। জিরেন কাঠ থেকে রস সংগ্রহ করে সেই রস ঢিমে আঁচে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় নলেন গুড়।
জয়নগরের মোয়ার প্রধান উপাদান কনকচূড় ধানের খই, নলেন গুড় ও গাওয়া ঘি। এছাড়াও ক্ষীর, পেস্তা, কাজুবাদাম, কিশমিশ ও পোস্ত ব্যবহার করা হয়। মোয়া শীতকালে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তৈরি করা হয়। এই সময় জয়নগর ও তার লাগোয়া অঞ্চলের মানুষের জীবিকার একটা অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় মোয়া শিল্প।
২০১৫ সালে জিআই বা জিয়োগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন তকমা আদায় করে নেয় জয়নগরের মোয়া। প্রতিবছরই কলকাতা-সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গে জয়নগরের মোয়া বিক্রি বেড়ে চলেছে। শিয়ালদা-বনগাঁ, শিয়ালদা-হাসনাবাদের মতো ট্রেন লাইনে জয়নগরের মোয়া বিক্রি হয়।
বর্তমানে মোয়া ব্যবসায়ীরা অনেক সমস্যার সম্মুখীন। এর মূল কারণ উৎকৃষ্ট মানের নলেন গুড়ের অভাব। অনেক ক্রেতাই বলেন, জয়নগরের মোয়ায় আগের মতো স্বাদ-গন্ধ আর মেলে না। মোয়া তৈরির ক্ষেত্রে অন্যতম মূল উপাদান হল নলেন গুড়। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও তেমনভাবে লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না গুড় ব্যবসায়ীরা। ফলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর, কুলতলি, বাসন্তী, গোসাবা এলাকার শিউলিরা এখন অন্য ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন। লাভ না থাকার কারণে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছে না নতুন প্রজন্মও। আর এতে দিন দিন দামও বাড়ছে জয়নগরের মোয়ার। অনেকেরই আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আসল নলেন গুড়ের মোয়া পাওয়া ভবিষ্যতে দুষ্কর হয়ে যাবে।
শুধু শীতকালে তিন মাসই পাওয়া যায় জয়নগরের মোয়া। খাঁটি নলেন গুড়ে জ্বাল দিয়ে তাতে কনকচূড় ধানের খইয়ের পাক দেওয়ার বিশেষ পদ্ধতি আছে। জ্বাল দিয়ে সর না পড়ার একটা নিয়ম আছে। গুড়ে খই দিয়ে মাখানোর পর ৮ ঘণ্টা রাখা হয়। তারপরই ক্ষীর, ঘি, ড্ৰাই ফ্রুটস, এলাচের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি হয় জয়নগরের মোয়া। তা তৈরি করতে সময় লাগে ১২-১৪ ঘণ্টা। এখানকার কারিগররা সে কাজে পারদর্শী।
জিআই তকমা মেলায় আগেই দেশজোড়া সুনামের অধিকারী হয়েছিল জয়নগরের মোয়া। এই তকমা পাওয়ার পর নতুন করে এই সুস্বাদু মোয়ার গরিমা আরও বাড়ল। খাঁটি মোয়ার ছবি দেওয়া বিশেষ খাম প্রকাশ করেছে ভারতীয় ডাক বিভাগ। এই বিশেষ খামে মোয়া পৌঁছে যাবে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি হয়ে দেশে-বিদেশে। এই খামে মোয়ার ছবির পাশাপাশি রয়েছে জিআই চিহ্ন এবং মোয়া প্রস্তুতকারক সোসাইটির নাম। ব্যবসায়ীদের আশা, সরকার এই পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে বিদেশে প্রচুর পরিমাণে মোয়া রফতানি করা যাবে।
বহড়ু না জয়নগর, কোন জায়গার মোয়া সেরা, সেই গুণগত বিচার এখনও পর্যন্ত কোনও খাদ্যরসিক বাঙালি করে উঠতে পারেননি। বহড়ুর মোয়া স্বাদে কিন্তু মোটেও পিছিয়ে নেই জয়নগরের চেয়ে। জয়নগরের মোয়ার চেয়ে বহড়ুর মোয়া যেন কিঞ্চিৎ নরম। জয়নগরের মোয়ায় ক্ষীরের আধিক্য সামান্য বেশি, আর বহড়ুর মোয়ায় খেজুর গুড়ের আধিক্য বেশি থাকে। স্বাদে পিছিয়ে না থাকলেও খ্যাতিতে বহড়ুর মোয়া ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারেনি জয়নগরের। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, বহড়ু বৃহত্তর জয়নগরেরই অংশ। সেই যুক্তিতে বহড়ুর মোয়াও জয়নগরের মোয়া। তবে বহড়ুর মোয়া বিক্রেতা-নির্মাতারা একথা মোটেও মানতে চান না। খ্যাতিতে পিছিয়ে থাকলেও আলাদা অস্তিত্বের এই গৌরব তাঁরা ছাড়তে রাজি নন। জয়নগর-বহড়ুর মোয়ার স্বাদের লড়াই অনেকটা মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ডার্বি ফুটবল ম্যাচের মতো। কে সেরা, সেটা বলা কঠিন। তবু জয়নগর-বহড়ুর খাঁটি মোয়ার স্বাদ থেকে সিংহভাগ বাঙালিই কিন্তু বঞ্চিত। অথচ বাজার ভরে আছে নকল জয়নগরের মোয়ায়। চৌকো বাক্স। বাক্স খুললেই হলুদ পাতলা পলিথিনের ভিতর থেকে যে নিরীহ মোয়ারা উঁকি মারে, তাদের জন্মস্থল জয়নগরের ধারে-কাছেও নয়। উপকরণ, স্বাদ— খামতি সবদিকেই। উপায় নেই, তাই জেনে-বুঝেই কনকচূড়, আসল নলেন গুড়, ক্ষীর, পেস্তা, এলাচের সেই মধুমণ্ডের বদলে ‘জয়নগরের মোয়া’র তকমা সাঁটা মরীচিকার দিকেই বারবার ছুটে যাই আমরা।
তবু জয়নগরের মোয়ার জুড়ি মেলা ভার। বিখ্যাত মোয়া প্রস্তুতকারক মা কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কর্ণধার লক্ষ্মণ হালদার মনে করেন, অগ্রহায়ণ থেকে পৌষ পর্যন্ত তাঁদের চরম ব্যস্ততা থাকে। বাড়ির সমস্ত মানুষ তো মোয়া শিল্পে হাত লাগানই, এছাড়াও অনেক নতুন কর্মচারী নিযুক্ত করেন লক্ষ্মণবাবু। তাঁর কাছ থেকে হাতে কলমে কাজ শিখে তৈরি হয় নতুন দক্ষ মোয়া তৈরির কারিগর। এভাবেই যদি লক্ষ্মণবাবুর মতো অন্যান্য মোয়া প্রস্তুতকারক এগিয়ে আসেন, তাহলে জয়নগরের মোয়া পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে যাবে।
