Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সলিল চৌধুরীর বিশ্বজনীন আবেদন

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

সলিল চৌধুরী আধুনিক ভারতীয় সংগীতকে এমন এক রূপ দিয়েছিলেন, যা তাঁর সময়ের অন্যরা ভাবতে পারেননি। অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল তাঁর ভাবনা। লোকসংগীতের ঘরানার সঙ্গে পাশ্চাত্ত্য সুরলহরী মিশিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। আর সেই সঙ্গে ছিল একটি সামাজিক চেতনা তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানের কথার পরতে পরতে। আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি জন্মেছিলেন। তিনি একাধারে সুরকার, গীতিকার, বিভিন্ন ধরনের লেখায় পটু এবং তাঁর একটি রাজনৈতিক ভাষ্যও ছিল।

আসামের চা বাগানে সলিলের বেড়ে ওঠা। আবার তিনি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ নিসর্গ প্রকৃতিকেও দেখেছিলেন খুব অন্তরঙ্গভাবে। এখান থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন লোকসংগীতের মণিমুক্তো। জীবনের একেবারে গোড়ায় তিনি বাঁশি, হারমোনিয়াম ও এসরাজ বাজানো রপ্ত করেছিলেন।

সলিল থাকতেন চা বাগানে। সেখানে এক আইরিশ চিকিৎসক থাকতেন। সেই  চিকিৎসকের ঘর থেকে গ্রামোফোনে বাজানো পাশ্চাত্ত্য সুর ভেসে আসত কিশোর সলিলের কানে। তন্ময় হয়ে তিনি শুনতেন। তাঁর দাদার অর্কেস্ট্রা ছিল। তিনি তাতে নানা পরীক্ষা করতেন। তারপর নিজেই তা শুনতেন আর তখনই অনুভব করতেন, তিনি যেটা করতে চাইছেন, তা পারছেন কিনা। তার ছোঁয়া পাওয়া যায় ১৯৬১ সালের ‍‘ছায়া’ চলচ্চিত্রে ‍ইতনা না মুঝসে তু প্যায়ার বড়া গানটিতে।

রাজনৈতিক জাগরণ

১৯৪০ সালের ঘটনাপ্রবাহ সলিলকে অপরিসীম নাড়া দিয়েছিল। দুর্ভিক্ষ, কৃষক বিদ্রোহ ও গ্রামবাংলার রুক্ষ বাস্তবতা তাঁকে বিচলিত করেছিল। আইপিটিএ সমাবেশে তাঁর প্রতিবাদী গানগুলি খুব মনে ধরেছিল মানুষের। বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা গানটি সেই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ গণসংগীত হয়ে ওঠে। সে সময়েই তাঁর বিশ্ববীক্ষা গড়ে ওঠে এবং শিল্পচেতনা রূপ লাভ করে। সলিল চৌধুরীর কাছে সংগীত আর রাজনীতি কখনওই পৃথক ভুবন ছিল না।

সুরের জগতে এক বিশিষ্ট ধরন তৈরি হল

সলিল চৌধুরী ভারতের চলচ্চিত্র গানের জগতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন। তিনি লোকগীতি, ধ্রুপদী সংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্ত্য ঘরনার স্বরক্ষেপণ, ছন্দ ও তাল মিশিয়ে এক নতুন আঙ্গিক তৈরি করেছিলেন। চলতি ভঙ্গি বদলে তিনি ছন্দের এক অজানা শৈলী আনেন। পিয়ানো ও অন্যান্য  বাদ্যযন্ত্র সহযোগে তিনি তাঁর সংগীতে এক স্বচ্ছতা আনেন। তাঁর সংগীতসজ্জার মধ্যে এক টাটকা বাতাস ছিল। বাঁশি, একতারা, চার তারের যন্ত্র ও কাঁসর বাজাতে শুরু করেন। এ এমন এক তাজা মিশ্রণ, পাঁচের দশকে যা ভারতীয় শ্রোতাদের কাছে অজানা ছিল।

কয়্যার বা বৃন্দগানের আসর

সলিল সম্মিলিত কণ্ঠের গানের শক্তি কী, তা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বম্বে ইয়ুথ কয়্যার ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটাই ভারতে ধর্মীয় সংগীতের বাইরে প্রথম গণসংগীত। এটাকেই বলে কয়্যার বা বৃন্দগান। এই শিল্পীরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে আইপিটিএর সঙ্গে কাজ করতেন।

মুম্বাইয়ের দিনগুলি

বিমল রায়ের হাত ধরে সলিল চৌধুরী হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৫৩ সালে সাড়া জাগানো দো বিঘা জমিনএর মধ্য দিয়ে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। তিনি এর গান রচনা করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক সাফল্য তাঁকে সুরকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর মধ্যে ছিল সহমর্মিতা ও কলানৈপুণ্যের এক চমৎকার মেলবন্ধন।

তারপর ১৯৫৮ সালে এল মধুমতি, তাঁর জীবনের এক স্মরণীয় সন্ধিক্ষণ। এর সাউন্ড ট্র্যাক দেখিয়ে দিয়েছিল তাঁর ব্যাপ্তি। এর গানের মধ্যে ছিল কিংবদন্তি গান আজা রে পরদেশি, দিল তরপ তরপকে  সুহানা সফর । ছয়ের দশকে সলিল চৌধুরী মালয়ালম চলচ্চিত্র শিল্পে যান। চেমিন ছবির গানগুলি হিট হয়েছিল। গীতিকার ভায়ালার ও ওএনভি কুরুপের সঙ্গে মিলে তিনি যে সুরারোপ করেছিলেন, তা মালয়ালম সংগীতের এক যুগকে সাকার করেছিল।

সলিল চৌধুরী তাঁর সুরকে বিভিন্ন ভাষায় প্রবাহিত করেছিলেন। তাঁর অনেক বাংলা গান হিন্দি সিনেমায় গিয়ে নতুন জীবন পেয়েছিল। কিন্তু তিনি কখনওই সুরগুলি হুবহু নকল করেননি। তিনি নব নব রূপ দিয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিল নতুন সজ্জা, নতুন ছন্দ ও সিনেমার মেজাজের সঙ্গে মানানসই তীব্র অনুভূতির মিশ্রণ। সম্প্রতি জার্মানিতে একদল যুবক-যুবতী ও শিশুকে দেখা গিয়েছে, যারা সলিল চৌধুরীর ‍‘ধিতাং ধিতাং বোলে কে মাদলে তান তোলে’ গানটি গাইছিল। অর্থাৎ তাঁর বিশ্বজনীন আবেদন স্বীকৃত হল।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए