ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

স্বাধীনতার পূর্বে বাঙালিকে অবশিষ্ট ভারত এতটাই সমীহ করত যে, তার একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে উঠেছিল ভাবুক হিসাবে। হর্ষ ও বিষাদে এবং সরস রসিকতায় বাঙালি যে কৃতবিদ্য ছিল, তার বহুল প্রমাণ আছে। সেলুলয়েডে বাঙালির অবিস্মরণীয় অবদানকে ভাস্বর করে রেখেছেন সত্যজিৎ রায়, অস্কার প্রাপ্তির ঘটনায় তা প্রতীয়মান হয়। কিন্তু হৃদয়ের উৎফুল্লতায় সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (২৬ আগস্ট, ১৯২০-৪ মার্চ, ১৯৮৩) স্বভাবসিদ্ধ অভিনয় বাঙালির একান্ত সম্পদ রূপে এক স্বর্ণালী অধ্যায়স্বরূপ চিহ্নিত হয়ে আছে। সিলভার স্ক্রিনে তাঁর উপস্থিতি মানেই এক টাটকা দমকা হাওয়ার সঙ্গে মন ভালো করে দেওয়া অনুভূতি। বাঙালির অভিনয় প্রতিভার তিনি এক জ্যান্ত সংজ্ঞা। বুদ্ধির সঙ্গে অভিনয়কে মিশিয়ে তিনি এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করতেন, যা আপামর বাঙালির প্রাণের আকুতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে হৃদয়ে চিনচিনে ব্যথার সঙ্গে ভালো লাগার আমেজ তৈরি করত। তিনি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় নামেই বাঙালির কাছে পরিচিত। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য থেকে ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের দেবতা হিসাবে মোমাসের কথা জানা যায়। ভানু ছিলেন বাঙালির মোমাস।
ভানু জন্মেছিলেন বিক্রমপুরে (ঢাকা), যা অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। ঢাকার ‘পোলা’ ভানু জগন্নাথ কলেজে শিক্ষা শেষ করে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় আসেন। এখানে এসে তিনি আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি নামে একটি সরকারি অফিসে যোগ দেন।
ভানুর অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে, ‘জাগরণ’ ছবির মাধ্যমে। সে বছরই ‘অভিযোগ’ নামে অন্য একটি ছবি মুক্তি পায়। তারপর ধীরে ধীরে ছবির সংখ্যা বাড়তে থাকে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘মন্ত্রমুগ্ধ’ (১৯৪৯), ‘বরযাত্রী’ (১৯৫১) এবং ‘পাশের বাড়ি’ (১৯৫২)। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। বলা যেতে পারে, এ ছবির মাধ্যমেই ভানু দর্শকদের নিজের অভিনয়ের গুণে আকৃষ্ট করা শুরু করেন। এখানে তিনি যোগ্য সঙ্গত পেয়েছিলেন উত্তম-সুচিত্রা জুটির। তার পরের বছর মুক্তি পায় ‘ওরা থাকে ওধারে’। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় ‘ভানু পেল লটারি’ এবং ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’। ১৯৫৯-এ মুক্তি পায় ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’। এ ছবিতে ভানু নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। বিপরীতে ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা। ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘৮০তে আসিও না’ ছবিতেও ভানু নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং এখানেও তাঁর বিপরীতে ছিলেন রুমা দেবী। ১৯৬৭-তে ভানুর আরও একটি ছবি মুক্তি পায়, ‘মিস প্রিয়ংবদা’, যেখানে তিনি চরিত্রের প্রয়োজনে মহিলা সেজে অভিনয় করেন। এখানে তাঁর বিপরীতে ছিলেন লিলি চক্রবর্তী। ভানুর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে। এ সমস্ত কালজয়ী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি আজও বাঙালির মনের মণিকোঠায় অধিষ্ঠান করছেন।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন রসিকতার দেবতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তিনি শুধু এক সফল অভিনেতা নন, বরং ছিলেন এক সাংস্কৃতিক যুগসন্ধিকালীন অভিজ্ঞতা, বাঙালির মননের গভীরে অঙ্কিত রঙ্গরসের সম্রাট। তাঁর রসিকতায় ছিল বুদ্ধি, সামাজিক ব্যঙ্গ, অন্তরঙ্গ দুঃখের হাসি, ছোট মানুষদের গোপন শ্লেষ, আবার ছিল এক অদ্ভুত করুণ রস, যা হাসির আড়ালে বাঙালির কষ্টকেও অনুভব করাতে পারত। দেশ ভাগ, শরণার্থী জীবন, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মধ্যবিত্তের কৌতুকমিশ্রিত বেদনা— সবই তিনি তাঁর অভিনয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। তাঁর সংলাপক্ষেপণ, অঙ্গভঙ্গি, উচ্চারণ, সবকিছু যেন বাঙালির নিজস্ব অস্তিত্বেরই এক রূপক। ভানুর পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণ, তথাকথিত ‘ভদ্দরলোক’ সমাজের প্রতি ব্যঙ্গ, দৈনন্দিন জীবনের খুচরো ঘটনা তাঁর রসিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। শরণার্থীদের ব্যথা, দারিদ্র, অসহায়তা— এসব বিষয়কে অসাধারণ দক্ষতায় তিনি রসিকতায় রূপান্তরিত করেন।
ভানুর অভিনয়শৈলীর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল, হাসির সঙ্গে বেদনার সংমিশ্রণ, উচ্চারণভিত্তিক রসিকতা, সংলাপের টাইমিং, সাধারণ মানুষের দুঃখকে হাসির মধ্যে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন জীবনের ব্যঙ্গচিত্রণের পারদর্শিতা। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন শিল্পী আগে বা পরে দেখা যায়নি।
বাঙালি ভদ্দরলোকের আত্মগরিমা, চাকরি নির্ভরতা, অর্থাভাবে অহংকার, অতি শিক্ষিত হওয়ার ভান— এসব ছিল ভানুর রসিকতার মূল অস্ত্র। আবার ‘মাসিমা, মালপো খামু’-র মতো সহজ সংলাপেও তিনি একেবারে পাশের বাড়ির ছেলেটির ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি চমৎকারভাবে অনুধাবন করেন যে, বাঙালির দুর্বলতা, শক্তি, খামতি এবং হাস্যরসের জায়গা কোথায়। তিনি সুচারুভাবে শিল্পীর দক্ষতায় সেই অনুভূতিগুলিকে কাজে লাগিয়ে এক মহাকাব্যিক অনুষঙ্গ সৃষ্টিতে সমর্থ হন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংলাপ শুধু উচ্চারণ বা বক্তব্যের সমষ্টি নয়— এগুলি বাংলা রসিকতার ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র সাহিত্যধারা। ভানুর সংলাপে ব্যঙ্গ থাকত, কিন্তু তা কখনও রুচিবহির্ভূত ছিল না, বরং মানবিকতার আবেদনে টইটম্বুর ছিল। শব্দজাল ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এক স্বতন্ত্র হাস্যরসের ভুবন তৈরি করতেন।
ভানুর মধ্যে লোকরস ছিল, আবার ছিল পরিশীলিত অভিনয় দর্শন। তাঁর শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছিল চার্লি চ্যাপলিনের বেদনা ঢাকা কমেডি, পূর্ববঙ্গীয় লোকনাট্য, কলকাতার শহুরে ব্যঙ্গ, দেশ ভাগ-উত্তর বেদনার অভিজ্ঞতা এবং মধ্যবিত্ত বাঙালির সংবেদনশীলতার ওপর ভর করে। চ্যাপলিন যেমন সামান্য ঘটনাকে মহৎ কমেডিতে পরিণত করতেন, ভানুও তা-ই। চ্যাপলিন যেমন একটি দুঃখী চরিত্রকে হাসির মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে পৌঁছে দিতেন, ভানুও তেমন দুঃখী শরণার্থীর বেদনাকে হাসির আড়ালে ঢেকে দিতেন। ভানুর কমেডিতে আবেগের ঘনত্ব অনন্য। চোখের ভাষা, মুখের ভঙ্গি, হাঁটার কায়দা— সবই চরিত্রানুযায়ী চিত্রিত হত। ভানুর চলচ্চিত্র জীবন প্রায় তিন দশকেরও বেশি বিস্তৃত। এই সময়ে তিনি তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর প্রতিটি সিনেমা শুধু বিনোদন নয়—একেকটি সমাজ দলিল, সাংস্কৃতিক দলিল। এই দলিলের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, হাসির মাধ্যমে জীবনের জটিলতা থেকে নিবৃত্তি, হাসি থেকে জীবনের খোরাক সংগ্ৰহ করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার অজেয় সংকল্প। শৈল্পিক নৈপুণ্যে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ অবয়ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়েছিলেন বলেই তো তিনি গ্ৰিসের মোমাসের সঙ্গে তুলনীয়।
