সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

গত শতকের ছয়ের দশক ছিল স্বাধীনোত্তর বাংলার শিল্প জগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। বিশেষ করে পার্ফর্মিং আর্ট, যেমন, চলচ্চিত্র, নাটক, গান (প্রধানত আধুনিক গান) ও নাচের ক্ষেত্রে বাংলা ভারত তথা বিশ্বের অঙ্গনে পা রেখেছিল। এর শুরু অবশ্যই বিংশ শতকের পাঁচের দশকে। ১৯৫৫ সালে নির্মিত পথের পাঁচালী বিশ্বমঞ্চে বাংলা সিনেমার স্থান পাকা করেছিল।
কিন্তু ভিন্নধর্মী বা আর্ট ফিল্মের বাইরে যে মূলধারার চলচ্চিত্র্র, সেখানেও বাংলা সিনেমা অত্যন্ত বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছিল। যে সব কুশীলব এ কাজে পথিকৃৎ ছিলেন, স্বল্প পরিসরে তাঁদের সকলের নামোল্লেখ করা যাবে না। তাঁদের মধ্যে মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো যিনি বিরাজ করেছেন, তাঁর নাম উত্তমকুমার। তাঁর আদি নাম ছিল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনি প্রথমে চাকরি করতেন। শুনতে একটু আশ্চর্য লাগলেও সত্যি যে, তিনি একটু তোতলা ছিলেন। তিনি নিজেই একথা স্বীকার করতেন। এটাই বোধ হয় প্রতিভার একটা দিক যে, সেই প্রতিকূলতাকে তিনি অবলীলায় কাটিয়ে উঠেছিলেন। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, তাঁর প্রথম দুটো ছবি ফ্লপ করেছিল বলে তিনি ফ্লপ মাস্টার নামে পরিচিত হয়েছিলেন। সে সময় অসিতবরণ বরং নায়ক হিসাবে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিলেন। অরুণকুমারের কপাল ফিরেছিল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ নামে অতি বিখ্যাত একটি চলচ্চিত্রের কল্যাণে।
সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণানুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেছিলেন, ‘উত্তমকে কখনও ছ্যাবলামি করতে দেখিনি। শুটিংয়ের ফাঁকে বাকিরা যখন হাসিঠাট্টা, মস্করায় মেতে থাকত, তখন উত্তম সিরিয়াসলি তাঁর অভিনয় নিয়ে চিন্তা করতেন।’ তাঁর সম্পর্কে প্রখ্যাত অভিনেত্রী অপর্না সেন বলেছিলেন, উত্তমকুমারকে বাঙালিরা প্রত্যেকে নিজের মতো করে ভাবতেন। অল্প বয়সি মেয়েরা তাঁকে প্রেমিক রূপে কল্পনা করত, মায়েরা তাঁকে পুত্র হিসাবে ভাবত, আর তরুণ যুবকরা তাঁকে দাদা রূপে ভাবত।’
উত্তম কুমারের চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল সত্যজিত রায়ের বিখ্যাত অপু ত্রয়ীর অন্তিম অংশ ‘অপুর সংসার’ সিনেমায় নায়ক হিসাবে। ছয়ের দশকে দু’জনই বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। দু’জনেরই বহু ফ্যান তৈরি হয়। এই দুই ফ্যান গোষ্ঠীর মধ্যে আবার লড়াই হত অনেকটা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান দ্বন্দ্বের মতো। সৌমিত্র জানিয়েছিলেন, এ নিয়ে আমাদের দু’জনের মধ্যে বেশ হাসাহাসি হত। সৌমিত্র তাঁর সাক্ষাৎকারে বহু জায়গায় এ কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, উত্তম তাঁকে নাম ধরে পুলু বলে ডাকতেন, তুই বলতেন এবং সৌমিত্র উত্তম কুমারকে উত্তমদা, তুমি বলতেন।
একবার দু’জনই কোনও এক বারে মদ্যপান করেছিলেন। সৌমিত্র একটু বেশি পান করেছিলেন। ফিরতে একটু রাতই হয়েছিল। দু’জনেরই গাড়ি ছিল এবং নিজেরাই চালাতেন। উত্তম কুমার সৌমিত্রকে বলেছিলেন, ‘চল, তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’ সৌমিত্র অনেক পীড়াপীড়ি করে উত্তমকে নিরস্ত করেছিলেন। সৌমিত্র জানিয়েছেন যে, তিনি বাড়িতে ঢোকার সময় দেখেন উত্তম কুমারের গাড়ি তাঁর গাড়ির পিছনে। সৌমিত্র উত্তম কুমারকে বলেন, ‘কী ব্যাপার, তোমাকে বারণ করলাম, বললাম, আমি ঠিক পারব, তবু তুমি এলে কেন?’ তখন সৌমিত্রর বাড়ি ছিল বালিগঞ্জে, আর উত্তম থাকতেন ভবানীপুরে। অর্থাৎ উত্তম কুমারের বাড়ি ফিরতে আরও খানিক দেরি হয়েছিল। উত্তম কুমার বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু চিন্তা তো হয়।’
উত্তম কুমার সম্পর্কে বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন রাজেশ খান্না। তিনি নিশিপদ্ম ছবিতে উত্তম কুমারের অভিনয় দেখে রপ্ত করতেন, কীভাবে ওই চলচ্চিত্রের হিন্দি সংষ্করণ অমর প্রেমে অনুরূপ চরিত্রে অভিনয় করবেন। অমর প্রেম মুক্তি পাওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি কিছুতেই উত্তম কুমারের সমকক্ষ হতে পারেননি। উত্তম কুমারের হিন্দি উচ্চারণে একটু অসুবিধা ছিল। তা ছাড়া অগ্নিপরীক্ষার হিন্দি ছোটি সি মুলাকাত ছবি প্রযোজনা করতে তিনি সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেছিলেন, কিন্তু সিনেমাটি বাণিজ্যসফল হয়নি। তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। আর সে ক্ষতি জীবনে পূরণ করতে পারেননি।
এখন আমরা বিনোদন জগতের বহু অভ্যন্তরীণ ঘটনার বিষয়ে জানতে পারি। কে কার কেরিয়ার নষ্ট করেছেন বা কাদের মধ্যে ব্যক্তি সংঘাত। কিন্তু উত্তম কুমার সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কেউ কোনও অপবাদ দিতে পারেনি। উত্তম কুমারের প্রথাগত শিক্ষা খুব ছিল না, কিন্তু তিনি কখনওই নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করতেন না বা বুদ্ধিজীবী সাজতেন না, কোনও বিষয়ে মাতব্বরি করতেন না। ঠিক এ জায়গাতেই তাঁর অনন্যতা, আর এ কারণেই তিনি সর্বোত্তম।
